প্রতীক ওমর, বগুড়া : বগুড়াসহ উত্তরাঞ্চলের প্রায় ৩০ শতাংশ জমির ধান কাটা ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। একই সাথে শুরু হয়েছে নতুন ধান বেচা-কেনা। ন্যায্য দাম পাচ্ছে না কৃষকরা। চাষিরা বলছেন ‘আল্লাহ এবার ধান দিছে। যদি ন্যায্য মূল্য পাওয়া যায়’ তা হলেই কেবল মাত্র শ্রম স্বার্থক। অতিতের মত এবারো লাভের ভাগ ফড়িয়া-আড়তদারদের পকেটে উঠছে।

গত তিন বছরের মত এবারও উত্তরাঞ্চলে বোরোর বাম্পার ফলন হয়েছে। তারপরেও বরাবরের মত এবারো লোকসানের মুখ দেখতে পারে বোরো চাষিরা। উত্পাদন খরচের সাথে ধানের বিক্রি মূল্যের সমন্বয় না থাকায় চাষিরা এই লোকসানের শিকার হচ্ছেন। অপর দিকে গত বছর উত্পাদিত ধান ও চালের পর্যাপ্ত মজুদ থাকা সত্তে¡ও দেশের বাহির থেকে চাল আমদানী অব্যহত রয়েছে। এর বিরুপ প্রভাব পরতে পারে চলতি বোরো মৌসুমের উত্পদিত ধান-চালের উপর। আর্থিক ক্ষতির শিকার হতে পারে লাখো বোরো চাষি।
দেশে ২০১২-২০১৩ অর্থ বছরে ১৬ কোটি মানুষের জন্য চালের বার্ষিক চাহিদা ২ কোটি ৮০ লাখ মে.টন। বার্ষিক উত্পাদন ৩ কোটি ২০ লাখ মে.টন। উদ্বৃত্ত ছিল ৪০ লাখ মে.টন বিআইডিএস এর তথ্য অনুসারে। অপরদিকে খাদ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুসারে গত অর্থ বছরে দেশে চালের উত্পাদন ছিল ৩ কোটি ৩৮ লাখ মে.টন। চাহিদা ছিল ৩ কোটি ২০ লাখ মে.টন। গত বছর উদ্বৃত্ত ছিল ১৩ লাখ মে.টন।
জুলাই থেকে জানুয়ারি পর্যন্ত চাল আমদানীর জন্য এলসি খোলা হয়েছে ( লেটার অব ক্রেডিট) ১৭ কোটি ৪৭ লাখ ডলারের। নিস্পত্তি হয়েছে ১২ কোটি ৬৭ লাখ ডলারের। ফেব্রুয়ারি মাসে ৫ কোটি ডলারের বেশি এলসি খোলা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ি গত বছর একই সময়ে এর অর্ধেক পরিমান চাল আমদানীর এলসি খোলা হয়েছিল। এবার দেশে পর্যাপ্ত মজুদ থাকার পরেও গত বছরের চেয়ে দ্বিগুণ পরিমান চাল আমদানী হয়েছে। আমদানীর জন্য বিপুল অংকের এলসি খোলা অব্যাহত আছে। আমদানী করা চাল দেশে প্রবেশ অব্যাহত আছে।
দেশে প্রচুর পরিমান অর্থাৎ এ মুহূর্তে প্রায় ১২ লাখ মে.টন চাল ও ৩ লাখ মে.টন গম সরকারি মজুদ থাকলেও ব্যবসায়িরা চাল আমদানী অব্যাহত রেখেছে। তার পরেও সিন্ডিকেট ব্যবসায়িদের কারসাজিতে চালের বাজার কমেনি। বরং বেড়েই চলেছে। তিন মাস আগের চেয়ে চালের বাজার কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৫ টাকা পর্যন্ত। যে পরিমান চাল আমদানীর এলসি খোলা হয়েছে এবং আমদানী শুরু হয়েছে তাতে বোরো মৌসুমের আগ পর্যন্ত আমদানী করা চাল দেশে আসতে থাকবে। জানুয়ারি ফেব্রুয়ারি এবং মার্চ মাসে প্রায় ৪ লাখ মে.টন চাল আমদানী হয়েছে। বাঁকি ৭ লাখ মে.টন চাল আমদানী পাইপ লাইনে আছে।
সব কিছু ঠিক থাকলে দেশে এবারো বোরোর বাম্পার ফলন হবে। ১ কোটি ৯০ লাখ মে.টন চাল উত্পাদন হবে। দেশের মিলার এবং ব্যবসায়িদের গুদামে মজুদ আছে ৯০ লাখ টন। সরকারি মজুদ ১৪ লাখ মে.টন। আমদানী করা চাল ১৫ লাখ মে.টন। সব মিলে দেশে চালের কোন ঘাটতি থাকবে না। প্রচুর উদ্বৃত্ত হয়ে যাবে। ঠিক ভরা মৌসুমের আগে প্রচুর আমদানী উত্পাদিত বোরো ধানের দাম নেমে যাবে। গত ৫ বছর ধরে কৃষক লোকসান গুণছে। এবারো বোরো উত্পাদন খরচ বৃদ্ধি ভরা মৌসুমে প্রচুর আমদানী ও মিলারদের গুদামে প্রচুর মজুদের কারণে বোরো কাটা মাড়াইয়ের সময়ে দাম পরে যাওয়ার আশংকায় উদ্বিগ্ন কৃষক এবং বাজার অর্থনীতি বিশেষজ্ঞরা।
ইতোমধ্যে সরকার ধানের সংগ্রহ মূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি কেজি ২০ টাকা এবং চাল প্রতি কেজি ৩১ টাকা দরে। খাদ্যা বিভাগ সূত্রে জানাগেছে আগামী ২০ মে মিলারদের চুক্তি বদ্ধ হওয়ার নির্ধারিত সময় থাকলেও বলা হয়েছে ১৫ মের মধ্যে চুক্তি বদ্ধ হতে। কিন্তু আজও সরকারি ভাবে ধান ও চাল সংগ্রহ শুরু না হওয়ায় কৃষকের মাঝে হতাশা বাড়ছে। এদিকে আগেভাগেই ফড়িয়াদের অর্থের যোগান দিয়ে তাদের ধান ক্রয়ে হাটে ও গ্রামে গ্রামে মাঠে নামিয়েছে আড়তদাররা। ধানের বাজার এখন ফড়িয়াদের দখলে। ধান কেনার জন্য তারা হাট ছেড়ে কৃষকের বাড়ি বাড়ি যাচ্ছে। বগুড়ার রনবাঘা এলাকার কৃষকরা জানিয়েছে ধান কিনতে ব্যাপারিদের লোকজন গ্রামে ঢুকেছে। একারণে হাটে বেশি ধান ওঠে না। তবে ধান কাটা শেষ হলে অধিক দামের আশায় কৃষকরা হাটেও ধান আনবে। উত্তরাঞ্চলে ধানের হাট বাজারে পারি ধান বিক্রি হচ্ছে ৫৮০থেকে ৬১০টাকা প্রতিমণ। মিনিকেট বিক্রি হচ্ছে ৭০০থেকে ৭৬০টাকা প্রতিমণ। জানা গেছে, আড়তদাররা ফড়িয়াদের একটি নির্দিষ্ট মূল্য বেঁধে দিয়ে আগে ভাগে ধান সংগ্রহ করছে। ফড়িয়াদের মণ প্রতি ৫-৮ টাকা কমিশনে ধান কিনছে। আড়তদাররা ও মিলারদের বেঁধে দেওয়া দামের চেয়ে কম দামে ধান কিনে সেই অতিরিক্ত টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ফড়িয়ারা।
চলতি বোরো মৌসুমে সারাদেশে ৪৭ লাখ ৮০ হাজার হেক্টর জমি চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে । চাল উত্পাদনের লক্ষমাত্রা ধরা হয়েছে ১ কোটি ৮৯ লাখ ৬০হাজার মেট্রিক টন। এর মধ্যে শুধুমাত্র উত্তরাঞ্চলেই প্রায় এক তৃতীয়াংশ চাষের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলে ৮লাখ ৩৮হাজার ৯৯৪ হেক্টর। চাল উত্পাদনের লক্ষমাত্রা ৩২লাখ ৯২হাজার ৫২মেট্রিক টন। রংপুর অঞ্চলে চাষের লক্ষমাত্রা ৭ লাখ ৭০হাজার ২ হেক্টর জমি। চাল উত্পাদনের লক্ষমাত্রা ৩১লাখ ১১হাজার ১২৪ মেট্্িরক টন। চাল উত্পাদনে উত্তরাঞ্চলের চাষিরা এগিয়ে থাকলেও গত পাঁচ বছর ধরে লোকসানেই আছেন তারা।
গত ২০১০-২০১১ অর্থবছরে বগুড়া জেলায় মোট খাদ্য চাহিদা ছিল ৫লাখ ৫৪হাজার ৮৬ মেট্রিক টন খাদ্য তি্পাদন হয়েছিল ১১লাখ ৪৯হাজার ২৪৫ মেট্্িরক টন। চাহিদা পুরণের পর খাদ্য বাড়তি উত্পাদন ছিল ৬লাখ ৪৩হাজার ৭৫৯ মেট্রকি টন। ২০১১-২০১২ অর্থবছরে খাদ্য চাহিদা ছিল ৫লাখ ১২হাজার ৯৬৮ মেট্রিক টন, নীট খাদ্য উত্পাদন হয়েছিল ১২লাখ ১৬হাজার ১৮৫ মেট্রকি টন। চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি ছিল ৭লাখ ৩হাজার ২১৭ মেট্্িরক টন। ধারাবাহিক ভাবেই জেলায় খাদ্যের চাহিদা মিটিয়ে বাড়তি খাদ্য জাতীয় ভাবে চাহিদা পূরণে সহায়ক ভূমিকা রাখে। বগুড়ার পাশাপার্শি উত্তরের ১৬ জেলায় এবার বোরোর ভালো ফলনের আশা করছে কৃষক। এবার শুধুমাত্র বগুড়া জেলায় বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ১লাখ ৯২হাজার ২৪৭ হেক্টর জমি। চাল উত্পাদনের লক্ষ্যমাত্রা ৭লাখ ৫৬হাজার ৬৯৭ মেট্রিক টন। এর মধ্যে হাইব্রিড ২০হাজার ৭৯৭ হেক্টর, উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ৯৮হাজার ১১৮ মেট্রিক টন, উফশী ১লাখ ৬৯ হাজার ৪৫৫, উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ৬লাখ ৫৪হাজার ৪৩৮,স্থানীয় জাত ১হাজার ৯৯৫। উত্পাদন লক্ষ্যমাত্রা ৪হাজার ১৪১ মেট্রিক টন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, এবার জেলায় মোট সারের চাহিদা ছিলো ইউরিয়া ৫০হাজার ৩৬৮ মেট্রিক টন,টিএসপি ২হাজার ৩৭০মেট্রিক টন,ডিএসপি ১হাজার ২৭০ মেট্্িরক টন, এমপিও ১৭হাজার ৩০০ মেট্্িরক টন,জিপসাম ১৩হাজার ৮০০ মেট্রিক টন, জিংক সালফেট ১হাজার ৮শ’ ৭৩ মেট্রিক টন।
জেলায় বিদ্যুৎ চালিত সেচন্ত্রের সংখ্যা ১০হাজার ৫১৩ টি। ডিজেল চালিত রয়েছে ৬৭হাজার ৪৯৭টি। এর মধ্যে গভীর নলকুপ ১১১টি,অগভীর নলকুপ ৬৭হাজার ৬৪ টি, এল এল পি ৩২২টি। পূরো মৌসুমে মোট ডিজেলের চাহিদা ৩৭হাজার ৩০০ মেট্রিক টন, মবিলের চাহিদা ৮১৫ মেট্রিক টন। এছাড়াও প্রতিদিন বিদ্যুৎ চাহিদা ছিলো গড়ে ৭০ মেগাওয়াট।




