মো. কামরুল হাসান, মহম্মদপুর (মাগুরা) : দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে মাগুরা-২ আসনের পথ-প্রান্তর গণসংযোগের মাধ্যমে উত্তপ্ত করে তুলেছেন সম্ভাব্য প্রার্থীরা। মহম্মদপুরের ৮টি, শালিখার ৭টি ও মাগুরা সদরের ৪টি ইউনিয়ন নিয়ে মাগুরা-২ আসনটি গঠিত। নির্বাচনকে ঘিরে নতুনদের পদচারণা আর পুরাতনদের সমালোচনা চলছে সর্বত্রই। আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থীরা নির্বাচনী প্রচারণায় মাঠে নেমে পড়েছেন বেশ জোরে সোরেই। বিএনপিসহ ১৮দলীয় জোট তত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনে আসবে না- এমন ঘোষণা দিয়ে রাখলেও বসে নেই তাদের সম্ভাব্য প্রার্থীরাও। এরই মধ্যে তারা মাঠ কাপিয়ে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে দিয়েছেন। তৃণমূল পর্যায়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করে ধরে রাখতে আওয়ামীলীগ ও বিএনপি থেকে একাধিক প্রার্থী নেমে পড়েছেন নির্বাচনী ময়দানে। বিভিন্ন সভা-সেমিনার, সাংস্কৃতিক ও সামাজিক আচার অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন এসব মনোনয়ন প্রত্যাশীরা। এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীরা বড় বড় বিলবোর্ড, ডিজিটাল ব্যানার ও পোষ্টারের মাধ্যমে নিজেদেরকে এলাকার মানুষের কাছে তুলে ধরছেন। আবার দুই দলের মধ্যে চূড়ান্ত প্রার্থী কারা হচ্ছেন, তা নিয়ে ভোটারদের মধ্যে চলছে আলোচনার ঝড়।
২০০৮ সালের নবম জাতীয় নির্বাচনে এ আসন থেকে নৌকা প্রতীক নিয়ে এমপি নির্বাচিত হন আওয়ামীলীগের মনোনিত প্রার্থী এ্যাড. শ্রী বীরেন শিকদার। মোট ২,৫৮,৪০৩ ভোটের মধ্যে তিনি ১,১৫,২৭৫ভোট পেয়ে বিজয়ী হন। বিএনপির মনোনীত প্রার্থী সাবেক মন্ত্রী এ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী ১,০৯,৮০৮ ভোট পেয়ে পরাজিত হন। নির্বাচনের আগে বিজয়ী আওয়ামীলীগের প্রার্থী ভোটারদের নানা প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিশ্র“তির অধিকাংশই বাস্তবায়ন না হওয়ায় বর্তমানে নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ। তবে সেই ক্ষোভ এবং অসন্তোষ কাটিয়ে উঠতে তিনি বর্তমানে নেতা-কর্মীদের সাথে সমন্বয় ও সম্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। অন্যদিকে মাগুরা-২ এর নির্বাচনী এলাকার আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে দু’টি গ্র“প বিদ্যমান রয়েছে। একটি হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-২ এ্যাড. সাইফুজ্জামান শিখর গ্র“প, অন্যটি হচ্ছে বর্তমান এমপি এ্যাড. বীরেন শিকদার গ্র“প। এ দু’গ্র“পের মধ্যে ব্যাপক সমন্বয়হীনতার কারণে সংসদ নির্বাচনে একটি গ্র“প মনোনয়ন পেলে, অন্য গ্র“পটি বিরোধিত করে। আবার বিএনপির মধ্যেও দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান রয়েছেদু’টি গ্র“প। একটি হচ্ছে কাজি কামাল গ্র“প, অন্যটি এ্যাড. নিতাই রায় গ্র“প। জাতীয় নির্বাচনে ওই দু’টি গ্র“পও পারস্পারিক বিরোধিতা করে থাকে। তারপর ও আওয়ামীলীগের মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা শেখ হাসিনার মনোনিত প্রার্থীকেই ভোট দিয়ে অস্তিত্ব টেকাতে আসনটি ধরে রাখতে চায়। পাশাপাশি বিএনপিও তাদের আভ্যন্তরীণ ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে পূনরুদ্ধার করতে চায় আসনটি।
আগামী নির্বাচনে মাগুরা-২ আসনে এবার আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকজন প্রার্থীর নাম শোনা যাচ্ছে। এর মধ্যে বর্তমান সংসদ সদস্য এ্যাড. শ্রী বীরেন শিকদার, প্রধান মন্ত্রীর একান্ত ব্যক্তিগত সহকারি সচিব সাইফুজ্জামান শিখর, ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি ও বাংলাদেশ হাই কমিশনের কাউন্সিলর এ্যাড. ওহিদুর রহমান টিপু, উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি আলহাজ্ব গোলাম রব্বানী, সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আব্দুল মান্নানের নাম উল্লেখযোগ্য। বিএনপির সম্ভাব্য প্রার্থীর তালিকায় রয়েছেন সাবেক এমপি কাজী সালিমুল হক কামাল ও সাবেক মন্ত্রী এ্যাড. নিতাই রায় চৌধুরী। জাতীয় পার্টির মধ্যে এম. খসরুল আলমের নাম এককভাবে শোনা যাচ্ছে। এদের মধ্যে ১৯৯৬ ও ২০০৮ এর নির্বাচনে এ্যাড. শ্রী বীরেন শিকদার এবং ১৯৯৪ এর বিতর্কিত উপ-নির্বাচন ও ২০০১ এর নির্বাচনে কাজী সালিমুল হক কামাল মাগুরা-২ আসন থেকে নির্বাচিত হন।
নির্বাচন যদি জোটভুক্ত হয় তাহলে মাগুরা-২ আসনে পাল্টে যেতে পারে ভোটের হিসাব-নিকাশ। প্রতিদ্বন্দিতায় আসতে পারে পরিবর্তন। বিএনপি দলীয় প্রার্থী হিসেবে যদি কাজী কামালকে মনোনয়ন দেওয়া হয়, তবে জয়লাভের সম্ভাবনাকে উজ্জল করে দেখছেন স্থানীয় বিএনপির একাংশের নেতা-কর্মীরা। পাশাপাশি এলাকার সার্বিক উন্নয়নে আওয়ামী লীগের বর্তমান এমপি এ্যাড. শ্রী বীরেন শিকদার সফলতার পরিচয় দিতে পারেননি বলে বলে মন্তব্য করছেন মাঠ পর্যায়ের নেতা-কর্র্মীরা। তাছাড়া দলের মধ্যে বিরাজমান অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবারের নির্বাচনে প্রভাব পড়বে বলে মন্তব্য করছেন স্থানীয় অভিজ্ঞমহল। আবার এ সকল বক্তব্যের তীব্র বিরোধিতা করছেন আওয়ামীলীগের স্থানীয় শীর্ষ নেতৃবৃন্দ। তাদের দাবি মহম্মদপুর-শালিখার মাটি আওয়ামী লীগের ঘাঁটি। এখানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা অতীতের মতো ভোট বিপ্লব ঘটাবেন। তবে এ ক্ষেত্রে দলীয় মনোনয়ন একটা বড় ফ্যাক্টর বলে মনে করেন দলের ত্যাগী ও প্রবীন নেতা-কর্মীরা। শেষ পর্যন্ত লড়াইটা যে আওয়ামীলীগ আর বিএনপির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে সে ব্যাপারে একমত পোষণ করছেন দু’টি দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা।
এদিকে বর্তমান সাংসদ এ্যাড. শ্রী বীরেন শিকদারের বিরুদ্ধে দলীয় নেতা-কর্মীসহ ভোটারদের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। তিনি গত নির্বাচনের আগে এলাকায় বিভিন্ন সময়ে নাগরিক সেবার মানোন্নয়ন, রাস্তা ঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ এলাকরার সার্বিক উন্নয়নের প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। কিন্তু নির্বাচিত হওয়ার পর তার এক তৃতীয়াংশ বাস্তবায়ন হয়নি বলে দাবী করেছেন এলাকার সাধারন জনগন। মহম্মদপুর উপজেলা আওয়ামীলীগের বৃহৎ একটি অংশের নেতা-কর্মীরা দাবি করেছেন সরকারি-বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানে এমপির কর্তৃত্ব ছিল সর্বদা।
অভিযোগের পাল্লা বীরেন শিকদারের পক্ষে ভারি হলেও শেষে তিনিই মনোনয়ন পাবেন বলে মাগুরা-২ নির্বাচনী এলাকার আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা ধারণা করছেন। তারপরও মনোনয়ন লাভের দৃপ্ত প্রত্যয় নিয়ে মহম্মদপুর ও শালিখার মাঠ প্রান্তর চষে বেড়াচ্ছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারন সম্পাদক এ্যাড. আব্দুল মান্নান। সাম্প্রতিক সময়ে আবার বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কর্মকান্ড, মসজিদে অনুদান ও সভা-সেমিনারে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস-২ সাইফুজ্জামান শিখর। তার অনুসারী নেতা-কর্মীরাও মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে থাকার সুবাদে এ আসনে নতুন মুখ হিসেবে তিনিও মনোনয়ন পেতে পারেন। এ্যাড. ওহিদুর রহমান টিপু লন্ডনের বাংলাদেশী দুতাবাসের কন্সোলর হওয়ায় মনোনয়ন পেতে সেখান থেকেই তিনি লবিং চালিয়ে যাচ্ছেন বলে খবর পাওয়া গেছে। সম্প্রতি তিনি নির্বাচনী এলাকায় ফিরে এসে বেশ প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে আবার লন্ডনে ফিরে গেছেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি গোলাম রব্বানী মনোনয়ন প্রত্যাশী হলেও তাকে কোন প্রচার-প্রচারনা চালাতে দেখা যাচ্ছেনা। জাতীয় পার্টি থেকে সাধারণ সম্পাদক এম খসরুল আলম একাই নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। তিনি শহরের বীর প্রতীক ইয়াকুব মিয়া মার্কেটে একটি অফিস নিয়ে নেতা-কর্মীদের সাথে সমন্বয় রেখে চলেছেন।
বিএনপির মধ্যে ও দুটি গ্র“প বিদ্যমান থাকায় নেতা-কর্মীরা সব সময় একে অপরের দোষারোপ করে থাকেন। সাবেক মন্ত্রী বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-আইন বিষয়ক সম্পাদক এ্যাড. নিতায় রায় চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরেই নেতা-কর্মীদের সাথে সমন্বয়ের পাশাপাশি এলাকায় সভা-সমাবেশের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারনা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ কারনে বিএনপির নেতা-কর্মীরা ধরে নিয়েছিলেন তিনিই বিএনপি থেকে মনোনয়ন পাচ্ছেন। সম্প্রতি সাবেক এমপি কাজি কামাল মহম্মদপুর ও শালিখায় কয়েকটি জনসভা করায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে। তার অনুসারী নেতা-কর্মীরা এখন মনে করছেন বিএনপি থেকে তিনিই মনোনয়ন পাচ্ছেন।




