এস, এম আজিজুল হক ,পাবনা : পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার আতাইকুলা থানার বনগ্রামের হিন্দু মহলায় অগ্নি সংযোগ, লুটপাটের ঘটনায় রোববার দুপুরে আতাইকুলা থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলার বাদী বাবুল সাহা। এজাহার নামীয় আসামী ২০ জন, অজ্ঞাত আরও আড়াই’শ ব্যক্তিকে আসামী করা হয়েছে। পুলিশ রবিবার ভৈরবপুর গ্রামের রেজাউল করিমকে গ্রেফতার করে। এরপর রাতে বিভিন্নস্থানে অভিযান চালিয়ে আরো ৮জনকে গ্রেফতার করেছে থানা পুলিশ গ্রেফতার হওয়া সবাই ওই ঘটনায় দায়ের করা মামলার এজাহারভূক্ত আসামী বলে জানা গেছে।

এরা হচ্ছে, সাঁথিয়া উপজেলার ভৈরবপুর গ্রামের মৃত আব্দুল আজিজ মোলার ছেলে হেলাল উদ্দিন মোলা ওরফে বড় গেদা (৪৮), গাঙ্গুহাটির জানু মিয়ার ছেলে জনি মিয়া (২০), একই এলাকার ইদ্রিস আলীর ছেলে মিলন হোসেন খান (৩০), বনগ্রামের দবির বিশ্বাসের ছেলে দাউদ আলী বিশ্বাস (৪৩) ও রেজাউল করিম বিশ্বাস (৩০), আতাইকুলা থানার বামনডাঙ্গা গ্রামের মোজাহার হোসেনের ছেলে মোজাইয়ের ছেলে রুবেল (২২), মিয়াপুর গ্রামের রমজান কসাইয়ের ছেলে আলমগীর হোসেন (২২) ও করমজা মধ্যপাড়ার মৃত আবুল হোসেন মোলার ছেলে সরোয়ার হোসেন (৩৫)।
ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাসে নবী (স:) সম্পর্কে কটুক্তি ও ব্যাঙ্গচিত্র দেয়া হয়েছে এই গুজব রটিয়ে জামায়াত-বিএনপি’র একদল উশৃংখল নেতা কর্মী বনগ্রামের তিনটি মন্দিরে ভাংচুর করে। তারা বাবুল সাহা নামের একজন বড় ব্যবসায়ীর বাড়িতে হামলা করে লুটপাট এবং আগুন ধরিয়ে দেয়। এছাড়াও ৩০টি বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট করে। শতাধিক বাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। রবিবার সরেজমিনে ঘটনাস্থল ঘুরে জানা গেছে,গত শুক্রবার কুমিরগাড়ি বিশ্বাস পাড়ার খাজা (পিতা-বাবু খাঁ) বনগ্রাম বাজারে একটি প্রচারপত্র বিলি করে তাতে ইংরেজিতে লেখা ছিল নবী (স:) সম্পর্কে রাজিব নামের এক ছেলে কটুক্তি ও ব্যাঙ্গচিত্র প্রকাশ করেছে। এর পর ক্ষেতুপাড়া ইউনিয়ন জামায়াতের আমীর মাওলানা আব্দুল মালেকের ছেলে আব্দুল মোমেন বনগ্রাম হাটে মাইকে উস্কানিমূলক বক্তৃতা দেয়। এসময়ই আতাইকুলা ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মোহাম্মদ সেলিমের আদেশে বিএনপি কর্মী সুইট (পিতা: শওকত আলী, গ্রাম-রসুলপুর), আলমগীর (পিতা: রমজান কসাই, গ্রাম- মিয়াপুর), রেজাই, পিতা: নজরুল ইসলাম, গ্রাম-মিয়াপুর) এবং জামায়াত নেতা মালেক মাওলানার ছেলে ছাত্রশিবির নেতা আব্দুল মোমেন কুড়াল হাতে প্রকাশ্যে শত শত হাটুরে লোকের সামনে বাবুল সাহাকে (দশম শ্রেণীর ছাত্র রাজিবের বাবা) দোকান থেকে ভীতি প্রদর্শন করে মোটর সাইকেলের পেছনে (সুইটের মোটর সাইকেলে) উঠিয়ে বিএনপি নেতা আবু বকর মেম্বরের ছেলে সোহেলের ওষুধের দোকানে নিয়ে ঘরের মধ্যে আটকিয়ে ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। এর আগেও বাবুল সাহার কাছে ঈদ উল আযহার সময় বাবুল সাহার কাছে বিএনপি নেতা মোহাম্মদ সেলিম (সাবেক মেম্বর, গ্রাম-পদ্মবিলা) এবং তার দুই সহযোগী বাবু ও পাপ্পু ২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছিল। উলেখ্য বাবুল সাহার ছেলে রাজিবের বিরুদ্ধেই পরিকল্পিতভাবে তথাকথিত অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। শনিবার ছিল বনগ্রামের হাট। হাটবারে পরিকল্পিতভাবে বিভিন্নস্থান থেকে জামায়াত-বিএনপি’র উলেখিত নেতারা বাস এবং দেশীয় যানবাহন নসিমন-করিমন যোগে বনগ্রামে আসে। তারা পরিকল্পিতভাবে বাবুল সাহার বাড়িতে হামলা চালায়। ওই সময় বাবুল সাহাকে সোহেলের ওষুধের দোকানে আটক রাখা হয়। হামলাকারিরা ব্যাপক লুটপাট করার পর বাড়িতে আগুণ ধরিয়ে দেয় এবং বাড়ির পার্শ্ববর্তী রাধাগোবিন্দ মন্দির ভাংচুর করে আগুন ধরিয়ে দেয়।এছাড়াও নিতাই ঘোষের বাড়ি সংলগ্ন মন্দির এবং অজিত সরকারের বাড়ির পাশ্ববর্তী মন্দিরের মূর্তি ভাংচুর করে। সকাল সাড়ে ১১টা থেকে বিকাল সাড়ে চারটা পর্যন্ত দফায় দফায় হিন্দু মহলার শতাধিক বাড়িতে হামলা চলানো হয়। হামলা এবং লুটপাটে অংশ নেয় প্রায় ৩শ ব্যক্তি। বিএনপি-জামায়াত ক্যাডাররা এসময় সুধীর কুমার সাহা, ডা.উত্তম কুমার, নারয়ণ চন্দ্র সাহা, নব কুমার শীল, কালা মাস্টার, কৃষ্ণ কুমার সাহা, রাজকুমার সাহা, শুকুমার মাস্টার, সনাতন সাহা, বিষ্ণু দাস, গণেশ শীল, কৃষ্ণ দাস, বিমল সাহা, অনিল মাস্টার, জিতু নাগ, বিষ্ণুপদ সাহাসহ মোট ৩০টি বাড়িতে ব্যাপক লুটপাট চালায়। এছাড়াও শতাধিক বাড়িতে হামলা চলে। বাজারের রঞ্জন কর্মকার, বাঁশি রাজবংশী, বাবুল সাহা, রিপন সাহা, কৃষ্ণ দাস, সুধির সাহা, রাম পাল, গোপাল ঘোষ, দিলীপ ঘোষের দোকানসহ ১৭ টি দোকানে লুটপাট চালানো হয়। সর্বাধিক ক্ষতিগ্রস্থ হয় রঞ্জন কর্মকারের সোনার দোকানে ব্যাপক লুটপাট করা হয়।
অজিত সরকারের বাড়ির মন্দিরে পুরোহিত যখন কালি পুজার আয়োজন করছিলেন সে সময় হামলাকারিরা হামলা চালায়। পুরোহিত পালিয়ে বাঁচলেও মন্দিরের মূর্তি রক্ষা পায়নি। অজিত সরকারের বাড়ি থেকে পুলিশের কাছে বারবার সাহায্য চাওয়া হলে জানানো হয় ফোর্স রওনা হয়েছে। এভাবেই কেটে যায় প্রায় দুই ঘন্টা। পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়ার পরেও সেখানে লুটেরাদের দল উপস্থিত ছিল। ক্ষতিগ্রস্থরা জানান, পুলিশের উপস্থিতিতেই হামলাকারীরা লুটপাট করে। তখন পুলিশ নিরবে অদূরে দাঁড়িয়ে ছিল। রোববার দুপুরে ঢাকা থেকে আইন ও শালিশ কেন্দ্রের দু’কর্মকর্তা আবু আহমেদ ফজলুল কবির ও মাহবুব আলম ক্ষতিগ্রস্থ মহলা পরিদর্শনে গেলে অধিকাংশ ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি অভিযোগ করেন, পুলিশী উদাসীনতায় তাদের এত ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। পুলিশের পাশাপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকেই। শুক্রবারে এবিষয় নিয়ে যখন মসজিদে জামায়াত-বিএনপি’র ক্যাডাররা প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছিল সেসময় স্থানীয় সরকার দলীয় নেতা-কর্মীরা কোন ভূমিকা রাখেনি। কারণ অনুসন্ধানে জানা গেছে এলাকার আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের সাথে এই এলাকার সংসদ সদস্য স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু’র সম্পর্ক ভাল না থাকায় তারা দীর্ঘ দিন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রয়েছে।

ওই ঘটনার প্রতিবাদে পাবনা শহরে প্রেসক্লাব প্রঙ্গণে বিকেলে হিন্দু- বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ বিক্ষোভ মিছিল মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছে। সমাবেশে ২৪ ঘন্টার মধ্যে দোষীদের গ্রেফতারের দাবি জানানো হয়েছে অন্যথায় দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক দেয়া হবে বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। বক্তব্য রাখেন প্রবীণ সাংবাদিক কলামিস্ট রণেশ মৈত্র, গণেশ ঘোষ, প্রবীর কুমার সাহা, বিনয় জ্যোতি কুণ্ডু, চন্দন চক্রবর্তী, বিনয় ভূষণ রায়, প্রলয় চাকি, ফিলিপ সমাদ্দার খোকন প্রমুখ। এদিকে ঘটনাস্থলে রাজশাহী রেঞ্জের এডিশনাল ডিআইজি খুরশিদ আলম রবিবার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকা পরিদর্শনসহ শান্তি স¤প্রীতি সমাবেশ করেছে। সাাঁথিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন, জেলা প্রশাসক কাজী আশরাফ উদ্দিন, পুলিশ সুপার মিরাজ উদ্দিন, সাঁথিয়া উপজেলা চেয়ারম্যান নিজাম উদ্দিন, আর আতাইকুলা ইউপি চেয়ারম্যান কোরবান আলী, উপজেলা বিএনপি সভাপতি মাহবুব মোর্শেদ জ্যোতি প্রমুখ।
এদিকে হাই কোর্ট রোববার এক আদেশে পাবনার সাম্প্রদায়িক হামলার ঘটনায় দোষীদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয়। এ ঘটনায় অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মুন্সি মুনিরুজ্জামানকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১২ টি পরিবারকে ২ বাণ্ডিল ঢেউ টিন, ৩০ কেজি চাল ও নগদ ৬ হাজার টাকা করে সাহায্য দেয়া হয়েছে।
ওই ঘটনার পর এলাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। আতঙ্কগ্রস্থরা এখনও এলাকা ছেড়ে দূরবর্তী এলাকার আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে রয়েছেন।
পাবনার সাঁথিয়ার বনগ্রামে সংখ্যালঘু হিন্দু স¤প্রদায়ের উপর হামলা, বাড়ীঘর দোকান পাট, মন্দির, ভাঙচুর এবং অগ্নি সংযোগের ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সিপিবি’র জেলা নেতৃবৃন্দ। সিপিবি’র পাবনা জেলা কমিটির সভাপতি সন্তোষ রায় চৌধুরী এবং সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক এক বিবৃতিতে সংখ্যালঘুদের উপর নির্যাতনের ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন। নেতৃবৃন্দ ঘটনার সাথে জড়িতদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবীসহ ক্ষতিগ্রস্থদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য সরকারের নিকট জোড় দাবী জানিয়েছেন।




