মেহের আমজাদ, মেহেরপুর : দীর্ঘ ১৬ বছরেও শেষ হলো না মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের নির্মাণ কাজ। আর কত অপেক্ষার প্রহর গুণতে হবে মুজিবনগর তথা মেহেরপুর বাসীকে। আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের আগেই কি বিলুপ্ত ঘোষণা করতে হবে মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সে নির্মিত সকল স্থাপনা। এমন প্রশ্ন তাড়া করে ফিরছে মেহেরপুর বাসীকে। মাত্র পাঁচ কোটি টাকার বরাদ্দের অভাবে দর্শনার্থীদের জন্য খুলে দেয়া সম্ভব হচ্ছে না মুজিবনগর স্মৃতি কমপ্লেক্সের দর্শনীয় স্থাপনাগুলো।
মুক্তিযুদ্ধকালীন সরকারের শপথ স্থান মেহেরপুরের মুজিবনগরকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে নির্মাণাধীন মুজিবনগর স্মৃতি কেন্দ্রের নির্মাণ কাজ দীর্ঘ ১৬ বছরেও শেষ হয়নি। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের সামনে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস তুলে ধরার প্রয়াসে নির্মীয়মান এ স্মৃতিকেন্দ্রের কাজ মাত্র পাঁচ কোটি টাকার অভাবে আটকে আছে। তবে আগের প্রতিমন্ত্রীর মতই এবারো মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী প্রতিশ্রæতি দিলেন চলতি বছরের মধ্যেই কাজ সম্পন্ন হবে।

১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মেহেরপুর জেলার মুজিবনগরে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রথম বাংলাদেশের প্রথম সরকার গঠিত হয়। তার প্রেক্ষিতে মুজিবনগর ছিল বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাজধানী। সেই স্মৃতিকে ধরে রাখতে ১৯৯৬ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার প্রকল্পটি হাতে নেয়। সে অনুযায়ী মেহেরপুরের ঐতিহাসিক আ¤্রকাননকে ঘিরে ৮০ একর জমি অধিগ্রহণ করা হয়। ১৯৯৮ সালের জুলাইয়ে এর নির্মাণ কাজ শুরু হয়। ঐ সময় ব্যয় ধরা হয়েছিল ২৯ কোটি ২১ লাখ টাকা। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রকল্পটির কাজ শুরু হলেও নির্মাণের দায়িত্বে ছিল গণপূর্ত অধিদপ্তর। তবে নকশা ও পরিকল্পনা সহ যাবতীয় কাজের তদারকি ছিল মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের হাতে। ২০০১ সালের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও আজও তা শেষ হয়নি। ২০০৮ সালে পুনরায় আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর প্রকল্পটির ব্যয় ৪৭ কোটি ৭ লাখ টাকায় উন্নীত করে। তারপরও প্রকল্পটির কাজ শেষ না হওয়ার জন্য অর্থের অভাবকেই দায়ী করছে গণপূর্ত বিভাগের স্থানীয় দপ্তর।
মেহেরপুর গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী আহসান উল্লাহ জানান, বছর দুয়েক আগে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব সহ সংশ্লিস্ট বিভিন্ন দপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা স্মৃতি কেন্দ্রের কাজ পরিদর্শন করেন। কেন্দ্রটির নির্মাণ কাজ দ্রæত শেষ করা, দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে ২০টি পাবলিক টয়লেট ও টিউবওয়েল স্থাপন এবং মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্মৃতি সম্বলিত একটি ফটক নির্মাণের জন্য তারা বাজেট ও পরিকল্পনা প্রেরণের নির্দেশ দেন। নির্দেশনা মত ৫ কোটি টাকা বরাদ্দ চেয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে পরিকল্পনা পাঠানো হয়েছে গত বছর। কিন্তু আজ পর্যন্ত সে বিষয়ে কোন সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। এখন কাজ শুরু করলে ব্যয় আরও বাড়বে বলেও তিনি জানান।
মুজিবনগর উন্নয়ন বাস্তবায়ন ফোরামের আহবায়ক ও বাগোয়ান ইউপি চেয়ারম্যান আয়ুব হোসেন বলেন, প্রতি বছর ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর দিবসে আসেন অনেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা। নির্মাণ কাজ শেষ করার প্রতিশ্রæতিও দেন তারা। সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ক্যাপ্টেন এবি তাজুল ইসলাম কয়েকবার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন। প্রধান মন্ত্রী শেখ হাসিনাও মুজিবনগরের উন্নয়নে যা যা করা দরকার তাই করা হবে বলে প্রতিশ্রæতি দিয়েছিলেন ২০১১ সালের ১৭ এপ্রিল। মেহেরপুর বাসী সেই প্রতিশ্রæতির আশায় স্বপ্ন দেখে দিন কাটাচ্ছে।

স্মৃতি কেন্দ্রে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক স্মৃতি মানচিত্র, মুক্তিযোদ্ধাদের আবক্ষ মূর্তি কক্ষ, মিলনায়তন ও প্রশাসনিক ভবন। রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সম্বলিত আরও কিছু দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। এর মধ্যে প্রমাসনিক ভবন ও মিলনায়তনের কাজ কয়েক বছর আগে শেষ হলেও বিদ্যুত সংযোগ ও প্রয়োজনীয় লোকবলের অভাবে দর্শনার্থীদের জন্য তা খুলে দেয়া হয়নি।
মানচিত্রের বাইরে নির্মাণ করা হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষনের ম্যুরাল, ২৫ মার্চের কালোরাত্রির চিত্র, পাক বাহিনীর নারী নির্যাতনের চিত্র, ১৭ এপ্রিল মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠান, বার আনসার কর্তৃক গার্ড অব অনার প্রদান ও সেক্টর বন্টন সহ জেনারেল অরোরা, নিয়াজি এবং একে খন্দকারের উপস্থিতিতে পাক বাহিনীর আত্মসমর্পনের দৃশ্য স্মবলিত ভাস্কর্য। সব মিলিয়ে মুজিবনগর দর্শনার্থীদের জন্য একটি আকর্ষনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে।
মেহেরপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যাপক ফরহাদ হোসেন জানান, স্বাধীনতার শপথভূমি এই মুজিবনগরকে বিশ্ব দরবারে যথাযথ ভাবে উপস্থাপনের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। এখানে স্থলবন্দর, রেল লাইন ও বিশ্ব বিদ্যালয় সহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের প্রতিশ্রযতি পাওয়া গেছে।




