৭ এপ্রিল ২০১৪ সোমবার সকাল। ঘুম থেকে জেগে নিজের অজান্তেই অনাহুত সিদ্ধান্তে সম্মত হলাম- কোথাও বেড়াতে যাবো। রোজনামচার তালিকায় আজ আর কোন কাজ নেই। ঘুম থেকে ওঠে প্রাতক্রিয়াদি সম্পাদন করে প্যান্ট পরিধান করে আর কালো গেঞ্জী গায়ে জড়িয়ে ফাইল ব্যাগ ও সাপোর্ট লাঠি হাতে বাসা থেকে বের হবো; গিন্নীও স্কুলে যাবার জন্য প্রস্তুত। মেয়েটার জ্বর! তাই সে কলেজে যেতে পারবে না, ছেলেটার পরীক্ষা, সে পড়ছে। গিন্নী বললেন, কোথাও যাবে নাকি? জবাবে বললাম, হ্যাঁ। নালিতাবাড়ি যাবো।

আশারাফ ভাইকে ফোন করলাম। ফোনটা বেজে কেটে গেল। তিনি ধরলেন না। অবশ্য পরক্ষণেই কল ব্যাক করলেন। এটা তার আভিজাত্য। আমাকে পয়সা খরচ করতে দিবেন না। আজও তা-ই করলেন। সালাম জানিয়ে বললাম, ভাল আছেন তো? আমি নালিতাবাড়িতে আসছি। তিনি খুব খুশি হলেন। বললেন, সত্যি আসবেন? বললাম, হ্যাঁ আসবো। আশরাফ ভাই বললেন, আপনার ভাবী ঢাকায় গেছেন। আজ আমি রান্না করে আপনাকে খাওয়াবো। দুপুরে আপনি আমার বাসায় খাবেন। তিনি বললেন, অনেক দিন আপনাকে দাওয়াত দিয়েছি, কথা রাখেননি। আজ কিন্তু কথা রাখতে হবে। আমি স্মিতহাস্যে আশরাফ ভাইকে কথা দিলাম।
শেরপুর জেলা শহর থেকে সিএনজি ছাড়া কোন বাস-মিনিবাস নালিতাবাড়ি রুটে যাতায়াত করে না। মসৃণ কালো পিচঢালা পথ। দু’ধারে সবুজ ফসলের মাঠ। মাঝে মাঝে রাস্তার পাশে দু-চারটে বাড়ি। স্কুল, মসজিদ, মাদ্রাসা, হাট-বাজার, কালিবাড়ি-তিনআনী-চেলাখালি। তারপর প্রাচীন জনপদ নালিতাবাড়ি। সিএনজি এসে থামল। উপজেলা পরিষদ গেটের পাশে খোলা একটি চায়ের স্টলের ব্যাঞ্চিতে বসা জাতীয় পার্টির নালিতাবাড়ি উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মোঃ হাবিবুর রহমান (বাবু)। আমাকে দেখে সালাম জানালেন। আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। কুশলাদি জিজ্ঞাসার পর তিনি চা-পান আপ্যায়ন করলেন। সেই ১৯৮০’র দশকের কথা। ময়মনসিংহ আনন্দমোহন কলেজে আমি তখন মাস্টার্সের ছাত্র। নালিতাবাড়ি শহীদ আব্দুর রশিদ কলেজের অধ্যক্ষ মোঃ সিরাজউদ্দৌলাহও মাস্টার্সের ছাত্র ছিলেন। হাবিবুর রহমান (বাবু), প্রভাষক ফজলুর রহমান, যুগেন রায়, আ: সোবহান, রেজাউল করিম, মোস্তাক আহমেদ রিপন, জামাল উদ্দিন সহ নালিতাবাড়ির বেশ কয়েকজন ছাত্র/ছাত্রী তখন অনার্সে পড়তেন। ডালিয়া নামে একজন ছাত্রীও ছিলেন। ডালিয়া নাম্নী মেয়েটি আনন্দমোহন কলেজ ক্যাম্পাসে কথা প্রসঙ্গে বলেছিলেন, একজন মানুষ তার জীবনে ৪০ বছর সংগ্রাম করে সে সংগ্রামের ফল যদি তিনি দু’বছর ভোগ করতে পারেনÑ তাতেই তার জীবন স্বার্থক। এতগুলো বছর পরেও ছাত্রীটির সেই উক্তি আমার আজও মনে আছে।
নালিতাবাড়ি উপজেলা পরিষদে গিয়ে প্রথমেই দেখা হ’ল সাবেক উপজেলা চেয়াম্যান এবং ১০ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী কৃষিবিদ আলহাজ্ব বদিউজ্জামান বাদশা ও নালিতাবাড়ি পৌরসভার মেয়র স্নেহাস্পদ মোঃ আনোয়ার হোসেন ভিপি’র সাথে। কুশল বিনিময়ের পর দুই নেতা উপরে হলরুমে চলে গেলেন। সেখানে বাংলা নববর্ষ (১৪২১) উপলক্ষে মিটিং আছে। উপজেলা ইঞ্জিনিয়ার আনোয়ার পারভেজ- জামালপুরের সন্তান। তার রুমে ঢোকেই দেখি ঝিনাইগাতী উপজেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি ও উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী এস এম ওয়ারেজ নাইম ও নালিতাবাড়ি উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক এবং উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে পরাজিত চেয়ারম্যান প্রার্থী মুকসেদুর রহমান লেবু। তাদের উভয়ের বিধ্বস্ত চেহারা দেখে আমার মনেও খুব কষ্ট বাড়ে। তারা দুই প্রার্থী নির্বাচনে হেরে গেছেনÑ আমার কষ্ট সে জন্য নয়। আমার কষ্ট বেড়েছে দলীয় কিছু নেতাকর্মী ব্যক্তিস্বার্থে কিভাবে এই দুই প্রার্থীকে কৌশলে অসহযোগিতা করেছে সেজন্য। কিছুক্ষণ পর জননেতা আলহাজ্ব বদিউজ্জামান বাদশা রুমে ঢোকলেন। সবাই দাঁড়িয়ে তাকে সম্মান জানালেন। তিনি বাথরুমে গেলেন। যোহরের নামাজ আদায়ের জন্য অযু করবেন। কিছুক্ষণ পর বদিউজ্জামান বাদশা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন। বললেন, আগামী ১৫ এপ্রিল আমি সউদী আরব যাচ্ছি ওমরাহ পালনের জন্য। সেখানে আমি ১৫দিন অবস্থান করব। আপনারা আমার জন্য দোয়া করবেন। পবিত্র মক্কা শরীফে গিয়ে আমাদের জন্য দোয়া করবেন বলে আমরাও তার কাছে দোয়া চাইলাম।
উপজেলা প্রকৌশলীর কক্ষে কাকতালীয়ভাবে একই সাথে তিনজন প্রার্থীর (নেতার) উপস্থিতি। একজন ১০ম জাতীয় সংসদের নকলা-নালিতাবাড়ি নির্বাচনী এলাকার এমপি প্রার্থী। একজন ঝিনাইগাতী উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী এবং একজন নালিতাবাড়ি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান প্রার্থী। তিনজনই স্ব স্ব ক্ষেত্রে পরীক্ষিত নেতা। জননেতা আলহাজ্ব বদিউজ্জামান বাদশা একজন কেন্দ্রীয় নেতা। নকলা-নালিতাবাড়িতে নতুন প্রজন্ম ও মধ্য বয়সীর মানুষের কাছে তিনি প্রিয় ব্যক্তিত্ব। মূলত সাধারণ মানুষের সাথে একাত্ম হতে না পারলে কোন নেতাই জনপ্রিয় হতে পারেন না। তবে জননেতা বাদশার এই গুণটি আছে।
১৯৮০’র দশকে বিশেষ করে ১৯৮৩-১৯৮৮ এই সময়ে আমি ময়মনসিংহ আনন্দমোহন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজে মাস্টার্সে অধ্যয়নরত ছিলাম এবং আমরাই ভয়াবহ সেশন জটের শিকার হয়েছিলাম। স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে আমরা সরাসরি জড়িত ছিলাম। তখন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি, প্রচন্ড সাংগঠনিক কর্মক্ষমতার অধিকারী, মেধাবী ছাত্রনেতা ও অনলবর্ষী বক্তা বদিউজ্জামান বাদশা স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে মাঝে মধ্যে আনন্দমোহন কলেজে আসতেন। আমরা ছাত্রলীগ, ছাত্র ইউনিয়ন ও অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মীরা একসাথে আন্দোলনে অংশ নিতাম। হালুয়াঘাট উপজেলার নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান আনন্দমোহন কলেজের সাবেক ভিপি ফারুক আহমেদ খান, ভিপি মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, জিএস কাজী আজাদ জাহান শামীম, কবি ও অধ্যাপক গাউসুর রহমান, আনন্দমোহন কলেজ ছাত্র সংসদের তৎকালীন সাহিত্য সম্পাদক ও ব্রাকের গবেষণা কর্মকর্তা নাদেজদা ফাতেমা শিখা, কবি ও সাংবাদিক সৌরভ জাহাঙ্গীর, কবি সাদি রহমান, কবি ও গবেষক স্বপন ধর, কবি ও নাট্যকার আলী আক্কাছ, ময়মনসিংহ জেলা ছাত্রনেতা শহীদ সাংবাদিক নোমান, প্রভাষক জিলু মামাসহ আরও অনেকেই আমরা আন্দোলনের অগ্রসেনানী ছিলাম। ১৯৮৭ সালে ভিপি মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুলের সাথে গফরগাঁও কলেজে ছাত্রলীগের নবীনবরণ অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। সে সময় আমি আর জেলা ছাত্র ইউনিয়নের নেতা মঞ্জরুল আহসান বুলবুল (বর্তমানে বিএফইউজের এক খন্ডের সভাপতি ও বৈশাখী টিভির প্রধান বার্তা সম্পাদক) ময়মনসিংহে সাংবাদিকতা করতাম। বুলবুল দৈনিক জাহানের বার্তা সম্পাদক ছিলেন। আমি ছিলাম দৈনিক আজকের বাংলাদেশ পত্রিকার সরকারী সম্পাদক (১৯৮৫-১৯৯০) এর আগে আমি ১৯৮৩-১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ময়মনসিংহ থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক সফিয়া’র সম্পাদক ছিলাম।
মূখ্যতঃ আমি ১৯৮০‘র দশকের গোড়া থেকেই রাজধানী ঢাকায় সাংবাদিকতা পেশার সাথে যুক্ত। ১৯৮১-১৯৮২ সালে দৈনিক দেশবাংলার সাব-এডিটর ছিলাম এবং ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সাপ্তাহিক জনকন্ঠ-এর চিফ এসিস্ট্যান্ট এডিটর ছিলাম। বর্তমানে দৈনিক ঢাকা রিপোর্ট -এ চিফ এসিস্ট্যান্ট এডিটর হিসেবে কর্মরত। জাতীয় সাহিত্য সংগঠন ‘লেকশি’র প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হিসেবে আমি আজও দায়িত্ব পালন করে আসছি।
সহৃদয় পাঠক, আমার জীবনটাই দুর্ঘটনায় কবলিত। ১৯৭৭ সালের নভেম্বরে আমি শ্লো-পয়েজনিং এর নির্মম শিকার হয়ে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান ১৫টি বছর মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়েছি। ট্রেন দুর্ঘটনা, বাস দুর্ঘটনা এবং নৌ- দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রত্যেক বারই আমি মৃত্যুর মুখোমুখী হয়েছি। ২০০০ সালে এক দুর্ঘটনায় আমার বাম পায়ের হাঁটু ভেঙ্গে যায়। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর যেই না কিছুটা স্বাভাবিক হলাম-আবার ২০১২ সালে আরেক দুর্ঘটনায় বাম পায়ের হাঁটুর সেই অংশটিই আবার ভেঙ্গে গেল। অনেক চিকিৎসার পরও আর স্বাভাবিক হাঁটা-চাড়া করতে পারিনা- তাই এবার হাতে লাঠিও নিয়েছি। দ্বিতীয়বার দুর্ঘটনায় পতিত হলে শেরপুরের জেলা প্রশাসক, বিশিষ্ট নজরুল গবেষক ও কবি মোঃ জাকীর হোসেন স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে আমার চিকিৎসার জন্য আর্থিক আনুকূল্যের ব্যবস্থা করেন। এজন্য জেলা প্রশাসক সাহেবের কাছে আমি ঋণী।
প্রিয় পাঠক, আসলেই শিবের গীত গেয়ে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না যেন। আজকের দিনটাই আমার কাছে এলোমেলো মনে হচ্ছিল। কোন কাজ না থাকায় সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলাম না। এই যে আমি নালিতাবাড়িতে এসেছি। আমার কত বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয় স্বজন রয়েছেনÑ কারও হদিস করিনি। কারও বাসায় যাইনি। তবে একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করেছি; পথচারী থেকে দোকানদার পর্যন্ত সবাই আমার দিকে অন্যরকমভাবে তাকিয়েছিল। মাথায় লম্বা চুল তার উপর ক্যাপ, বাম হাতে ফাইল ব্যাগ আর ডান হাতে লাঠি নিয়ে আমি হাঁটছিলাম। নালিতাবাড়ি উত্তর বাজার যাবার পথে নদীতে ফেরী দেখে আমার নৌকায় ওঠার খুব ইচ্ছে হলো। তাই সোজা ফেরী ঘাটে ছুটে এলাম। নৌকায় ওঠে নিজেই রশি টেনে পারাপারে মাঝিকে সাহায্য করলাম। ফেরীর যাত্রীরা আমার কান্ড দেখে হাসাহাসি করছিলেন। আমার যে কি ভাল লাগছিল…………….।
ফেরার পথে ভাবলাম অব্যশই আশরাফ ভাইয়ের সাথে দেখা করে যাবো। ভদ্রলোক নিজে রান্না করে এত যতœ আত্তি করে খাওয়ালেন- বড় রুই মাছ, মাংস ইত্যাদি সত্যি খুব ভাল লেগেছে। কিন্তু আশরাফ ভাইয়ের সাথে আর দেখা হল না। নকলা থেকে সাংবাদিক সেলিম হোসেন মোবাইল করেছেন। রিসিভ করতেই বললেন, চাচা, জরুরি প্রয়োজনে আপনাকে ৭বার কল দিয়েছি। বললাম-তাই নাকি? মোবাইল তো সাথেই ছিল-আমি কোথায় ছিলাম!! ঠিক আছে আপনি অপেক্ষা করুন- আমি আসছি।
মোবাইলে অনেক মিস কল এসে জমা হয়েছে। সিএনজিতে বসা অবস্থায় একাধিকবার মোবাইলে রিং বেজে উঠে। মোবাইলে ক্লিক করে দেখি, নকলা উপজেলা প্রেস ক্লাবের সহ-সম্পাদক শফিউজ্জামান রানার মোবাইল নাম্বার। কল ব্যাক করলাম। রানা কল রিসিভ করেই বললেন, বাজান, আপনি কোথায়? আপনার জন্য আমরা উপজেলা প্রেস ক্লাবে অপেক্ষা করছি। আপনাকে জরুরি দরকার। বললাম, আমি আসছি। আমাকে নিয়ে সিএনজি চললো নকলার পথে। কালো পিচঢালা পথ। রাস্তার দু’ধারে সবুজ ফসলের মাঠ। মাঝে মাঝে রাস্তার দু’পাশে দু’চারটি বাড়ি। মসজিদ, মাদ্রাসা, স্কুল, হাট-বাজার ইত্যাদি। কাপাসিয়া-তালতলী-ধনাকুশা। তারপর নকলা উপজেলা সদর। সিএনজি এসে থামল। সাংবাদিক সেলিম হোসেন অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। বললাম, বাজান, কি দরকার? কয়া ফালান। আমাকে আবার নকলা উপজেলা প্রেস ক্লাবে অপেক্ষমান সাংবাদিকদের সাথে দেখা করে শেরপুরে ফিরে যেতে হবে।
লেখক : কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট।




