বরেণ্য চিত্রশিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার আর নেই। ২৯ জুন সোমবার সকালে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। ‘বাংলাদেশের পাপেটম্যান’ হিসেবে খ্যাত শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার দীর্ঘদিন ধরে নিউমোনিয়া ও প্রোস্টেট ক্যানসারে ভুগছিলেন।

স্কয়ার হাসপাতাল সূত্র জানায়, নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে চলতি মাসের ১৪ তারিখে অসুস্থ অবস্থায় মুস্তাফা মনোয়ারকে এখানে ভর্তি করা হয়। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ)তে নেয়া হয়। কয়েক দিন আগে তার ভেন্টিলেটর সাপোর্ট খুলে নেয়ায় আশার আলো দেখা দিলেও পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হওয়ায় আবারও ভেন্টিলেটরে নেয়া হয়।
এর আগে তার স্ত্রী মেরী মনোয়ার জানিয়েছিলেন, ফুসফুসে মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের কারণে তিনি সংকটাপন্ন অবস্থায় ছিলেন। চিকিৎসকরা সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে আর ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি।
পারিবারিক সূত্র জানিয়েছে, আজ রাতে শিল্পীর মরদেহ স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হবে। আগামীকাল মঙ্গলবার সকাল ৯টায় বিটিভিতে তাঁর প্রথম জানাজা হবে। বেলা ১১টায় শহীদ মিনারে তাঁর মরদেহ সর্বসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে। বাদ জোহর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় মসজিদে মুস্তাফা মনোয়ারের দ্বিতীয় জানাজা অনুষ্ঠিত হবে। পরে তাঁর মরদেহ শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেওয়া হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। বনানী কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।

এদিকে হাসপাতাল থেকে মুস্তাফা মনোয়ারকে নেওয়া হয় ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে শিল্পীর মরদেহবাহী ফ্রিজিং ভ্যান তাঁর ধানমন্ডির ১ নম্বর সড়কের নিজ বাড়ির সামনে আনা হয়। সেখানে শিল্পীর পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, অনুরাগী ও সুহৃদরা শ্রদ্ধা ও শোক জানাতে আসেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন বরেণ্য শিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক রফিকুন নবী, গ্যালারি চিত্রকের নির্বাহী পরিচালক মনিরুজ্জামান, বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, অভিনেতা তারিক আনাম খান, বিশিষ্ট পাপেটশিল্পী জিল্লুর রহমান, তামান্না তিথি, সোহেল আহমেদ, খালিদ আহমেদ, মো. নোমান, অনুকূল দাসসহ অনেকে।সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়, বাংলা একাডেমি, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, সম্মিলিত সামাজিক আন্দোলন শোক জানিয়েছে।
কবি গোলাম মোস্তফার ছেলে মুস্তাফা মনোয়ারের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ছোটবেলা থেকেই মুস্তাফা মনোয়ারের ছবি আঁকা আর গানের প্রতি আকর্ষণ। নবম শ্রেণিতে পড়ার সময় যোগ দেন রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে। জেলে যান ছবি আঁকার অপরাধে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের লাল সূর্যের অন্যতম স্থপতি মুস্তাফা মনোয়ার। শিল্পকলায় অবদানের জন্য ২০০৪ সালে ‘একুশে পদক’ দেওয়া হয়েছিল মুস্তাফা মনোয়ারকে। এ ছাড়া নানা সম্মাননায় ভূষিত ছিলেন তিনি। সৃষ্টি করেছেন ‘পারুল’-এর মতো জনপ্রিয় চরিত্র। জড়িত ছিলেন ‘মীনা’র সঙ্গে। নির্মাণ করেছেন শিশু-কিশোরদের প্রতিভা বিকাশে বাংলাদেশের সবচেয়ে মানসম্পন্ন ও জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘নতুন কুঁড়ি’। তাঁর নির্মিত অনুষ্ঠান ‘মনের কথা’ও ব্যাপক সমাদৃত। মুস্তাফা মনোয়ারের কর্মজীবনের শুরু পূর্ব পাকিস্তান চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক হিসেবে। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমি, বাংলাদেশ টেলিভিশন, বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা, শিল্পকলা একাডেমিসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে উচ্চপদে কর্মরত ছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থীশিবিরে শিশুদের আতঙ্কগ্রস্ত মলিন চেহারা মুস্তাফা মনোয়ারকে ব্যথিত করে। তাই শিশুদের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সেই শরণার্থীশিবিরেই আয়োজন করেন জীবনের প্রথম পাপেট শো। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর নতুন আঙ্গিকে বাংলাদেশের শিল্পজগতে মুস্তাফা মনোয়ার মেলে ধরেন পাপেটের এক নতুন রূপ।




