কুষ্টিয়া প্রতিনিধি :: সব পথ যেন এসে মিশেছে মরা কালীর তীরে, লালনের আখড়াবাড়িতে। কারণ মানবস্রোত নেমেছে কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় লালনধামে। শহর থেকে মাত্র ১০ মিনিটের রাস্তা। কিন্তু এখন এটুকু পথ পেরোতে সময় লাগছে এক ঘণ্টার ওপরে। সাঁইজির টানে এ ধামে বাউলরা ছাড়াও পা পড়ছে সাধারণ দর্শনার্থীদের। শনিবার থেকে আখড়াবাড়িতে শুরু হয়েছে পাঁচ দিনব্যাপী স্মরণোৎসব ও মেলা। ওই দিন রাতে এ আয়োজনের উদ্বোধন করেন কুষ্টিয়া- আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উল আলম হানিফ।
আজ রাতে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখবেন, খলনার বিভাগীয় কমিশনার (অতিরিক্ত) অশোক কুমার বিশ্বাস। সভাপতিত্ব করবেন লালন একাডেমীর সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক সৈয়দ বেলাল হোসেন।
বাউলের চারণভূমিতে আসা হাজার হাজার ভক্ত, সাধুগুরু কর্তৃপক্ষের দেওয়া সকালের নাশতা, পায়েস আর মুড়ির বাল্যসেবা গ্রহণ করেন কাল। দুপুরে তারা মরা কালীগঙ্গায় গোসল সেরে ইলিশ-ভাত ও ত্রিব্যঞ্জন (তিন ধরনের সবজি দিয়ে তৈরি তরকারি) দিয়ে দুপুরে পুণ্যসেবা গ্রহণ করেন।
‘বাড়ির পাশে আরশি নগর’, ‘মানুষ ছাড়া ক্ষ্যাপা রে তুই কুল হারাবি’, ‘মানুষ ভজলে সোনার মানুষ হবি’, ‘সত্য বল সুপথে চল’, ‘এলাহি আলামিন গো আলা বাদশা আলমপনা তুমি’-এ রকম অসংখ্য লালনসংগীতের সুরের মূর্ছনা রাতে লালন একাডেমির শিল্পী ও দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আসা বাউলেরা পরিবেশন করেন। এ ছাড়া লালন মাজারের আশপাশে ও মরা কালী নদীর তীর ধরে বাউলেরা ছোট ছোট আস্তানা গেড়ে সাঁইজিকে স্মরণ করেন তার গান গেয়ে। কোন সে উদাসী ডাক! কোনো দাওয়াত নেই পত্র নেই, তবু মানুষ ছুটে আসে দলে দলে। হাজারে হাজারে। স্মরণোৎসবে অন্যান্য বছরের মতো এবারও সাধক লালনের আধ্যাত্মিক দর্শন লাভের আশায় দূরদূরান্ত থেকে মানুষ প্রাণের টানে ছুটে আসেন। একতারা, দোতারা, ঢোল ও বাঁশির সুরে মুখরিত হয়ে উঠেছে লালনভূমি ছেঁউড়িয়া। দূরদূরান্ত থেকে আসা বাউলেরা দরদভরা কণ্ঠে গাইছেন লালনের রেখে যাওয়া সব আধ্যাত্মিদক গান। তাদের সঙ্গে সুর মেলাতে ভুল করেননি ভক্তরাও। ভক্ত-অনুসারীরা এসে প্রথমেই মূল মাজারের ভেতর চিরনিদ্রায় শায়িত তাদের ধর্মগুরুর প্রতি বিশেষ ভঙ্গিতে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করছেন। তারা জাত, কুল, ধর্ম, গোত্র ভুলে একে অপরের সঙ্গে করছেন ভাবের আদান-প্রদান। লালন উৎসবে অস্থায়ী দোকানগুলোয় উপচে পড়া ভিড়। খাদ্যসহ খেলনার দোকানগুলোয় ভিড় করতে দেখা গেছে দর্শনার্থীদের। প্রতিদিন সন্ধ্যায় মেলার মাঠের স্থায়ী মঞ্চে বসে আলোচনা সভা। এর পরপরই শুরু হয় লালন একাডেমির শিল্পীদের গান। বাউলসাধক ফকির লালন শাহর জীবনকর্ম, জাতহীন মানবদর্শন, মরমি সংগীত ও চিন্তা-চেতনা এখন আর এই ছেঁউড়িয়ার পলীতে সীমাবদ্ধ নেই। তা দেশের সীমানা পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে সারা বিশ্বে। গবেষণার বিষয়বস্তুতে পরিণত হয়েছে তার সংগীত ও ধর্মদর্শন।




