সারাজীবন আমি ভেবেছি সাদি আর শিবলী আমরা প্রায় সমবয়সী। কিন্তু প্রখ্যাত রবীন্দ্র সংগীতশিল্পী সাদি মহম্মদ এর মৃত্যুর পর, দেখলাম সাদি বয়সে আমার চেয়ে কিছুটা ছোট। এমন ভাবার কারণ হলো একটা, আমার যদ্দুর মনে পড়ে সাদি এবং শিবলী দু’জনই যে বছর খুলনা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য গিয়েছিলো, ভর্তি হয়েছিল, সে সময় আমাদেরও লেখাপড়াটা সেরকম পর্যায়ে ছিল। কিন্তু বয়সের পার্থক্য যাই হোক না কেন— সারাজীবন এই দু’জনের সঙ্গে সম্পর্কটা বন্ধুত্বের মতই। একজন নাচতেন আর একজন গান গাইতেন। গানের সাথে যেহেতু আমার সম্পর্ক একটু বেশি সেই কারণে সাদির সঙ্গেও আমার অন্তরঙ্গতা শিবলীর চেয়ে কিছুটা বেশি ছিল।

শিবলী মহম্মদ এ বছর একুশে পদক পাবার পরে ওর সাথে দেখা হয়েছিল চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। কথা হয়েছিল নানা বিষয়ে। আর সাদির সঙ্গে দেখা হয়েছে এ মাসের পাঁচ তারিখে। চ্যানেল আই’তে সাদির গানে গানে সকাল শুরু’তে গান ছিল। এর বাইরে আর একটি বিশেষ অনুষ্ঠানে। তার কয়েকদিন আগেও দেখা হয়েছিল অন্য কোন এক জায়গায়। সাদিকে দেখলাম বিষন্ন এবং খুবই হতাশ। সাদি’র সঙ্গে কথা হলো।
—‘এই যে সাগর ভাই আপনি আমার গানটা শুনে যান।’

কথা খুব সুন্দর করে, আস্তে আস্তে গুছিয়ে বলতো সাদি
—‘আমি বললাম, আমি তো শুনবোই তোমার গান।’
—‘সাদি বললো- না, না, একটু আমার সামনে বসে শুনে যান। কবে আবার গান গাইতে পারবো কবে আবার আপনাকে পাবো। কবে এ-গান হবে কে জানে।’
‘আমি বললাম কেন তুমি এত হতাশ হচ্ছো। তোমার গান যখনই হয়, যেখানে হয় আমি অবশ্যই বসে বসে শুনি বা দেখি এবং তুমি যে নতুন শিল্পীদের উত্সাহ দেয়ার জন্য আমরা যখন অনুরোধ করি— যে তুমি অমুক শিল্পীর সঙ্গে গান গেয়ে দাও, তুমি কখনও না বল না। এটা তোমার অনেক বড় গুণ।’
‘সাদি বলে— কি করবো বাচ্চারাতো গান শিখতে আসে শুনতে আসে। ওদের সঙ্গে বসে যদি একটু গান গাই ওরা উত্সাহিত হয়। তারপর তারা ভবিষ্যতে কি করবে, কতটা ভালো তারা গাইবে কিংবা সংগীতের জন্য কতটুকু জীবনের সময়কে উত্সর্গ করবে সেটা তাদের ব্যাপার।’
শুধুমাত্র তরুণ শিল্পীদের জন্য তা নয়, সাদি খুবই স্বাচ্ছ্যন্দ বোধ করতেন গান গাইতে অনেক প্রবীণ শিল্পীদের সঙ্গে।
আমার মনে আছে, সাদি মহম্মদ এবং রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যার ডুয়েট রবীন্দ্র সংগীতের অ্যালবাম ও বেরিয়েছে অনেক। পুরনো দিনের গানও বেরিয়েছে এবং সেই গানগুলো রেকর্ডিং-এর সময় সাদি মহম্মদ কিভাবে গানগুলো খুঁজে নিয়ে আসলেন সুর-স্বর-তাল-লয় সব যাতে ঠিক থাকতো নিখুঁত থাকে তার জন্য কি পরিমাণ পরিশ্রম বন্যার সঙ্গে করেছে সেটা আমি দেখেছি।
আরও একটা ব্যাপার। তরুণ শিল্পীদের সাথে বা পরিচিত শিল্পীদের সঙ্গে সাদি একসাথে গান গাইতেন তা নয়। অনেক তরুণ শিল্পী যারা ভালোভাবে গান গাইতে পারছেন না। কিন্তু এক সময় ভালো গাইতেন। তাদেরকে উৎসাহ দেয়ার জন্য অনেক সময় তাদের সঙ্গে অনুষ্ঠান করতেন। বসতেন টেলিভিশনের পর্দায়। বিশেষ করে চ্যানেল আইয়ের ‘গান দিয়ে শুরু’র অনুষ্ঠানে।
আমি অনেকের কথাই বলতে পারবো যারা বলেন, বা যারা বলতেন, ‘সাদির জন্যই এখনও বেঁচে আছি।
কারণ তাদেরকে শুধু যে অনুশীলনে সাহয্য করতেন সাদি, তাই নয়, হারমোনিয়াম বাজিয়ে তাদের সঙ্গে গলা মিলিয়ে, তাদেরকে এই ভোরবেলার এই অনুষ্ঠানে নিয়ে আসতেন এবং অনুষ্ঠানে যদি তারা ভালো গায়— মিউজিশিয়ানদের সঙ্গে, দর্শকদের সামনে সেই ব্যাপারে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যেতেন একেবারেই হাসিমুখে।
একজন শিল্পীর এই যে প্রচেষ্টা। স্কুল না করে শুধুমাত্র রবিরাগ বলে একটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে থেকে সারা দেশের শিল্পীদের সেখানে একত্রিত করা এবং নানা রকম অনুষ্ঠান। বিশেষ করে ধানমন্ডি লেককে কেন্দ্র করে। রবীন্দ্রসংগীতকে কেন্দ্র করে। রবীন্দ্রনাথের ভাবনা নিয়ে—অনেক রকম অনুষ্ঠান সাদি করেছেন।
সাদি মহম্মদের একটা বড় দুঃখ ছিল। এই ১২ তারিখে এক অনুষ্ঠানে সাদি খুব দুঃখ করে বলছিলেন, কোন একজন শিল্পীকে যে, তার আর পদকের দরকার নেই। রাষ্ট্রীয় কোন পদকের দরকার নেই কারণ, মরনোত্তর পদক দিয়ে তিনি কি করবেন। হঠাৎ কেন মরণের কথা আসলো। কিংবা হঠাৎ কেন তিনি আমাকেই বা কেন বললেন। বসে আমার গানটা শুনে যান আবার কবে শুনাবো। তার উত্তর আজ আমাদের কাছে অজানা। কিন্তু একটা কথা জানি সেটা হলো পুরস্কারের জন্য তো কখনও শিল্পীরা গান গান না। যদি একটা পুরস্কার আসে সেটা তাদের উত্সাহ যোগাতে পারে, তাদের মনে একটু আনন্দ দিতে পারে। সেই ক্ষণিকের আনন্দ তারা ভুলে গিয়ে আবার নিবেদিত হন গান চর্চ্চায়।
সাদি মহম্মদ একজন সেরকম নির্মোহ শিল্পী ছিলেন। কিন্তু তারপরও একজন সাধারণ মানুষ হিসেবে তার মনেই হতে পারে পুরস্কার তার সংগীতের জন্য তার পাওয়া উচিত ছিল। বিশেষ করে তিনি যে পুরস্কার পেয়েছেন। চ্যানেল আইয়ের আজীবন সম্মাননা পুরস্কার তিনি পেয়েছেন। ১৯১২ সালে এবং আমার মনে আছে— পুরস্কার পাবার পর তিনি বলেছিলেন যে, ‘এটাই আমার জীবনের রবীন্দ্রসংগীত গেয়ে প্রথম পুরস্কার। এই পুরস্কারের জন্য আমি অনেক আনন্দিত।’
পরবর্তী পর্যায়ে ২০১৫ সালে তিনি বাংলা একাডেমির পুরস্কার পেয়েছেন। আর নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু আমাকে বললেন যে, এই বছর শিল্পকলা একাডেমি পুরস্কার তার পাওয়ার কথা। জাতীয় শিল্পকলা একাডেমি রবীন্দ্রসংগীতের জন্য পুরস্কার যাকে দেয় সেই পুরস্কার পাবার কারণে হয়তো এবার একুশে পদকে দুই ভাই এর নামই একসাথে থাকতো পারতো। সেখানে শুধুমাত্র শিবলী মহম্মদের নাম রয়েছে। আবার মনে করার চেষ্টা করি সাদি মহম্মদের মত শিল্পীরা গান গায় আপামর দর্শকদের জন্য, মানুষের ভালোবাসার জন্য। সাদির মৃত্যুর পর রাতের বেলা যে পরিমাণ দর্শক এই রোজার দিনে তার বাসায় গেছে, হাসপাতালে গেছে তাতে কি প্রমাণ হয় না সাদি মহম্মদ দর্শকদের অনেক কাছের মানুষ ছিলেন। প্রিয় মানুষ ছিলেন। সাদি মহম্মদের গান বহু মানুষের ভালো লাগতো। ভালো লাগবে। ভালো থাকবেন সবাই।
লেখক: বরেণ্য কথাসাহিত্যিক, গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব।




