এম লুৎফর রহমান, নরসিংদী : দীর্ঘ প্রায় ৩ দশকেও বাঙালীর বাংলাদেশে বাংলা নববর্ষ উদযাপন তথা বাংলা সন গণনায় জাতীয় ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে না। সরকার তথা বাঙালী মুসলমানরা নববর্ষ পালন করে বছরের প্রথম দিন। পক্ষান্তরে বাঙালী হিন্দুরা পালন করে বছরের দ্বিতীয় দিন। অর্থাৎ রাষ্ট্র যেদিন থেকে বাংলা সন গণনা করে বাঙালী হিন্দুরা তার পরদিন থেকে বাংলা সন গণনা করে। একই জাতি রাষ্ট্রের ভিতরে একই জাতির সন গণনায় এই বৈপরীত্য জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পরিপন্থী বলে অভিমত দিয়েছেন দেশের সচেতন নাগরিকগণ। এবছরও নরসিংদী তথা সারাদেশে বিভক্তভাবেই বাংলা নববর্ষ উদযাপন করেছে বাঙালী জাতি। অর্থাৎ চলতি বছর ১৪ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপন তথা বাংলা সন গণনা শুরু করেছে সরকার ও বাঙালী মুসলমানরা। এবং ১৫ এপ্রিল বাংলা নববর্ষ উদযাপন তথা বাংলা সন গণনা শুরু করেছে বাঙালী হিন্দুরা।
জানা গেছে, হিজরি সন চাঁদ পরিক্রমার হিসেবে গণনা করায় ঋতুর সাথে তারিখের হেরফের ঘটার কারণে ৯৬৩ হিজরিতে মুগল বাদশা জালাল উদ্দিন মোহাম্মদ আকবর রাজস্ব আদায়ের সুবিধার্থে চান্দ্রসনকে সৌর সনের সাথে সমন্বয় করে প্রবর্তন করেন বাংলা সন। যাকে বলা হয় ফসলী সন। সে থেকে বাঙালী মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ সকল ধমাবলম্বীরাই সম্রাট আকবর প্রবর্তিত বাংলা সন ঐক্যবদ্ধভাবে উদযাপন করে আসছে। বিংশ শতাব্দীর ষাট দশকে প্রখ্যাত ভাষাবিদ ড. মু. শহিদ উল্লাহ গণনার সুবিধার্থে বাংলা সন তথা বাংলা ক্যালেন্ডারের সংস্কার সাধন করে। তিনি বৈশাখ থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত মাস গুলোকে ৩১ দিনে গণণা করেন এবং আশ্বিন থেকে চৈত্র মাস পর্যন্ত মাসগুলোকে ৩০ দিনে গণনার সিদ্ধান্ত দেন। কিন্তু সরকার ড. মু. শহিদুল্লাহর ক্যালেন্ডারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়নি।
এরশাদ শাসনামলে ড. শহিদুল্লাহর ক্যালেন্ডারকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেয়ার পর সরকার, বাঙালী মুসলমান ও বাঙালী হিন্দুদের মধ্য বিভক্তি দেখা দেয়। সরকার ও বাঙালী মুসলমানরা বাংলা নববর্ষ উদযাপন তথা বাংলা সন গণনা শুরু করে ড. মু. শহিদুল্লাহ’র ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। পক্ষান্তরে বাঙালী হিন্দুরা বাংলা নববর্ষ পালন তথা বাংলা সন গণনা করছে লোকনাথ পঞ্জিকা অনুযায়ী। যার ফলে প্রায় ৩ দশক ধরে বাঙালী মুসলমান ও বাঙালী হিন্দুরা বাংলা নববর্ষ পালন করছে ভিন্ন ভিন্ন দিনে। দেশ প্রেমিক সচেতন জনগন একই দেশে একই জাতি পৃথক পৃথক দিনে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করে জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাস্কর বলে আখ্যায়িত করেছেন।
এ ব্যাপারে হিন্দু পন্ডিতরা জানিয়েছে, হিন্দুদের বাঙালা নববর্ষ উদযাপনের সাথে হিন্দু সমাজের একটি ধর্মীয় সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে। চৈত্র মাসের শেষ ২ দিন বাঙালী হিন্দু সমাজ নিরামিষ ভোজন করে থাকে। এই ২ দিন তারা শাকশব্জী, বিশেষ করে তেঁতো গিমা শাক, তেঁতো তিতবাহারের গোটা, উচ্ছে, করলা ইত্যাদি খেয়ে থাকে। এছাড়া হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী চৈত্র মাসের শেষ ২ দিন রয়েছে তাদের ব্যাপক পূজা পার্বন। ধর্মভীরু হিন্দুরা চৈত্র সংক্রান্তিতে শিবের আর্শিবাদ লাভের জন্য চড়ক পূজা করে থাকে। কোন কোন অঞ্চলে হিন্দু যুবকরা পিঠের চামড়ায় বড়শি বিধিয়ে চড়ক গাছে ঝুলে ঘুরতে থাকে। অতীতে হিন্দুরা অগ্নিকুন্ড সৃষ্টি করে তাতে নিজেরা জ্বলন্ত অংগারের উপর শুয়ে যেতো এবং তার উপর দিয়ে হেটে যেতো ধর্মভীরু হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। শুধু তাই নয় তারা নদী-নালা, বিল, ঝিল ও পুকুরে চড়ক গাছের জন্য ভোগ দিতো। এভাবেই শকাব্দ থেকে বাংলা সনের বিংশ শতাব্দীর ষাট দশক পর্যন্ত তারা বাংলা সনের শেষ দুই দিন পুজা পার্বন করে আসছে। এখন আর এসব পুজা পার্বন খুব একটা চোখে পড়ে না।
এ ব্যাপারে নরসিংদীর কয়েকজন শিক্ষাবিদ জানিয়েছেন, একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতি রাষ্ট্রে অভন্তরে নাগরিকদের মধ্য বাংলা সন গণনায় বৈপরিত্য জাতীয় ঐক্য সংহতির পরিপন্থী। এটা দেখতে যেমন দৃষ্টিকটু তেমনই শুনতেও শ্রুতিকটু। দীর্ঘ প্রায় ৩ দশকাল ধরে বাংলা সন গণনা নিয়ে যে বিভক্তি চলে আসছে তা সরকারী উদ্যোগে নিরসন করা না হলে জাতীয় ঐক্যে বড় ধরনের ফাটল সৃষ্টির আশংকা রয়েছে। সরকারের উচিত বিষয়টিকে আমলে নিয়ে বাঙালী মুসলমান ও হিন্দুরা যাতে একই দিন বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে পারে তার বিহিত ব্যবস্থা করা।




