কাজী নজরুল ইসলামের বিশ্বভাবনার পরিচয় তাঁর রচনায় পাওয়া যায়, পাওয়া যায় ব্যক্তিবিশ্বাসেও। ১৯১৪ সালের প্রথম মহাযুদ্ধ এবং তারপর তাবৎ পৃথিবীতে মারণাস্ত্র নিয়ে উৎকণ্ঠা! এই উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা গ্রাস করে বিশ্বের চেতনাসম্পন্ন মানুষকে। ১৯১৯ সালে ভার্সাইয়ে প্রথম মহাযুদ্ধের সন্ধিপত্র স্বাক্ষরিত হলে মানুষ খানিকটা স্বস্তি পায়। এর আগেই ১৯১৭ সালে সংঘটিত হয় লেনিনের নেতৃত্বে রুশ বিপ্লব, ১৯১৮ সালে তুরস্কের ইস্তাম্বুলে বিশ্বযুদ্ধের মিত্রপক্ষের সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়, পরবর্তীকালে তুরস্কে জাতীয়তাবাদী নেতা হিসেবে কামাল আতাতুর্কের প্রতিষ্ঠা সুনিশ্চিত হয়। এ সব কিছুই একজন সচেতন মানুষ হিসেবে নজরুল ইসলামকে আলোড়িত করে, শিল্পী হিসেবে তো বটেই। ১৯১৭ সালে তিনি সেনাবাহিনীতে নাম লেখিয়েছিলেন এবং সে সূত্রে করাচিতেও গিয়েছিলেন। তাঁর মনের মধ্যে বিশ্বচেতনার উন্মেষ এ সময় থেকেই। ১৮ বছরের নজরুলের মধ্যে যে বৈশ্বিক ভাবনার জাগরণ লক্ষ করা যায়, লেখক হিসেবে যত দিন তিনি বেঁচে ছিলেন, শেষ মুহূর্ত অবধি রচনায় সে পরশ পাওয়া যায়।
পাঞ্জাবি মৌলভি সাহেব নজরুলকে পাঠ দিয়েছিলেন দিওয়ান-ই-হাফিজ, মসনব-ই-রুমির পারসি কবিতার। করাচিতে তিনি পাঠ নিলেন মৌলভি সাহেবের কাছ থেকে পারসিতে কিন্তু গ্রহণ করলেন—ধর্মমোহ নয়, ভাষার আবেগের সীমাবদ্ধতা নয় অথবা কবিতার অন্ত্যমিলও নয়—গ্রহণ এবং আত্তীকরণ করলেন এক বিশ্ববোধ। হাফিজ, খৈয়াম নজরুলকে ডাক দিলেন এই বিশ্বপথে। করাচি থেকে ফিরে কলকাতায় এসেও তিনি সেই পথের পথিক হয়ে থাকলেন। ‘তুর্ক মহিলার ঘোমটা খোলা’ নজরুলের প্রথম প্রকাশিত প্রবন্ধ। এখানেই নজরুল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে প্রথম বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তুরস্কের কামাল পাশা ও তাঁর ধর্মনিরপেক্ষ চিন্তাধারার সমর্থক ছিলেন তিনি। নজরুলের চেতনায় ধর্মনিরপেক্ষতা প্রথম থেকেই লালিত হয়ে এসেছে। এই একই সময়ে রুশ বিপ্লব সংঘটিত হলে সমাজতন্ত্রের বিশ্ববাণীও নজরুলকে প্রভাবিত করে। মার্ক্সের তত্ত্বের পাঠ এবং লেনিনের নেতৃত্ব সম্পর্কে তিনি অবগত হবেন নিশ্চয়। তা ছাড়া বন্ধু ও কক্ষ সহচর কমরেড মুজফ্ফর আহমদের সান্নিধ্যও নজরুলকে এ সম্পর্কে জানতে সাহায্য করে থাকবে। কমিউনিস্টদের আন্তর্জাতিকতাবাদের ধারণা তিনি এ সময় লাভ করেন। একাধিক লেখায় কামাল পাশা, লেনিন, মার্ক্সের প্রতি তাঁর পক্ষপাত ঘোষিত হয়েছে, কামাল পাশার বীরত্বের স্তুতি করে দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন, পৃথক প্রবন্ধও আছে। ‘নবযুগ’ প্রবন্ধে নজরুল মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে একতাবদ্ধতা ও কর্মের সঙ্গে ঐক্য প্রকাশ করেছেন। এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় মার্ক্স ও লেনিনকে শ্রদ্ধা করেছেন নজরুল। কামাল পাশার মতোই লেনিনও নজরুলের নায়ক, মার্ক্স যেন মন্ত্রগুরু। জীবনের প্রথম দিকে সশস্ত্র বিপ্লবীদের প্রতি তাঁর দুর্বলতা প্রকাশ পেলেও অল্প দিনের মধ্যে তিনি ভারতীয় স্বাধীনতাসংগ্রামকে বিশ্ব প্রেক্ষাপটে বিবেচনা করতে পেরেছিলেন। নজরুল তাঁর লেখায় এই আন্তর্জাতিক বোধ প্রকাশ করেন। হয়তো এ কারণেই ব্রিটিশ সরকারের গোপন নথিতে নজরুল ‘বলশেভিক’ মতাদর্শের প্রচারক হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালের ১২ জুন দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, কর্তব্যরত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মি. রবার্টসন নোট লিখেছিলেন, ধূমকেতু পত্রিকার সংবাদ সংগ্রহ করে একটি পৃথক ‘বলশেভিক’ ফাইল খোলার জন্য :‘These notes may be placed on the Bolshevic file you have opened ধূমকেতু পত্রিকায় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা রচনার দায়ে ব্রিটিশ সরকার নজরুলকে জেলেও নিয়েছিল।
রচনার ক্ষেত্রেও বাংলাকে বিশ্বদরবারের সঙ্গে যুক্ত করার প্রয়াস নজরুলের মধ্যে দেখা যায়। আরবি ছন্দে বাংলা কবিতা লেখার প্রয়াস পেয়েছেন নজরুল। প্রচুর আরবি-পারসি শব্দ বাংলায় সার্থকভাবে ব্যবহার করেছেন। বেশ কিছু দরদ ভরা গজল আছে তাঁর লেখা। শেলি, হুইটম্যানের কবিতাও অনুবাদ করেছেন। নজরুলকৃত ‘আন্তর্জাতিক সংগীতে’র বাংলা অনুবাদ এখনো শ্রেষ্ঠ : ‘জাগো অনশনবন্দী ওঠরে যত/জগতের লাঞ্ছিত ভাগ্যহত।’ শেলির কবিতার ভাব অবলম্বনে রচিত : ‘ওরে ও শ্রমিক, সব মহিমার উত্তর অধিকার।’ (—‘জাগর-তুর্য’)। হুইটমানের ‘Pioneers O Pioneers’-এর অনুবাদ : ‘আমরা চলিব পশ্চাতে ফেলি পচা অতীত/গিরি গুহা ছাড়ি খোলা প্রান্তরে গাহিব গীত’ (—‘অগ্রপথিক’)। নজরুলের ‘বর্তমান বিশ্বসাহিত্য’ প্রবন্ধে বহু বিশ্বব্যক্তিত্বের নাম আছে, যাঁরা সাহিত্য রচনায় বিশ্বে স্মরণীয় হয়ে আছেন। কবি এঁদের রচনা কমবেশি পাঠ করেছিলেন। বিশেষ করে কিটস্, হুইটম্যান, শেলি তাঁর পড়া ছিল। আসলে নজরুল শুধুই অঞ্চল বা দেশজ সংকীর্ণধারায় গণ্ডিবদ্ধ ছিলেন না। শুধু আদর্শ নয়, চিত্প্রকর্ষেও নজরুল বিশ্বমেলা থেকে সম্পদ আহরণ করে বাংলাকে করেছেন ঋদ্ধ।

লেখক : নজরুল অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।




