শ্যামলবাংলা ডেস্ক ॥ ‘পাহাড় নদী ধান, ক্ষুদে জেলা শেরপুরের প্রাণ’- এ প্রবাদটিতেই একসময় মেঘালয় ঘেঁষা গারো পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত শেরপুরের প্রাকৃতিক পরিচয় পাওয়া যেতো। কিন্তু আধুনিক উৎকর্ষে কৃষি সমৃদ্ধ এ অঞ্চলে ধানকে টিকিয়ে রাখা সম্ভব হলেও কালের পরিক্রমা আর মানুষের সৃষ্ট নানা সমস্যায় এখন নদী ও পাহাড় যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। যে কারণে এ অঞ্চলে একসময়ে থাকা ২৫ নদীর মধ্যে বর্তমানে কোনোমতে কালের সাক্ষী হয়ে টিকে আছে মাত্র ৮ নদী। বাকিগুলো অর্থাৎ ১৭ নদীই হয়েছে বিলুপ্ত। টিকে থাকা নদীগুলোও এখন নাব্যতা হারিয়ে ক্ষীণকায় বিশুষ্ক শীর্ণ জলধারায় পরিণত হয়েছে। গারো পাহাড় এলাকায় নির্বিচারে বনভূমি ধ্বংস এবং পাহাড়ি টিলা খুড়ে পাথর উত্তোলন, নদীতে স্থানে স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ, স্লুুইস গেট নির্মাণ, অপরিকল্পিতভাবে বালি ও খনিজ সম্পদ আহরণ, দখল আর দূষণে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাঁধাগ্রস্ত হয়ে টিকে থাকা ওইসব নদীগুলোও এখন অস্তিত্ব সংকটে। সেগুলোর বুক চিরে এখন চলছে ফসলের আবাদ। কোথাও বা নির্মাণ করা হয়েছে ঘর-বাড়িসহ নানা প্রতিষ্ঠান। শ্যামলবাংলা২৪ডটকম’র অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে জেলায় নদ-নদীর ওই নাজুক চিত্র।
অন্যদিকে জেলায় প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নদ-নদী বিলীন এবং বাকিগুলো অস্তিত্ব সংকটে পড়ায় নদী থেকে সুযোগ সুবিধাসহ আয়ের পথও হারাচ্ছেন এলাকার বিশাল জনগোষ্ঠী। কৃষি সেচ সুবিধার ক্ষেত্রে বেড়েছে বাড়তি খরচ। আর ওই অবস্থায় ‘নদী বাঁচলে বাঁচবে প্রাণ, আসুন নদী সুরক্ষায় সচেতন হই’- এ শ্লোগানে নদ-নদী রক্ষায় করণীয় নির্ধারণে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন-পবাসহ নাগরিক সংগঠন জনউদ্যোগ গোলটেবিল বৈঠক, স্মারকলিপি, মানববন্ধনসহ নানা কর্মসূচি চালিয়ে গেলেও এখনও বড় ধরনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। তবে জেলায় ছোট নদী, খাল-বিল ও জলাশয় পুনঃখননে ৬টি প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। ওই প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে মৃগী নদীর শেরপুর সদর ও নকলা অংশে প্রায় ১৫ কিলোমিটার জুড়ে পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে।
শেরপুরের ভৌগলিক ও নদ-নদীর ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে এ অঞ্চলে একমাত্র ব্রহ্মপুত্র নদ ছাড়া সব নদীর উৎপত্তি ঘটে। ওই নদীগুলোই ভারত থেকে গারো পাহাড় হয়ে শেরপুর দিয়ে মিশে গেছে অন্যান্য নদীতে। দেশ স্বাধীনের পূর্ব পর্যন্ত রেলপথবিহীন শেরপুরের সড়কপথে যোগাযোগ ছিল একেবারেই সীমিত। তখন পাট ও ধান উৎপাদনকে কেন্দ্র করে শেরপুর অঞ্চল ব্যবসা-বাণিজ্যে সমৃদ্ধ থাকায় যাতায়াত ও যোগাযোগ অনেকটা নদী পথেই হতো। ইতিহাস বলে- শেরপুরের নদী পথে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যও সম্পাদিত হতো। হাজারও মানুষের জীবিকার অন্যতম মাধ্যম ছিল ওইসব নদী। প্রায় দেড়শ বছর আগের ইতিহাসে এ অঞ্চলে ১৬টি প্রধান নদী ও ৯টি ক্ষুদ্র নদীর কথা উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন ঐতিহাসিক গ্রন্থে যে ১৬টি প্রধান নদীর নাম আছে সেগুলো হচ্ছে ব্রহ্মপুত্র, মালিঝি, সোমেশ্বরী, মৃগী, নেত্রবতী, মহাঋষি, থলঙ্গ, ভোগবতী, খারুয়া, দর্শা, ভুরাঘাট, বলেশ্বরী, সুতি, মরাখড়িয়া, বৃদ্ধ ভোগবতী ও খড়িয়া। কালের বিবর্তনে জেলার বেশ কয়েকটি প্রধান নদীর নামেরও পরিবর্তন হয়ে গেছে। এগুলোর মধ্যে মরা বা আধামরা হয়ে ৮টি নদী এখনও কালের সাক্ষী হয়ে কোনো রকম বেঁচে রয়েছে। তার মধ্যে ব্রহ্মপুত্র, মৃগী, সোমেশ্বরী ও মালিঝি নদী আগের নামেই এখনও পরিচিত হলেও অন্য ৪টির নাম পরিবর্তন হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে ভোগবতী থেকে ভোগাই, মহাঋষি থেকে মহারশি, থলঙ্গ থেকে চেল্লাখালী এবং নেত্রবতী থেকে নেতাই নদী। বিলুপ্তি ঘটেছে বাকি ৮ নদীর। অন্যদিকে ‘দশানি’ নামে নতুন একটি নদীর সৃষ্টি হয়েছে।
হিমালয়ের মানস সরোবর থেকে ব্রহ্মপুত্র নদটি চীন ও ভারত হয়ে বাংলাদেশের কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করে জামালপুর ও সিরাজগঞ্জ হয়ে শেরপুর জামালপুর সীমারেখায় প্রবাহমান হয়েছে। শেরপুর-জামালপুর অংশের ওই ব্রহ্মপুত্র, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র নদ নাম ধারণ করেছে। ওই ব্রহ্মপুত্র নদ শেরপুর-জামালপুর জেলার বিশাল চরাঞ্চলের আশীর্বাদ ছিল। কালের পরিক্রমায় আজ এটি ছোট একটি খালের মতো হয়ে গেছে। কিন্তু প্রতি বর্ষায় এটি অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়। তখন ওই ব্রহ্মপুত্র নদ আগ্রাসী রূপ ধারণ করে চরাঞ্চলকে বন্যায় ভাসিয়ে ক্ষত-বিক্ষত করে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুরাপাহাড় থেকে কংশ নদীর জন্ম হয়ে শেরপুরের হাতিপাগার এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। ভারতে এর নাম কংশ হলেও শেরপুরের নালিতাবাড়ীর হাতিপাগারে এসে এ নদীর নাম হয়েছে ভোগাই। নালিতাবাড়ীর ৫ কিলোমিটার ভাটিতে দিংঘানা, চেল্লাখালী, মহারশি, মালিঝি ইত্যাদি বাহারি নামে উপ-নদীর নাম ধারণ করে আবার ভোগাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। ওই ভোগাই নদী ময়মনসিংহের ফুলপুরের খড়িয়া নদীর সঙ্গে মিশে গেছে। খড়িয়া নদী আবার ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে মিশেছে। দীর্ঘদিনের দখল আর নানা উৎপাতে বাহারি নামের ওই নদীগুলো আজ বিলীন হয়ে গেছে। আর নকলার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সুতি নদীকে ঘিরে ব্রিটিশ আমলে চন্দ্রকোনায় গড়ে উঠেছিল বিশাল বন্দর। আজ সেই সুতি এখন প্রভাবশালীদের মৎস্য খামারে পরিণত হয়েছে। এখন নদীগুলো পরিমাপ করার মতো অবস্থাও নেই। এছাড়া একসময়ের শেরপুর পৌর শহরের শান্ত স্নিগ্ধ মৃগী নদী এখন আধুনিক পৌর শহরের বর্জ্যের আস্তানায় পরিণত হচ্ছে। শহরের বিশাল ড্রেন নামিয়ে দেওয়া হয়েছে মৃগী নদীতে। বিলীন হয়েছে নদীর সুস্বাদু মিঠাপানির মাছ। পানির দুর্গন্ধে মৃগী এখন বিষাক্ত।
‘শেরপুর টাউনের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’ ও ‘নাগ বংশের ইতিবৃত্ত’ গ্রন্থের তথ্যমতে, ১৮৮৫, ১৮৯৭ ও ১৯১৮ সালে এ অঞ্চলজুড়ে প্রবল ভূমিকম্প হয়। এ কারণে শেরপুরের বেশকিছু নদ-নদী, খাল-বিলসমূহের গতি পরিবর্তন ও ভরাট হয়ে যায়। তা ছাড়া উন্নয়ন ও উৎপাদন বাড়াতে ব্রহ্মপুত্র, মহারশি, সোমেশ্বরী, ভোগাই, চেল্লাখালী নদীর স্থানে স্থানে অপরিকল্পিত বাঁধ, সøুইস গেট নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাপ্রাপ্ত হয়। ফলে আস্তে আস্তে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে চর জেগে ওঠে। কিন্তু নদী খননের কার্যকর কোনো উদ্যোগ-আয়োজন না থাকায় নাব্য হারিয়ে নদীগুলো আজ প্রবাহহীন। জেগে ওঠা চর চলে যায় প্রভাবশালীদের হাতে। নদীর বুকে চলে চাষাবাদ, গড়ে ওঠে বসতবাড়ি। নানা বিবর্তন পরিবর্তন প্রাকৃতিক অপ্রাকৃতিক ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে নাব্যতা হারানো নদীগুলো এখন পরিণত হয়েছে সামান্য জলাধারে। নদী তার প্রাকৃতিক গতি হারানোর কারণে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও জলজপ্রাণী।
সরেজমিনে নালিতাবাড়ী উপজেলার চেল্লাখালী নদীতে গিয়ে দেখা যায়, শুষ্ক মৌসুমে ওই নদীর পানি শুকিয়ে জেগে ওঠেছে বিস্তীর্ণ চর। আর ওই নদীর বুকে চাষাবাদ করেছেন তীরবর্তী গ্রাম ও এলাকার কৃষকরা। খননকাজ না করায় দিন দিন নদীটি নাব্যতা হারাচ্ছে।
এদিকে জেলায় নদ-নদী রক্ষায় বড় ধরনের কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরি্েবশ বাঁচাও আন্দোলন-পবার জেলা সমন্বয়কারী সমাজসেবী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া। তিনি বলেন, নদ-নদী রক্ষায় খাল-বিল জলাশয়গুলো খনন করে পানির প্রবাহ ও ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। নদীর জীব-বৈচিত্র্য কিংবা স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট না করে পরিকল্পিতভাবে নদী থেকে মৎস্য ও খনিজ সম্পদ আহরণের ব্যবস্থা করতে হবে। এছাড়া নাগরিক সগঠনের জনউদ্যোগের আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সকল নদী ও জলাভূমি সিএস ম্যাপ অনুযায়ী খাস জমি হিসেবে অক্ষুন্ন রেখে নদ-নদীতে পরিকল্পিত বাঁধ, ড্যাম, ব্যারেজ নির্মাণ বন্ধ করে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বজায় রাখতে হবে। ওই বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ প্রশাসনকে প্রস্তাবনাও দেওয়া হয়েছিল।
নদ-নদী রক্ষায় নিজেদের কার্যক্রম সম্পর্কে শেরপুরের দায়িত্বে থাকা পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলী মাজহারুল ইসলাম শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, ২০২০ সালের মধ্যে শেরপুরের বিখ্যাত মৃগী নদী, মালিঝি নদী, রঞ্জনা খাল, কালিদহ ও বউলি বিল দখলমুক্ত ও পুনঃখননে ৬টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ইতোমধ্যে মৃগী নদীর শেরপুর সদর ও নকলা অংশে পাউবোর পুনঃখনন কাজ শুরু হয়েছে।
এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) এবিএম এহছানুল মামুন শ্যামলবাংলা২৪ডটকমকে বলেন, ২১০০ সালের মধ্যে সরকারের ডেল্টা বহুমুখী প্রকল্পের আওতায় সব নদী-খাল দখলমুক্ত ও পুনঃখনন করা হবে। এ লক্ষ্যে সরকার ইতোমধ্যে জেলা প্রশাসনকে সম্পৃক্ত করে একটি কমিটি গঠন করেছে। ওই কমিটির মাধ্যমে ইতোমধ্যে জেলায় ছোট নদী, খাল-বিল ও জলাশয় পুনঃখননে পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি বেশ কিছু জলাশয় দখলমুক্ত করা হয়েছে। খাল-বিল ও নদী রক্ষায় প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত থাকবে।
– রফিকুল ইসলাম আধার।




