ads

বুধবার , ১২ আগস্ট ২০২৬ | ২৯শে শ্রাবণ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

গারো পাহাড়ে সংকটাপন্ন হাতির জীবন, বাড়ছে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব

অভিজিৎ সাহা, নালিতাবাড়ী
আগস্ট ১২, ২০২৬ ৪:২১ অপরাহ্ণ

Shamol Bangla Ads

গভীর রাত। পাহাড়ের নীরবতা ভেঙে হঠাৎ শোনা যায় গাছ ভাঙার শব্দ। আতঙ্কে ঘুম ভেঙে যায় সীমান্তবর্তী গ্রামের মানুষের। ঘর থেকে বেরিয়ে দেখা যায়, একদল বন্য হাতি ধানখেত কিংবা বসতবাড়ির দিকে এগিয়ে আসছে। মশাল জ্বালিয়ে, ঢাকঢোল পিটিয়ে, চিৎকার করে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা শুরু হয়। কখনো হাতির পাল ফিরে যায় পাহাড়ে, কখনো ঘটে অনাকাঙ্ক্ষিত সংঘর্ষ।

শেরপুরের গারো পাহাড়ের সীমান্তবর্তী এলাকায় এমন দৃশ্য এখন অনেকটা পরিচিত। একসময় যে পাহাড় ছিল বন্য হাতির অবাধ বিচরণক্ষেত্র, বন-জঙ্গল কমে যাওয়া ও মানুষের বসতি বাড়ায় সেই আবাসস্থলই এখন সংকুচিত। ফলে খাবার ও পানির সন্ধানে প্রায়ই লোকালয়ে নেমে আসছে হাতির পাল। নষ্ট হচ্ছে কৃষকের ফসল, ভাঙছে ঘরবাড়ি। হাতি তাড়াতে গিয়ে প্রাণ হারাচ্ছেন মানুষও। এতে দিন দিন তীব্র হচ্ছে মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব।

Shamol Bangla Ads

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, শেরপুরের নালিতাবাড়ী, শ্রীবরদী ও ঝিনাইগাতী এবং ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার গারো পাহাড়ে বন্য হাতির বিচরণ রয়েছে। ১৯৯৫ সালে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের পিক পাহাড় থেকে ২০ থেকে ২৫টি বন্য হাতির একটি দল দলছুট হয়ে এ অঞ্চলে চলে আসে। পরে ভারতীয় সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর বাধার কারণে হাতিগুলো আর আগের আবাসস্থলে ফিরে যেতে পারেনি। বর্তমানে শেরপুরের শ্রীবরদী থেকে ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ী হয়ে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট পর্যন্ত প্রায় ৬০ কিলোমিটার সীমান্ত এলাকায় হাতির বিচরণ রয়েছে। ধান ও কাঁঠালের মৌসুম ছাড়াও বছরের বিভিন্ন সময়ে খাদ্যের সন্ধানে পাহাড় থেকে লোকালয়ে নেমে আসে হাতির পাল।

স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, পাহাড়ে পর্যাপ্ত খাবার না থাকায় হাতিরা প্রায়ই রাতে লোকালয়ে ঢুকে পড়ে। ধান, ভুট্টা, কলা, কাঁঠালসহ বিভিন্ন ফসল নষ্ট করে তারা। কখনো বসতবাড়িতেও হানা দেয়। এতে বছরের পর বছর ফসলের ক্ষতি সহ্য করতে হচ্ছে কৃষকদের। নালিতাবাড়ীর কালাপানি এলাকার কৃষক বিজয় কুবি বলেন, ‘প্রায় ২০ বছর ধরে হাতির সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে আছি। প্রতিবছরই কষ্ট করে ফলানো ফসল হাতির দল খেয়ে নষ্ট করে। বাড়িঘরেও তাণ্ডব চালায়।’
হাতির হাত থেকে ফসল ও ঘরবাড়ি রক্ষায় স্থানীয় বাসিন্দা এবং এলিফ্যান্ট রেসপন্স টিমের (ইআরটি) সদস্যরা মশাল জ্বালিয়ে, ঢাকঢোল বাজিয়ে ও হৈচৈ করে হাতি তাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু এতে অনেক সময় পরিস্থিতি আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে। আতঙ্কিত হাতির সঙ্গে মানুষের সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটে।

বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯৫ সাল থেকে এ পর্যন্ত শেরপুর জেলায় মানুষ-হাতির দ্বন্দ্বে অন্তত ৪৭টি হাতি মারা গেছে। একই সময়ে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৭ জন মানুষ। আর ২০১৪ সাল থেকে গত ১১ বছরে মারা গেছে ৩৯টি হাতি ও ৩৬ জন মানুষ। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই দ্বন্দ্ব কমার বদলে আরও প্রাণঘাতী হয়ে উঠেছে।
মানুষ ও হাতির দ্বন্দ্ব কমাতে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নিয়েছে বন বিভাগ। ২০১৪ সালে পরীক্ষামূলকভাবে সীমান্ত এলাকায় সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে ১৩ কিলোমিটার দীর্ঘ বৈদ্যুতিক বেড়া বা বায়োলজিক্যাল ফেন্সিং নির্মাণ করা হয়। ঝিনাইগাতী ও নালিতাবাড়ীর হাতির বিচরণক্ষেত্র এবং সম্ভাব্য চলাচলের পথে এসব বেড়া স্থাপন করা হয়েছিল।এরপর ২০১৫ সালে ঝিনাইগাতীর তাওয়াকুচি ও কর্নঝুড়া এলাকায় ১০০ হেক্টর বনভূমিতে হাতির খাদ্য উপযোগী বাগান করা হয়। তাওয়াকুচি, ছোট গজনী, বড় গজনী, হালচাটি ও মায়াঘাসি এলাকায় প্রায় ১৩ কিলোমিটারজুড়ে লেবু ও বেতকাটার বাগানও করা হয়।

হাতির গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য সীমান্ত এলাকায় নির্মাণ করা হয় ১৬টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ার। হাতি তাড়াতে পাহাড়ি গ্রামগুলোতে বিভিন্ন সময়ে চার্জার লাইট, টর্চলাইট ও জেনারেটর বিতরণ করা হয়েছে। তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, এসব উদ্যোগে স্থায়ী সমাধান আসেনি। পাহাড়ে হাতির খাদ্যসংকট থাকায় তারা বারবার লোকালয়ে চলে আসছে।

সম্প্রতি ভারত সীমান্তবর্তী পাহাড়ি জেলা শেরপুরে মানুষ ও বন্য হাতির সংঘাত নিরসন এবং জানমালের সুরক্ষায় একটি উচ্চপর্যায়ের সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে হাতির চলাচল পর্যবেক্ষণ এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের আগাম সতর্ক করতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর আগাম শনাক্তকরণ যন্ত্র বা আরলি ডিটেকশন ডিভাইস স্থাপনের পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।

শেরপুর-২ (নকলা-নালিতাবাড়ী) আসনের সংসদ সদস্য ফাহিম চৌধুরী বলেন, মানুষ ও বন্য হাতির সহাবস্থান নিশ্চিত করতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার সময়ের দাবি। প্রথম ধাপে নালিতাবাড়ীর বন্য হাতি উপদ্রুত এলাকায় ১৫টি এআই প্রযুক্তিনির্ভর আরলি ডিটেকশন ডিভাইস স্থাপন করা হবে। এসব যন্ত্রের মাধ্যমে হাতির গতিবিধি শনাক্ত করে দ্রুত স্থানীয় বাসিন্দাদের সতর্ক করা সম্ভব হবে। এতে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যাবে। হাতিকে লোকালয়ে আসা থেকে বিরত রাখতে শুধু প্রযুক্তির ওপর নির্ভর না করে বনের ভেতরেই খাবার ও পানির ব্যবস্থা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

সেমিনারে জানানো হয়, সংসদ সদস্যের বিশেষ বরাদ্দ থেকে হাতির বিচরণক্ষেত্রে বেশ কিছু গভীর সাবমার্সিবল পাম্পযুক্ত জলাধার তৈরি করা হবে। যেসব এলাকায় হাতির অবস্থান বেশি, সেখানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক জলাধার খনন করা হবে। প্রাকৃতিক উৎসের পানি ধরে রাখার পাশাপাশি শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট মেটাতে গভীর সাবমার্সিবল পাম্প স্থাপন করা হবে। নিরাপদ দূরত্ব থেকে এসব পাম্প নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। এর ফলে বনের ভেতরেই হাতির জন্য পর্যাপ্ত পানির ব্যবস্থা থাকবে এবং পানির সন্ধানে লোকালয়ে আসার প্রবণতা কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, গারো পাহাড়ে মানুষের অবাধ বিচরণ, বন উজাড় ও বৃক্ষ নিধনের কারণে হাতির আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। একই সঙ্গে কমছে তাদের খাবারের উৎস। ফলে বেঁচে থাকার তাগিদেই লোকালয়ে ঢুকতে বাধ্য হচ্ছে হাতি। গারো পাহাড়, বন্যপ্রাণী ও নদী রক্ষা পরিষদের উপদেষ্টা বিপ্লব দে কেটু বলেন, ‘হাতি প্রকৃতির পাহারাদার। আমরা চাই হাতি ও মানুষের সহাবস্থান তৈরি হোক। এ জন্য সরকারের কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।’

বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞ ড. আলী রেজা খান বলেন, মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা নিতে হবে। বন উজাড় ও পাহাড়ে মানুষের বসতি হাতির খাদ্যসংকট ও সংঘাত বাড়াচ্ছে। গারো পাহাড়ে হাতির আবাসস্থলের ধারণক্ষমতা ও বর্তমান হাতির সংখ্যা নির্ধারণ করে সে অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।

ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মুহাম্মদ নুরুল করিম বলেন, শেরপুরের গারো পাহাড় প্রায় ৫৪ বর্গকিলোমিটার এলাকায় বিস্তৃত। এখানে প্রায় শতাধিক হাতির বিচরণ রয়েছে। হাতিগুলোকে যেমন বাঁচাতে হবে, তেমনি মানুষকেও রক্ষা করতে হবে। এ জন্য মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব নিরসনে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে কাজ করা হবে। ইতিমধ্যে আমরা অনেক পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ করছি। হাতির খাদ্যের যোগানও নিশ্চিত করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, হাতির আক্রমণে কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হলে নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ায় ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তাই হাতিকে কোনো অবস্থাতেই বিরক্ত করা যাবে না। এ বিষয়ে ইআরটি ও বন বিভাগের মাধ্যমে মানুষকে সচেতন করা হচ্ছে।

Need Ads
error: কপি হবে না!