ads

বুধবার , ১৫ এপ্রিল ২০২৬ | ৪ঠা বৈশাখ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

৪৩ বছর পর ফের আলোচনায় নীতিশ রায়ের সেই কালজয়ী ছবি ‘তৃষ্ণা’

রফিকুল ইসলাম আধার , সম্পাদক
এপ্রিল ১৫, ২০২৬ ৯:৩২ অপরাহ্ণ

শেরপুরে প্রদর্শনীতে কথা বলবেন ছবির জীবন মা-মেয়ে

৪৩ বছর পর ফের আলোচনায় উঠে এসেছে শেরপুরের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত নীতিশ রায়ের তোলা সেই কালজয়ী ছবি ‘তৃষ্ণা’। ছবিটির দাবিদার নিয়ে একটি বিতর্ককে কেন্দ্র করে সেই আলোচনা এবং আলোচনার রেশ ধরে নতুন করে উপস্থাপন হচ্ছেন সেই ছবির জীবন্ত সাক্ষী মা ও মেয়ে। ‘তৃষ্ণা’ ছবিতে শিশুকন্যাকে কোলে নিয়ে পাহাড়ি ছড়ায় হাতের চউলে যে মা পানি পান করছিলেন তিনিই কুমুদিনী কোচ। আর সেই শিশু কন্যা রিতা কোচ। তারা এখনও বেঁচে আছেন জীবনের নানা ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়েও। একমাত্র সন্তান রিতাকে নিয়ে মা কুমুদিনী কোচ দুর্গম পাহাড়ি বাড়িতেই বসবাস করছেন।

Shamol Bangla Ads

সময়টা ছিল আশির দশকের কোন এক সময়। শেরপুরের সীমান্তবর্তী ঝিনাইগাতী উপজেলার গারো পাহাড়ি এলাকার শাল-গজারি বাগানের ফাঁকে ছড়ার পাশে ক্যামেরা নিয়ে ঘুরছিলেন বিশিষ্ট আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক নীতিশ রায়। ঠিক ওই সময় কোচ সম্প্রদায়ের আদিবাসী নারী পিঠে শিশুকন্যাকে নিয়ে পিপাসা মেটাতে দুই হাত দিয়ে ওই ছড়ার পানি তুলে পান করছিলেন। ওই সময় পিপাসাক্লান্ত শিশুকন্যাটিও মায়ের বুকের দুধ পান করছিল। দৃশ্যটি দেখে আলোকচিত্রী নীতিশ রায় ক্যামেরার শাটার টিপলেন। কিন্তু ওই কোচ নারী কিছুই টের পাননি। ওই কোচ নারীর নাম কুমুদিনী কোচ। বাড়ি পার্শ্ববর্তী উত্তর গান্ধীগাঁও গ্রামের কোচপাড়ায়। আলোকচিত্রী নীতিশ রায় বেশ কয়েকটি ছবি তুলে বাড়িতে এসে ভাবছিলেন ছবির নাম কী দেওয়া যায়। একপর্যায়ে যেহেতু মা ও মেয়ে দুজনই তৃষ্ণার্ত ছিল, তাই ছবির নাম দিলেন ‘তৃষ্ণা’। এর কিছুদিন পর ইউনেস্কোর এশিয়ান কালচারাল সেন্টারের আয়োজনে ১৯৮২ সালে জাপানে অনুষ্ঠিত সপ্তম এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আলোকচিত্র প্রতিযোগিতায় ছবিটা পাঠালে আন্তর্জাতিক ‘ইয়াকুল্ট’ পুরস্কার পায় ছবিটি। এ নিয়ে ওই বছরের ৬ আগস্ট নীতিশ রায়ের ছবিসহ আলোকচিত্রটি দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

নীতিশ রায় ছিলেন একাধারে একজন প্রখ্যাত আলোকচিত্রী ও সাংবাদিক। ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘জয় বাংলা’ পত্রিকার ফটোগ্রাফার ছিলেন তিনি। স্বাধীনতার পর দৈনিক সংবাদ, ভোরের কাগজ ও ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকায় কাজ করেছেন। নিঃসন্তান নীতিশ রায় স্ত্রী লেখক ও কবি সন্ধ্যা রায়কে নিয়ে শেরপুর শহরের নয়ানি বাজার মহল্লায় বসবাস করতেন। নীতিশ রায় ২০১৭ সালে ও বছর পাঁচেক পর স্ত্রী সন্ধ্যা রায় পরলোকগমন করেন।

Shamol Bangla Ads

‘তৃষ্ণা’ শুধু একটি আলোকচিত্র নয়, শেরপুরের অবহেলিত ও দুর্গম গারো পাহাড়ের মানুষের জীবনছবি। ৪৩ বছর পর ওই ছবির মানুষদের খোঁজ নিতে গিয়ে উঠে আসে আরেক বাস্তবতা ছবির বাইরের কঠিন জীবন। ‘তৃষ্ণা’ ছবির ওই নারী কুমুদিনী কোচের বর্তমান বয়স প্রায় ৬৬ বছর। আর কন্যা রিতা কোচের বয়স ৪৫ বছর। বাড়ি ঝিনাইগাতী উপজেলার সীমান্তবর্তী উত্তর গান্ধিগাঁও কোচপাড়া গ্রামে। পাহাড়ি টিলায় ১৭ শতক ভিটায় কুমুদিনী কোচের বসবাস।
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে কুমুদিনী কোচ বলেন, বাপের অসুস্থতার খবর পাইয়া তিন মাসের রিতাকে পিঠে নিয়া নওকুচি বাপের বাড়ি যাইতেছিলাম। বাড়ির কিছুদূর দূরে পাহাড়ি ছড়ার পানিতে পিপাসা মিটাতে জল খাই। কিন্তু ওই সময়ে কে ছবি তুলেছে তা জানি না। কিছুদিন পর আমাদের নকশী ক্যাম্পের (বর্তমান বিজিবি ক্যাম্প) সঙ্গে এক আত্মীয় ছবিটি আমাকে দেখায়। ছবিটি দেখে তখন লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিই।

ছবিটি আন্তর্জাতিক পুরস্কার পাওয়ার পর লোকমুখে শুনেছেন কুমুদিনী কোচ। নীতিশ রায় একসময় বাড়িতে গিয়ে একটি সাদাকালো ছবি দিয়ে এসেছিলেন। সময়ের স্রোতে সেটি হারিয়ে যায়। বয়সের ভারে এখন চোখে ঠিকমতো দেখেন না কুমুদিনী কোচ। সামান্য জমিতে চাষাবাদ ও সন্তানদের সহায়তায় নাতিদের নিয়ে সময় কাটে কুমুদিনী কোচের। ছবির যে শিশুটি কুমুদিনীর বুক পান করছিল তার নাম রিতা কোচ। সেদিন কুমুদিনী কন্যার বয়স ছিল মাত্র দেড় মাস। এখনও মা ও মেয়ে দুজনই পাশাপাশি প্রায় সমসুখী হয়ে বেঁচে আছেন ছবির সাক্ষী হয়ে।
কুমুদিনী কোচের সংসারটা একদিন যেন চাঁদের হাট ছিল। স্বামী ছিলেন পাথরশ্রমিক বৈদনাথ কোচ। ২০০৩ সালের একদিন পাথর উত্তোলনের কাজে পাহাড়ে যান কুমুদিনীর স্বামী বৈদনাথ কোচ। বাড়িতে খবর আসে মাটি ও পাথর চাপা পড়ায় কয়েকজন শ্রমিক মারা গেছেন। ওই লাশগুলোর মধ্যে বৈদনাথ কোচকেও পাওয়া যায়। সাথে সাথে পাঁচ কন্যা ও তিন পুত্রসন্তান নিয়ে কুমুদিনী যেন অথৈ সাগরে পড়লেন। এখন ছেলেপেলেরা বড় হয়েছে, যার যার মতো সংসারী হয়েছে। কুমুদিনীর বাড়ি ভরা নাতি-পুতি। কুমুদিনী কোচের সরল ভাষ্য, বুড়া হইছি, এহন খাই আর কুহাই, কুহাই আর ঘুমাই।

কুমুদিনী কোচের কয়েকটি গরু রয়েছে। এই গরুগুলো পাহাড়ের সমতল ভূমিতে সকালে ছেড়ে দিয়ে সন্ধ্যার আগে সেগুলোকে বাড়ি নিয়ে আসেন। কুমুদিনী কোচের ৯ ছেলে-মেয়ের মধ্যে সবার বড় ছেলে স্বপন কোচ অনেক আগেই ভারতে চলে গেছে। দ্বিতীয় কন্যা রিতা কোচের স্বামী ভজন কোচ ২০১৬ সালে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে বিনা চিকিৎসায় মারা যায়। স্বামীর মৃত্যুর পর একমাত্র ছেলেকে নিয়ে মায়ের সাথেই থাকেন রিতা কোচ। কুমুদিনী কোচের পঞ্চম সন্তান রূপন কোচ অনেক আগেই মারা গেছে। এরপর জীবিত সন্তানদের মধ্যে বেঁচে আছে লিবিতা কোচ, তাপস কোচ, মল্লিকা কোচ, দুর্জয় কোচ, রাধা কোচ ও সুস্মিতা কোচ। এই ছেলে-মেয়ে ও জামাইদের নিয়েই কুমুদিনী কোচের এখন সংসার।

নীতিশ রায়ের মৃত্যুর পর স্ত্রী কবি সন্ধ্যা রায়ও অসুস্থ ছিলেন। মৃত্যুর আগে বিশিষ্ট সমাজসেবী ও শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতির সভাপতি রাজিয়া সামাদ ডালিয়ার কাছে ‘তৃষ্ণা’ ছবির মূল কপি, ক্যামেরাসহ বিভিন্ন সনদ সংরক্ষণের জন্য হস্তান্তর করেন। পরে রাজিয়া সামাদ ডালিয়া ক্যামেরাসহ কিছু ছবি ও সনদ জামালপুরে গান্ধী আশ্রমের মুক্তিসংগ্রাম জাদুঘরে প্রদান করেন। তবে ‘তৃষ্ণা’ ছবিটি শেরপুর ডায়াবেটিক সমিতিতে সংরক্ষিত আছে।

এ বিষয়ে রাজিয়া সামাদ বলেন, নীতিশ রায় ও তার স্ত্রীর সঙ্গে আমাদের ভালো সম্পর্ক ছিল। অসুস্থ অবস্থায় তৃষ্ণা ছবির মূল কপি, সনদ ও ক্যামেরা আমার কাছে রেখে যান। পরে আমরা ছবি ও ক্যামেরা জাদুঘরে দিয়েছি। তবে তৃষ্ণা ছবিটি এখনো আমাদের কাছেই সংরক্ষিত আছে।

সম্প্রতি নীতিশ রায়ের ‘তৃষ্ণা’ ছবিটি নিজের বলে দাবি করেন সাখাওয়াত তমাল নামের এক ব্যক্তি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অনেকে। আর শেরপুর জনউদ্যোগের আহ্বায়ক ও শিক্ষক আবুল কালাম আজাদ এ নিয়ে প্রতিবাদ জানিয়ে অনলাইন নিউজপোর্টাল শ্যামলবাংলা২৪ডটকমে একটি নিবন্ধও লিখেন। এ নিয়ে তৈরি হয় জনমত। আবুল কালাম আজাদ বলেন, ছবিটি শেরপুরকে আন্তর্জাতিক পরিসরে পরিচিত করেছে। নীতিশ রায়ের মতো আলোকচিত্রী না থাকলে হয়তো দৃশ্যটি দেখা যেত না। তাই ছবির দাবিদার নিয়ে বির্তকের প্রতিবাদসহ নীতিশ রায়ের তোলা সংরক্ষিত ছবি নিয়ে জনউদ্যোগের আয়োজনে ১৯ এপ্রিল শহরের শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে প্রদর্শনী হবে। এতে নীতিশ রায়ের মতো খ্যাতিমান আলোকচিত্রীকে স্মরণ করা হবে। পাশাপাশি প্রদর্শনীতে ‘তৃষ্ণা’ ছবির জীবন্ত সাক্ষী মা ও মেয়েকে উপস্থাপন করা হবে।

খ্যাতিমান আলোকচিত্রী নীতিশ রায় ইহকালের মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন পরপারে। রেখে গেছেন জীবন্ত করে অনেক ইতিহাস, অনেক ঐতিহ্য। নীতিশ রায়ের হাতে তোলা মহান মুক্তিযুদ্ধ এক অনন্য দলিল। নীতিশ রায়ের ছবিগুলো শুধু কেবলই ছবি নয়। তাই তার স্মৃতি ও সৃষ্টিকর্মগুলো সংরক্ষণই এখন সময়ের দাবি।

Need Ads

সর্বশেষ - ব্রেকিং নিউজ

Shamol Bangla Ads
error: কপি হবে না!