মো. মোশারফ হোসেন, নকলা : মৃৎশিল্পে সময় ও শ্রম বিনিয়োগ করে জীবিকা নির্বাহ করছে নকলা উপজেলার গনপদ্দী ইউনিয়নের বিহারীপাড় গ্রামের অর্ধশত পরিবার। মাটির পণ্যে জীবন জীবিকা তাদের। বিভাগীয় শহরসহ বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে এখানকার মাটির তৈরি পণ্য। বড় বড় শহরের সৌখিন মাটিপণ্যের দোকানসহ জেলা-উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক বাজারে ওই গ্রামের মৃৎশিল্পের কারিগরদের তৈরি জিনিসপত্র বেচাকেনা হয়।
সরেজমিনে দেখা যায়, মেলাকে সামনে রেখে মৃৎপণ্য বানাতে উপজেলার বিহারীপাড় গ্রামে নারী-পুরুষ ও শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছে। কেউ মাঠ থেকে মাটি আনছেন, কেউ মাটি পানির মিশ্রণে কাই তৈরি করছেন, আবার হাতে বা চাকী ঘুরিয়ে নিত্যব্যবহার্য পণ্য তৈরি করছেন। মাটি তাদের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। মৃৎশিল্পীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নকলায় শুধুমাত্র ওই গ্রামেই অর্ধশত পরিবার এ পেশার সাথে জড়িত। আগে আরও বেশি ছিল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দাপটে এ পেশাজীবীর সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে।
অমলচন্দ্র পাল, মনোরঞ্জন পাল, গোবিন্দ পাল, নেপালের মত অনেকেই জানান, তাদের পরিবারগুলো প্রায় ২০০ বছর ধরে এ পেশায় জড়িত। পূর্ব পুরুষদের পেশাকে ধরে রাখতে এবং বাংলার ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে যুগ যুগ ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। ভবিষ্যৎ প্রজন্মও এ শিল্পকে টিকিয়ে রেখে কুমার পাড়ার সুনাম ধরে রাখবে বলে জানান অনেকেই।
গৃহবধু অঞ্জলী ও কল্পনা বলেন, পুরুষরা মাঠ থেকে মাটি সংগ্রহ, চাকী ঘুরিয়ে বড় বড় পণ্য বানানো এবং বাজারজাতকরণের কাজ করেন। আর নারী ও শিক্ষার্থীরা খেলনা এবং ছোট ছোট মাটির পণ্য তৈরি করেন। তাদের পণ্যগুলোর মধ্যে কলস, পেয়ালা, ঢাকনা, পুতুল, হাড়ি, পাতিল, পিঠা বানানোর পাত্র, খাদা, (মাটির থালা) ফুলের টব, কলমদানী ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। শীতকাল ও ধানকাটার মৌসুমে চাহিদা বেশি থাকে। বর্ষা মৌসুমে বানানো যায় না বলে বাকী ৮ মাস মৃৎপণ্য তৈরিতে ব্যস্ত থাকেন তারা। ওইসময় তাদের ছেলে-মেয়েরা পড়াশোনার ফাঁকে বাবা-মাকে সহযোগিতা করে।
ঢাকাসহ সারাদেশের বিভিন্ন বিভাগীয় বা জেলা সদরের পাইকাররা এখান থেকে পণ্য কিনে নেন। ২ টাকা থেকে ১শ টাকা দামের পণ্য বানান তারা। বাজারের দিন ৫শ থেকে ৮শ টাকা এবং অন্যান্য দিন ৩শ থেকে ৪শ টাকা প্রতিজনের লাভ থাকে। তা দিয়েই সংসার খরচসহ শিক্ষা খরচ মেটাতে হয় তাদের। এ মৃৎশিল্পের সাথে জড়িত অলিন, সুনিল, ধলেশ্বর ও হাসা রাণী বলেন, একদিন মাটি সংগ্রহ করে পরের দিন কাই/লেই তৈরি করতে হয়। তারপর পণ্য তৈরি করে ৬/৭ ঘন্টা আগুনে পোড়াতে হয়। ওই ৩ দিন কাজ করে প্রতি জনে মোট ২৫০ থেকে ৪৫০টি পণ্য তৈরি করতে পারেন। যার খুচরা মূল্য ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা। আর পাইকারী মূল্য ২ থেকে আড়াই হাজার টাকা মাত্র। এ বিষয়ে সাবেক চেয়ারম্যান আমীর হামজা বলেন, এখানকার পাল সম্প্রদায়রা মাটির পণ্য বানিয়ে বাংলার ঐতিহ্যকে দুই শতক ধরে টিকিয়ে রেখেছেন। তা না হলে নকলাতে ্রই শিল্প বিলুপ্তের তালিকাতে থাকতো। স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান শামছুর রহমান আবুল বলেন, পরিষদের পক্ষ থেকে সাধ্য ও প্রাপ্ততা অনুযায়ী পাল সম্প্রদায়কে সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।




