মো.মহসিন মাতুব্বর আমতলী (বরগুনা) : একমাস আগে ধান ঘরে উডাইছি, মাত্র সাড়ে ৩ মাসে পাইক্ক্যা যায়, ফলনও অইছে প্রায় দুইগুন। মোরা এতদিন তো এই ধানই বিচরাইছি। খ্যাতের দিগে চাইলে পড়ানডা জুড়াইয়া যায়। কৃষক শাহ আলম শিকদার ক্ষেত ভরা পাকা ধান কাটতে এসে এমন করেই আনন্দ প্রকাশ করলেন। শাহ আলমের মত বরগুনার আমতলী উপজেলার ঘটখালী এলাকার ৃআরও ৭ জন কৃষক মোট ৫ একর জমিতে উন্নত জাতের ধানের আবাদ করে কাংখিত ফলন পেয়ে মহাখুশী।
বৈষ্মিক উষ্মায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় কৃষির দূর্যোগ প্রবনতা মূল্যায়ন ও সাইক্লোনের ব্যাপক ধ্বংস এড়িয়ে চলার কৌশল হিসেবে সরকারের কৃষিবিভাগ বরগুনা জেলায় অটওঋ-ঐঊছঊচ নামের গবেষনামূলক একটি প্রকল্প বাস্তবাযন করছে। স্থানীয় কৃষি বিভাগের সহায়তায়ও কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি গবেষকদের সহায়তায় এ বছর জেলার আমতলী, বরগুনা সদর ও পাথরঘাটা উপজেলায় প্রাথমিক পরীক্ষামূলকভাবে প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে। এ বছর জেলার মোট ৫০ জন কৃষক আমন ও রবি মৌসুমে আলোক অসংবেদশীল, স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এপ্রিল ও অক্টোবর মাসে মধ্যে কর্তনযোগ্য ধান চাষ করে। কৃষকদের প্রশিক্ষন ও নানা পরামর্শ দিয়ে সফলভাবে এ ধানের উৎপাদন করা হয়। প্রকল্পের আওতাধীন জমিতে স্থানীয় জাতের চেয়ে প্রায দ্বীগুন ফলন লাভ পেয়েছে কৃষক। জামাল সিকদারের পাশেই ইয়াসিন মিয়ার জমিতে এখনও সবুজ শীষ। সবুজ সোনালী ধানে রুপান্তরিত হতে এখনও প্রায় একমাস সময লাগবে। ইয়াসিন মিয়ার মনে যখন ঝড়-ঝঞ্জায় ফসল নষ্ট হওয়ায় সংশয় তখন জামালের মুখে খুশির ঝিলিক। এক একর জমিতে এ পদ্ধতিতে ধানের আবাদ করেছিলেন কৃষক জামাল শিকদার। তিনি বলেন, ‘ধান লাগাইয়া মোরা লোকাল ধানের চাইতে প্রায় এক দেড় মাস আগে ধান ঘরে উডাইতে পারছি। ফলনও পাইছি দুই গুন। হেরপর এমন সময় ধানডা ওডছে যে এক্কালে হুগনার ছিজন। কোন ঝামেলা নাই। এহন হইতে মোরা প্রত্যেক বচ্ছর এই ধান লাগামু’। জামালের ক্ষেতের দিকে তাকিযে এ বছর যে আগামীতে ইয়াসিন মিয়া ও এমন ধান আবাদ না করে ভুল করেছেন চোখেমুখে এমন ভাব ষ্পষ্ট। ইয়াসিন মিয়া বলেন, আগামীতে মোরা সবাই এই ধান লাগামু কইরা চিন্তা করছি। জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষি উৎপাদন ঝুঁকি এড়াতে সরকারের এমন প্রকল্প যে কতটা সফল হতে চলেছে ও বরগুনার কৃষিতে বিল্পব ঘটাতে চলতে কৃষক জামাল ও ইয়াসিনের বক্তব্যে তা ষ্পষ্ট।
২ নভেম্বর শনিবার সকালে আমতলী উপজেলার ঘটখালী এলাকায় প্রকল্পের সফল শষ্যকর্তন ও কৃষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এসময় উপস্থিত ছিলেন, প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের উপ-ব্যাবস্থাপক প্রফেসর ড. এমএ হালিম, জেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ লুতফর রহমান, আমতলী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহআলম, জেলা উদ্ভিদ কর্মকর্তা নুরুল ইসলাম ,কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা রেজা ই মাহমুদ ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান বাদলখানসহ প্রকল্পের আওতাভুক্ত কৃষকা-কৃষানীরা।
প্রকল্পের ব্যবস্থাপক ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের উপ-ব্যাবস্থাপক প্রফেসর ড. এমএ হালিম বলেন, বৈষ্মিক উষ্মায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্নিঝড় ও জলোচ্ছাসের প্রবনতা প্রতিবছরই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে বছরের নভেম্বর ও মে মাসে সংগঠিত এসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে উপকূলীয় এলাকার ব্যপক ফসলহানী হয়। বিষয়টি বিবেচনায় এনে সরকারের কৃষিবিভাগ প্রকল্পটি হাতে নেয়। প্রকল্পের আওতায আমন ও রবি মৌসুমে অসংবেদশীল, স্বল্প জীবনকাল বিশিষ্ট এপ্রিল মাসের মধ্যে কর্তনযোগ্য ফসলের চাষ করা হয়। এতে একদিকে যেমন প্রাকৃতিক দূর্যোগ ঝূঁকিমুক্ত অপরদিকে প্রায় দ্বীগুন ফলনের শষ্য উৎপাদন সম্ভব হয়। দেশের উপকূলীয় বরগুনা জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে আমরা এ ধরনের ফসল ফলিয়ে সফলভাবে উত্তোলন করতে সমর্থ হয়েছি। পর্যায়ক্রমে গোটা উপকূলীয় এলাকা এ ফসল চাষের আওতায় আসবে বলে তিনি জানান।
বৈস্মিক উষ্মায়নের প্রভাব মোকাবেলা করতে কৃষি খাতে সরকারের এ ধরনের উদ্যোগে ব্যপক সাড়া মিলেছে। কৃষিবিভাগের সহায়তা অব্যহত থাকলে উপকূলে এ ধরনের ফসল আবাদে ব্যপক সাড়া মিলবে বলে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রত্যাশা।




