প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারত উপমহাদেশে কিছু সংসার ত্যাগী মানুষের অস্তিত্ব লক্ষ্য করা যায়।তারা নিজেদের বাড়িতে বসবাস করত না।অথবা বলা চলে তাদের নিজেদের নির্দিষ্ট কোনো আবাসস্থল বা ঘরবাড়ি ছিলো না।তারা ছিলো ছিন্নমূল।তারা ছিলো পথের ভিখারী। তারা ছিলো ভবঘোরে।

ইরাক ইরান মিশর সিরিয়া প্রভৃতি এলাকায় এদের নাম দরবেশ বা আওলিয়া এবং ভারত উপমহাদেশে এদের নাম পাগল বাউল বা সাধু বলে অভিহিত করা হতো।
প্রাচীন কালের সেই দরবেশ বা পাগলের ধারাবাহিকতায় আমাদের ভারত উপমহাদেশে মুগল আমলের মধ্যভাগ থেকে একদল সুসংগঠিত এবং সংঘবদ্ধ পাগলের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

এই পাগলদের মধ্যে হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই ছিলো।তবে তারা কেউই খাঁটি হিন্দু বা খাঁটি মুসলিম ছিলো না।তারা নিজনিজ ধর্মকর্ম সঠিক ভাবে পালন করতো না।
তাদের মধ্যে হিন্দুরা ছিলো বৈষ্ণব বা বৈরাগ্যবাদের অনুসারী এবং মুসলিমরা ছিলো সূফীবাদ বা সংসারবিবাগী মতবাদ দ্বারা প্রভাবিত।
এই জন্য তাদেরকে প্রথমদিকে হিন্দু বা মুসলিম কেহই ভালো চোখে দেখতো না বা পছন্দ করতো না।
পরবর্তীতে কৃষক শ্রমিক এবং সাধারণ দরিদ্র মানুষের পক্ষে তাদের আন্দোলন সংগ্রামের কারণে গ্রামের সাধারণ কৃষক শ্রমিকেরা তাদেরকে পছন্দ করা শুরু করে এবং তাদের পিছনে সংঘবদ্ধ হয়।
তাদের ভিতর হিন্দুদের মধ্যে রামানন্দ ঘোষ,ভবানী পাঠক,দেবী চৌধুরাণী, আর মুসলিমদের মধ্যে মজনু শাহ,মুসা শাহ, চেরাগ আলী শাহ প্রমুখের নাম ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়।
হিন্দুধর্ম থেকে আসা ব্যক্তিগণকে বলা হতো সাধু বা সন্যাসী আর মুসলিম ধর্ম থেকে আসা ব্যক্তিগণকে বলা হতো ফকির।
বাংলা এবং বিহারের বিভিন্ন এলাকায় এরা দল বেঁধে ঘুরে বেড়াতো।মানুষের দান,উপহার এবং সময়বিশেষে ভিক্ষা করে চেয়ে চিন্তে এদের জীবন চলতো।
সন্যাসী এবং ফকিরগণ একসাথে মিলে মিশে থাকতো নাকি আলাদা আলাদা থেকে আন্দোলন সংগ্রাম করতো তা অবশ্য পরিস্কার করে জানা যায়নি।
নবাব সিরাজুদ্দৌলার পতনের পর ভারত উপমহাদেশে ইংরেজদের শাসন পাকাপোক্ত হয়।তারা রাজ্য শাসন এবং খাজনা আদায়ের নামে এদেশের মানুষের উপর নানারকম অত্যাচার নির্যাতন শুরু করে।
ইংরেজদের এই সব অত্যাচার নির্যাতনের বিরুদ্ধে সর্বপ্রথম প্রতিরোধ গড়ে তোলে এই ভাসমান বা ভ্রাম্যমাণ ফকির এবং সন্যাসীগণ।
১৭৬৩ সন থেকে শুরু করে ১৮০০ সন পর্যন্ত দীর্ঘ ৩৭ বছর তারা সাধারণ কৃষকদেরকে সাথে নিয়ে অন্তত সাতবার ইংরেজদের বিরুদ্ধে শক্তিশালী অভিযান বা আক্রমণ পরিচালনা করে।
আন্দোলন সংগ্রামের এই ৩৭ বছর সহ এর পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী দীর্ঘদিন এই ফকির সন্যাসীগণ দল বেঁধে বাংলার বিভিন্ন অঞ্চলে ঘোরাঘুরি করতো।
বৃহত্তর ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকায়ও এদের আস্তানা ছিলো।এই সব আস্তানায় তারা স্বল্পমেয়াদে অবস্থান বা রাত্রিযাপন করতো।কোনো কোনো সময় কোনো আক্রমণ বা অভিযান পরিচালনার পর এসব আস্তানায় কিছুদিন আত্মগোগন করে থাকতো।
ফকির বা সন্যাসীদের এরকম একটি আস্তানা ছিলো আমাদের গ্রামে।এরা এখানে এসে মাঝে মাঝে অবস্থান করতো এবং আশেপাশের এলাকায় ভিক্ষা বা দান খয়রাতের অনুসন্ধান করতো।
যদিও এরা পরমুখাপেক্ষি ছিলো না এবং এদের চাহিদাও ছিলো অতিশয় অল্প।এরা একবেলা খাদ্য গ্রহণ করতো, ছেঁড়াফাঁটা ময়লা পোষাক পরিধান করতো,গোসল করতো না এবং মাটির উপর কিংবা ঘাসপাতার উপর শুয়ে রাত্রি যাপন করতো।
তাছাড়া আন্দোলন পূর্ববর্তী সময়ে এদের কেউ কেউ মুগল সেনাবাহিনীতে খণ্ডকালীন সৈনিক হিসাবে কাজ করার কারণে কিছু জমিজমাও প্রাপ্ত হয়েছিলো। কাজেই তাদের অভাব অনটন ছিলো না।ভিক্ষা করারও কোনো প্রয়োজন ছিলো না।
তবুও তারা আন্দোলন চলাকালীন এবং আন্দোলন শেষ হওয়ার পরবর্তী দীর্ঘদিন কৌশলগত কারণে ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতো।
এই সকল সন্যাসী বা ফকিরদের একটি আস্তানা আমাদের এই গ্রামে ছিলো বলেই আমাদের এই গ্রামের নাম রাখা হয়েছে সন্যাসীভিটা।
শেরপুর জেলার নালিতাবাড়ি উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের অন্তর্গত এই গ্রাম প্রায় তিন বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।
সবুজ শ্যামলে সুশোভিত, শস্য সম্পদে ভরপুর,অনেক দিনের প্রাচীন এই গ্রামে আমরা হিন্দু,মুসলিম মিলেমিশে বসবাস করি।
প্রাচীন ইতিহাস ঐতিহ্যের ধারক বাহক আমাদের এই গ্রাম এখনো আগের মতোই ঐশ্বর্যশালী।এখনো ধান পাট আর মৎস্য সম্পদে ভরপুর।
কিন্তু এমন ঐতিহ্যবাহী ঐতিহাসিক এলাকা হওয়া সত্ত্বেও আমাদের এই গ্রাম শিক্ষা দীক্ষায় শোচনীয় ভাবে পশ্চাদপদ।
হিসাব করলে এখনো শিক্ষার হার পাঁচ পারসেন্ট হয় কিনা সন্দেহ।
আমাদের গ্রামে দুইটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,একটি এমপিওভুক্ত উচ্চবিদ্যালয় এবং অনেকগুলো এবতেদায়ী মাদ্রাসা আছে।কিন্তু তবুও শিক্ষার হার আশানুরূপ বৃদ্ধি পাচ্ছে না।
ধন সম্পদের প্রাচুর্য্য আমাদের গ্রামের মানুষগুলিকে অলস এবং বিদ্যাবিমুখ করে রেখেছে।
আমাদের এই নাজুক পরিস্থিতির এক মাত্র ব্যতিক্রম হরিলাল বাবুদের বাড়ি।এই বাড়ির ১০০% মানুষ শিক্ষিত।
সবাই শিক্ষিত হওয়ার কারণে এই বাড়ির মানুষ গ্রামের হিন্দু মুসলিম সব মানুষের কাছে শ্রদ্ধেয়, আস্থাভাজন এবং সম্মানের পাত্র।
হরিলাল দাদা আমার অগ্রজ শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি। তিনি নিজে উচ্চশিক্ষিত, জ্ঞানী এবং সমাজে একজন সম্মানিত মানুষ।
তিনি কৃষি ব্যাংকের একজন দক্ষ,সফল ও যোগ্যতম ম্যানেজার ছিলেন।প্রিন্সিপাল অফিসার পদে কর্মরত থাকা অবস্থায় বর্তমানে অবসর গ্রহণ করেছেন ।তার ছোটো ভাই জগদীশ চন্দ্র বর্মন কৃষি বিভাগের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা।
একই বাড়ির বাসিন্দা হরিলালাল দাদার মামা বর্তমানে প্রয়াত বাবু শরৎ চন্দ্র বর্মন উচ্চশিক্ষিত বিজ্ঞ এবং সন্যাসীভিটা হাইস্কুলের স্বনামধন্য সিনিয়র শিক্ষক ছিলেন।তার ছেলে ডাক্তার গোবিন্দ চন্দ্র বর্মন একজন নামকরা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।
এদের ছাড়া বিক্ষিপ্ত ভাবে আরো কিছু শিক্ষিত লোক আমাদের গ্রামে আছে।তবে তার সংখ্যা অতি নগণ্য।
শিক্ষাদীক্ষার অভাব থাকা সত্ত্বেও আমাদের গ্রামে সদ্ভাব ও সম্প্রীতির কোনো অভাব পূর্বেও ছিলো না এবং বর্তমানেও নাই।
আমরা ছোটোবেলা থেকেই আমাদের বাপ চাচাদের সাথে প্রতিবেশি, আত্মীয় স্বজন, অনাত্মীয় গ্রামবাসী বা হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের মধ্যে অন্তরে অন্তরে মিল দেখে দেখেই বড়ো হয়েছি।
আবার আমরা শিশু কিশোর তরুণরাও অন্য শিশু কিশোর তরুণদের সাথে গলায় গলায় বন্ধুত্বভাব বজায় রেখে চলেছি।
আমরা ছোটোবেলায় হিন্দু-মুসলিম শিশুকিশোর মিলে একসাথে স্কুলে গিয়েছি,এক সাথে স্কুল থেকে ফিরেছি।বিকেল বেলা একসাথে খেলাধুলা করেছি, দৌড়াদৌড়ি করেছি।নিজেরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে ভলিবল কিনেছি।একসাথে নদীতে লাফালাফি করেছি।একসাথে মাছ ধরেছি।এক সাথে ঘুরি উড়িয়েছি।গাছে চড়েছি।
পাশের গ্রামে ঘোড়দৌড় হতো।আমরা দলবেঁধে ঘোড়দৌড় দেখতে গিয়েছি।
তিনানি বাজারে মালিঝি নদীতে নৌকা বাইচ হতো।আমরা হিন্দু মুসলিম সব পোলাপান মিলে হাতে হাত ধরে নৌকা বাইচ দেখতে গিয়েছি।
মালিঝিকান্দা উচ্চবিদ্যালয় মাঠে ইন্টার স্কুল ফুটবল প্রতিযোগিতা হতো।আমরা হিন্দু মুসলিম সব পোলাপান মিলে এক সাথে খেলা দেখতে গিয়েছি ।
আমাদের সন্যাসীভিটা স্কুলের মাঠে বিকেল বেলা দল বেঁধে আড্ডা দিতাম আমরা।রোজার মাস এলে কোনো কোনো দিন স্কুলের মাঠে বসেই মুড়ি চানাচুর দিয়ে হিন্দু মুসলিম সবাই মিলে ইফতার করতাম।
গ্রামের সবচেয়ে প্রবীণ এবং সবচেয়ে জ্ঞানী মানুষ ছিলেন প্রয়াত প্রাণনাথ সরকার। তিনি হিন্দু-মুসলিম সকলের কাছেই পীরের মতো শ্রদ্ধাভাজন ছিলেন।আমরা সবাই তাকে আপন মনে করতাম।তার কাছে যে কোনো সমস্যা নিয়ে গেলে সেই সমস্যার সুন্দর সমাধান পাওয়া যেতো।
বিপদ আপদ,অভাব অনটন,ধার কর্জ, ঝগড়া ফ্যাসাদ সব ধরণের সমস্যা নিয়ে গ্রামের হিন্দু মুসলিম সবাই প্রাণনাথ সরকার মহাশয়ের শরণাপন্ন হতো।
হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকেরা প্রাণনাথ সরকার বাবুর কাছে ধর্মীয় পরামর্শের জন্য যেতো।কবে অমাবশ্যা,কবে চন্দ্রোদয়, কবে যাত্রা নাস্তি,কবে বিয়ের শুভলগ্ন, কবে চৈত্রসংক্রান্তি, কোন মাসে কোন পূঁজা এই সব বিষয়ের জন্য তিনি ছিলেন একটা জীবন্ত বিশ্বকোষ।
গ্রামের সকল শ্রেণির মানুষ একবাক্যে প্রাণনাথ সরকার মহোদয়কে সম্মান করতো শ্রদ্ধা করতো।
গ্রামের মুসলিম সম্প্রদায় প্রাণনাথ সরকার বাবুকে এমনভাবে শ্রদ্ধা সম্মান করতো যে অন্য কোনো মুসলিম মুরুব্বিকেও এতো ভক্তিশ্রদ্ধা করতো না।অর্থাৎ তিনি ছিলেন হিন্দু মুসলিম সবার কাছে সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী।
বিগত শত শত বছর যাবত বিদ্যমান আমাদের এই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আগামী হাজার বছরেরও বিনষ্ট হবে না বলে আমরা মনে করি।
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও বহুমাত্রিক লেখক।




