মোহাম্মদ জুবায়ের রহমান, শেরপুর : প্রকৃতির নৈসর্গিক শোভামন্ডিত পানিহাটা-তারানি এক সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। শেরপুরের সীমান্তবর্তী নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নে ওই পর্যটন এলাকার অবস্থান। এখানকার উত্তরে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের তুড়া জেলার সীমান্তঘেষা ঘন সবুজ শ্যামল বন, খরস্রোতা পাহাড়ী ভোগাই নদীর গাড়ো পাহাড়ের সাথে মিতালী আর বৃক্ষরাজি দেখে ভ্রমন পিয়াসীদের মন উদ্বেলিত হয়। তারা কিছুক্ষণের জন্য হলেও ভুলে যান শহরের জীবনের কর্মক্লান্তি। প্রকৃতির নিখুত ভালবাসায় হারিয়ে যান তারা স্বপ্নের রাজ্যে।

ভারত সীমানাঘেষা হওয়ায় চিরসবুজ বাংলা মায়ের অপরুপ দৃশ্য দেখার পাশাপাশি ভারতের সবুজ বনানী দর্শনার্থীদের অনেক বেশি মনের তৃপ্তি মেটায়। পানিহাটা পাদ্রি মিশনের পশ্চিম পাশে উচু পাহাড়ে দাড়িয়ে উত্তর দিকে চাইলে চোখে পড়ে নীলাভ-চিরসবুজ ভারতের পাহাড়ী তুরা জেলাকে আবছা আবরণের চাদরে জড়িয়ে নিয়েছে কুয়াশার মতো মেঘ কখনো বা কুয়াশা নিজেই। দূরের টিলাগুলো কেবলই লুকোচুরি খেলে এরই আড়ালে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ছোট ছোট পাহাড় গুলোকে ফাঁকি দিয়ে তুড়ার অববাহিকা থেকে সামনে সোজা এসে পশ্চিমে চলে গেছে পাহাড়ি খরস্রোতা নদী ভোগাই। একপাশে তার কাশবন আর অপর পাশে শত ফুট উঁচু দাঁড়িয়ে থাকা সবুজে জড়ানো পাহাড় ও নদী। নদীর টলটলে স্বচ্ছ পানির নিচে গড়াগড়ি খাচ্ছে নুড়ি পাথরগুলো। সামনের একশ গজ দূরে উত্তরে ভারত অংশে পিঁচঢালা আকাবাঁকা রাস্তা পূর্ব থেকে পশ্চিমে পাহাড়ের বুকচিরে চলে গেছে। চতূর্দিকে ছোট ছোট অসংখ্য পাহাড়ি টিলা। পূর্ব দিকের কয়েকটি পাহাড়ের গা ঘেঁষে ভোগাই নদীতে এসে মিশেছে ছোট একটি পাহাড়ি ঝরণা। তার পাশেই খ্রিষ্টান ধর্মালম্বীদের উপাসনালয় পানিহাটা পাদ্রি মিশন। এখানে আছে ছোট একটি চিকিৎসা কেন্দ্র, বিদ্যালয় আর ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের থাকার জন্য হোস্টেল। সেখানে শিশু-কিশোরদের কোলাহল। এসব মিলে ভ্রমনপিয়াসীদের প্রতিনিয়ত আকর্ষণ করে অপরূপা পানিহাটা-তারানি পাহাড়। অবশ্য এলাকার জনগন এই পাহাড়টিকে পানিহাটা নামেই জানেন। কিন্তু এই সৌন্দর্য্যের ভাগটা শুধু পানিহাটাই নিতে পারেনি। এর একটা অংশে ভাগ বসিয়েছে পাশের তারানি গ্রামের পাহাড়। তাই দর্শণার্থীদের জন্য পানিহাটা ও তারানি দুটো মিলেই গড়ে উঠতে পারে পর্যটন কেন্দ্র। সবুজ চাদরে ঘেরা গারো পাহাড়ে প্রিয়জনকে সাথে নিয়ে চলে যান প্রকৃতির রাজ্যে। যারা শুনেছেন শেরপুরের বন্য হাতির তান্ডব, তারা মিশনের পুর্বপাশে ক্ষুদ্র-নৃগোষ্ঠি জাতি তথা পেকামারি গারো আদিবাসী পলীর অধিবাসীদের কাছ থেকে শুনতে পারবেন বন্যহাতির ধংসলীলার কথা। মাতৃতান্ত্রিক ব্যাবস্থার অধিনে পরিচালিত গারোদের পরিবারের প্রধান নারীরা। তাদের সহজ-সরল জীবন যেন ভ্রমন পিয়াসীদের অবাক করে দেয়। তাদের জীবন সংগ্রাম কাছে থেকে দেখার ও শুনার সুযোগ পাবেন এই গ্রামে। দারিদ্র আর বন্যহাতির সাথে লড়াই করে বেচে থাকা এসব গারো আদিবসীদের অকৃত্রিম আতিথেয়থা দেখে মুগ্ধ হন ভ্রমন পিয়াসীরা। বর্তমান কৃত্রিমতার যুগে প্রকৃতির নির্মিত সবুজ বনানী দেখে কর্মক্লান্তি ভুলে অনাবিল আনন্দে দিনের আলোতেই ভ্রমন পিয়াসীরা ফিরে যান নিজ গৃহে।
পানিহাটা পাদ্রি মিশনের রেভারেন্ট ফাদার ফিলিপ বিশ্বাস ‘সবার কথাকে’ বলেন, অপার পর্যটন সম্ভাবনাময় পানিহাটা-তাড়ানি এলাকাটি প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরপুর। প্রকৃতির সান্নিধ্য পেতে এখানে প্রতিবছর দেশি-বিদেশি পর্যটকরা ভীড় জমান। এখানে সরকারিভাবে পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তুললে সরকার বিপুল পরিমানে রাজস্ব পাবে। তবে তিনি আরো জানান, বর্তমানে চায়না মোড় থেকে পানিহাটা-তাড়ানি যেতে প্রায় ১ কিঃমিঃ রাস্তা বর্ষাকালে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তাই এই রাস্তা টুকু জরুরী ভিত্তিতে পাকা করা প্রয়োজন।
কিভাবে যাবেন ঃ
রাজধানী ঢাকা থেকে শেরপুর হয়ে পানিহাটার দুরত্ব প্রায় ২৫০ কিঃমিঃ। শেরপুর জেলা শহর থেকে প্রায় ৩০ কিঃমিঃ সোজা উত্তর দিকে নিজস্ব পরিবহন বা সিএনজি যোগে যাত্রা শুরু করে সরাসরি চলে আসুন নাকুগাও স্থলবন্দর এলাকায়। তার পাশেই সদ্য নির্মিত ভোগাই নদীর ব্রীজের উপর দিয়ে পুর্ব দিকে প্রায় ২-৩ কিঃমিঃ যাওয়ার পর ঘন সবুজ পাহাড় মাড়িয়ে উত্তর দিকে পানিহাটা-তাড়ানি পাহাড়ে ঢুকে পড়–ন। বিনা টিকিটে উপভোগ করুন প্রকৃতির নয়নাভিরাম দৃশ্য। যদি নালিতাবাড়ী উপজেলা শহর থেকে আসতে চান তাহলে শহরের গড়কান্দা চৌরাস্তা মোড় থেকে সোজা উত্তরে প্রথমে নাকুগাও পরে পূর্ব দিকটায় মোড় নিয়ে সৌন্দর্যমন্ডিত ভোগাই ব্রিজ পাড়ি দিতে হবে। এরপর সোজা পূর্ব দিকে প্রায় আড়াই থেকে ৩ কিলোমিটার গেলে চায়না মোড়। এ মোড়ে এসেই আবারও গতিপথ বদলিয়ে যেতে হবে সোজা উত্তরে। উত্তরের এ রাস্তা ধরে প্রায় এক কিলোমিটার গেলেই পানিহাটা-তারানির সবুজ শ্যামলীময়। সেখান থেকে ভিতরে ঢুকতেই দেখতে পাবেন সবুজের সমারোহ। ব্যক্তিগত উদ্যোগে রিকশা, সিএনজি অটোরিশা বা ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলেও যাওয়া যায় জেলা শহর থেকে ২শ-২শ ৫০ টাকা আর নালিতাবাড়ী শহর থেকে মাত্র ৩৫-৪৫ মিনিটের ব্যবধানে এবং অল্প খরচের মধ্যেই চলে যাবেন আপনার গন্তব্যে। অন্যদিকে মোটরসাইকেল যোগে যেতে পারেন এক্ষেত্রে ভাড়া লাগবে (জেলা থেকে) আসা-যাওয়ায় ৩শ টাকার মতো। এখানে পিকনিক বা ঘুরবার জন্য যে কারনেই আসুন বেলা শেষে জেলা সদরে হোটেলে রাত্রিযাপন করতে হবে। তাছাড়া তাড়ানী পাহাড়ে ভাল মানের কোন খাবারের হোটেল নেই। তাই নিজ নিজ ব্যবস্থাপনায় খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।




