সাতক্ষীরা প্রতিনিধি : জামায়াত শিবিরের সহিংসতায় বিধ্বস্ত জেলা সাতক্ষীরা। নতুন করে হামলার আশঙ্কায় আওয়ামী লীগ ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ক্ষতিগ্রস্ত ও আতঙ্কগ্রস্ত অনেকেই বাড়ি ছাড়া। যৌথবাহিনী ও সেনাবাহিনীর উপস্থিতির ফলে সহিংতা কমলেও আত্মবিশ্বাস ফিরে না আসায় নির্বাচনের আগে ওই সব পরিবারের লোকজনরা ঘরে ফিরতে পারবে কিনা তা বলা যাবে না। দু’টি আসনে ২৩৩টি বুথ গুরুত্বপূর্ণ (ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এ অবস্থায় আগামি ৫ জানুয়ারি ১০ সংসদীয় নির্বাচনকে ঘিরে ব্যস্ততার পাশপাশি এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত চষে বেড়াচ্ছেন সাতক্ষীরা ১ ও ২ আসনের মহাজোট ও স্বতন্ত্র প্রার্থীরা।
এদিকে সাতক্ষীরায় চারটি আসন থাকলেও ৩ ও ৪নং আসনে একক প্রার্থী থাকায় সেখানে নির্বাচনের কোন দরকার হচ্ছে না মহাজোট সমর্থিত আওয়ামী লীগ প্রার্থীদের। সাতক্ষীরা জেলা রিটার্নিং অফিসারের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে তালা ও কলারোয়া এ দু’টি উপজেলায় মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখ ৮০ হাজার ২০৮জন। পুরুষ ভোটার এক লাখ ৮৮ হাজার ৬০৯ জন ও মহিলা ভোটার এক লাখ ৯১ হাজার ৫৯৯জন। ভোটকেন্দ্র ১৪৬টি ও বুথের সংখ্যা ৭৮৪টি।
সাতক্ষীরা- ১ (তালা ও কলারোয়া) আসনে মহাজোট প্রার্থী বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাতক্ষীরা শাখার সম্পাদক জজ কোর্টের পিপি অ্যাড. মুস্তাফা লুৎফুল্লাহ নৌকা প্রতীক পেয়ে নির্বাচনে নেমেছেন। এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী সৈনিকলীগের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক সরদার মুজিব হরিণ প্রতীকে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন।একইভাবে সাতক্ষীরা- ২ আসনে মহাজোট প্রার্থী হিসেবে মুক্তিযোদ্ধা মোস্তাক আহম্মেদ রবি নৌকা প্রতীকে লড়ছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে জেলা শ্রমিকলীগের সভাপতি সাইফুল করিম সাবু হরিণ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্ব›িদ্বতা করছেন। এ ছাড়া এ আসনে ন্যাপ এর কাজী সাঈদুর রহমান কুঁড়ে ঘর ও জেপি’র মহসিন হোসেন বাবলু বাই সাইকেল প্রতীকে প্রতিদ্বন্দিতা করছেন।
তালা ও কলারোয়া উপজেলার বিভিন্ন অঞ্চলের ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে মহাজোট প্রার্থী অ্যাড. মুস্তাফা লুৎফুল্লাহ প্রতীক বরাদ্দের পরপরই তালা সরকারি কলেজ মাঠ, কলারোয়া পাবলিক ইনস্টিটিউট ও উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে মহাজোটের জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতা কর্মীদের নিয়ে পৃথক মতবিনিময় সভা করেছেন। পাড়ায় পাড়ায় ভোট প্রার্থনার পাশাপাশি সম্প্রতি জামায়াত বিএনপি’র সহিংসতায় নিহত ও ক্ষতিগ্রস্তদের স্বজনদের বাড়ি বাড়ি যেয়ে সহমর্মিতা জানিয়েছেন। নিহতদের কবরে পুষ্পস্তবক অর্পন করেছেন তিনি। শোককে শক্তিতে পরিণত করে রুখে দাঁড়াপনোর জন্য আশ্বস্ত করছেন তিনি। প্রতিদিন চলছে র্যালি ও মাইকিংও। তালা কলারোয়ার এক সময়কার আর্শিবাদ কপোতাক্ষ নদ বাঁচাও আন্দোলনে ও ২৮ ফেব্রæয়ারি দেলোয়ার হোসেন সাঈদীর রায় পরবর্তী জামায়াত বিএনপি’র সহিংসতার প্রতিবাদে তার অনবদ্য ভ‚মিকার কারণে সাধারন মানুষের কাছে তার গ্রহনযোগ্যতা যথেষ্ট।
এছাড়া আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা ভেদাভেদ ভুলে শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী অ্যাড. মুস্তাফা লুৎফুল্লাহকে জয়ী করার লক্ষ্যে একযোগে কাজ করে যাচ্ছেন। তাকে জয়লাভ করার লক্ষে শুধু মাত্র উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দই নয়, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি প্রকৌশলী শেখ মুজিবুর রহমান, সাধারন সম্পাদক মোঃ নজরুল ইসলাম, যুগ্ম সাধারন সম্পাদক অধ্যক্ষ আবু আহম্মেদ, সাংগঠণিক সম্পাদক ফিরোজ আহম্মেদ গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন।
তবে বিনা বাধায় ছেড়ে দেওয়ার লোক নন সরদার মুজিব। নিজের বাড়ি কলারোয়ায় হওয়ার সুবাদে দু’ বছর আগে থেকেই মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন তিনি। আওয়ামী লীগের আভ্যন্তরীন বিরোধকে কেন্দ্র করে অনেকে নৌকা প্রার্থীর পক্ষে থাকলেও ভিতরে কাজ করছেন সরদার মুজিবের পক্ষে। ফলে এ আসনে লড়াই জমে উঠেছে।
এদিকে সাতক্ষীরা সদর আসনে মহাজোট প্রার্থী মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কেন্দ্রীয় কাউন্সিলের সাবেক সহসভাপতি মোস্তাক আহম্মেদ রবি নিজের কর্মী সমর্থকদের নিয়ে বাড়ি বাড়ি প্রচারনার পাশপাশি মাইকিং করে চলেছেন। তবে বছরের ১১ মাস ঢাকায় অবস্থানকারি এ আসনের প্রার্থী মোস্তাক আহম্মেদ রবি’র সঙ্গে তৃণমূল স্তরের নেতা কর্মীদের সম্পর্ক না থাকায় তাকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ অনেকেই। তাকে প্রত্যাহারের দাবিতে ও জেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক নজরুল ইসলামকে মনোনয়ন দেওয়ার দাবিতে শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ হয়েছে।
এ আসনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন জেলা শ্রমিকলীগের সভাপতি সাইফুল করিম সাবু। জেলা আওয়ামী লীগের অধিকাংশ নেতাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জনসংযোগে কাজ করে যাচ্ছেন তার পক্ষে।
সাইফুল করিম সাবুর নির্বাচনী প্রচারের দায়িত্বে থাকা জেলা শ্রমিকলীগের যুগ্ম সাধারন সম্পাদক হারুন অর রশিদ জানান, ১৯৭৫ সালের পর মোস্তাক আহম্মেদ রবি ঢাকায় চলে যান। ১৯৯৬ সালের আগে তিনি সাতক্ষীরার মাটিতে পা দেননি। এমনকি গত ২৮ ফেব্রæয়ারির পর থেকে জেলা জুড়ে জামায়াত বিএনপি’র সহিংসতায় আওয়ামী লীগের যে সব নেতা কর্মীরা মারা গেছেন তাদের সান্ততা দেওয়া তো দূরের কথা তাদের সম্পর্কে খোঁজও নেননি কোন দিন।
তিনি বলেন, যেহেতু বিরোধী দলীয় প্রার্থীরা ভোটের ময়দানে নেই সেহেতু দলীয় মনোনয়ন মোস্তাক আহম্মেদ রবি পেলেও তৃণমূল স্তরের নেতা কর্মীদের প্রত্যাশা অনুযায়ি হরিণ প্রতীকে মহাজোটের মূল প্রার্থী সাইফুল করিম সাবু।
তবে মোস্তাক আহম্মেদ রবি’র পক্ষে প্রচারনার দায়িত্বে থাকা পৌর আওয়ামী লীগের প্রচার সম্পাদক কামরুল ইসলাম জানান, আওয়ামী লীগের দলীয় প্রধানের নির্দেশ অনুযায়ী সকলের মোস্তাক আহম্মেদ রবি’র পক্ষে কাজ করার কথা। তাছাড়া সাইফুল করিম সাবু দলীয়ভাবে মনোনয়ন কেনেননি। সেক্ষেত্রে তার কথা ভাবার কোন প্রশ্নই আসে না।
তিনি বলেন, জেলা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা তালা- কলারোয়ায় যেয়ে উচ্চ স্বরে বলছেন নেত্রীর মনোনীত প্রার্থী কলাগাছ হলেও তাকে ভোট দিতে হবে । অথচ সাতক্ষীরা সদরের বেলায় তারা নেত্রীর কথা রাখছেন না।
এছাড়া সাতক্ষীরা- ২ আসনে ন্যাপ প্রার্থী কাজী সাঈদুর রহমান ও জেপি প্রার্থী মহসিন হোসেন বাবলুর নির্বাচনী প্রচার নেই বললেই চলে। দু’ একটি চায়ের দোকানে রসিকতার ছলে তাদের নাম শোনা যাচ্ছে।
সাতক্ষীরা ১ ও ২ আসনের কয়েকজন ভোটার জানান, কলারোয়া উপজেলার জামায়াত অধ্যুষিত গোপীনাথপুরের একাংশ, জয়নগর, গাজনা, মানিকনগর উফাপুর ও যুগিবাড়ি এলাকায় প্রার্থীরা যেতে পারলেও সাতক্ষীরা সদরের আগরদাড়ি, বৈকারী, কাথÐা, কুচপুকুর, ভাদড়া, খানপুর, রইচপুর, মথুরাপুর, রামচন্দ্রপুর এলাকায় প্রার্থীদের ঢোকা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া গত ২৪ ডিসেম্বর সাইফুল করিম সাবুর প্রচার গাড়ি, ২৬ ডিসেম্বর এক ঘণ্টার ব্যবধানে মোস্তাক আহম্মেদ রবি ও সাইফুল করিম সাবুর প্রচার মাইক ভাঙচুর করে গাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
তবে কলারোয়ায় জামায়াত বিএনপি তপশীল ঘোষণার এক সপ্তাহ পরে দেয়াড়া ইউনিয়নের গড়গড়ি বাজারে ও জয়নগর ইউনিয়নের ধানদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাঠে বসে নির্বাচন প্রতিরোধ কমিটি গঠণ করে। ফলে ওইসব এলাকার ভোটারদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। সাতক্ষীরা- ৩ আসনে সাবেক স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যান মন্ত্রী জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ডাঃ আ.ফ.ম রুহুল হক ও -৪ আসনে শ্যামনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এসএম জগলুল হায়দার একক প্রার্থী হওয়ায় তাদেরকে নির্বাচনী মাঠে থাকতে হচ্ছে না। তার রয়েছেন নির্বাচন কমিশনারের ঘোষণার অপেক্ষায়। সাতক্ষীরা পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর জানান, সংসদীয়-১ আসনে তালায় ৪১, পাটকেলঘাটায় ১২ ও কলারোয়ায় ৪৯াট ও সাতক্ষীরা-২ আসনে ১৩১টি বুথ গুরুত্বপূর্ণ ( ঝুঁকিপূর্ণ) হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এ ব্যাপারে সাতক্ষীরা নির্বাচন কমিশনার আবুল হোসেন জানান, ভোট গ্রহণের আগে ও পরে কয়েকদিন নির্বাচনী এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখার জন্য পুলিশ, বিজিবি, র্যাব ও সেনাবাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ ভোট কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




