অনিয়ম-অবহেলার অভিযোগ
শেরপুরে শহীদ মুক্তিযোদ্ধা ও বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবরস্থান সংরক্ষণ-নির্মাণে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানসহ খোদ গণপূর্ত বিভাগের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকার ওই প্রকল্পে এখন পর্যন্ত কোন কবরের কাজই পুরোপুরি শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, ৫ মাসে প্রকল্পটি শেষ করার কথা থাকলেও গত ৩ বছরেও শেষ হয়নি। এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, নিম্নমানের কাঁচামাল ব্যবহার ও সঠিক মাপে বেদি নির্মাণের ক্ষেত্রেও। ফলে এখনই ভেঙে পড়ছে কোন কোন কবরের টাইলস।

জানা যায়, সরকারের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের আওতায় শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ১৭২ জন শহীদ ও বীর মুক্তিযোদ্ধার কবর সংরক্ষণ ও নির্মাণে একটি প্রকল্প হাতে নেয় গণপূর্ত বিভাগ। ৩ কোটি ২৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ৫ মাস মেয়াদের ওই প্রকল্প কাজের দায়িত্ব পায় চট্টগ্রামের মোহাম্মদ ইউনূস এন্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেড। সে অনুযায়ী ২০২১ সালে কাজ শুরু করে তারা। একই বছরের আগস্ট মাসে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও নানা অজুহাতে প্রায় ৩ বছরেও কাজ শেষ করতে পারেনি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এদিকে ৩ বছরে ১৭২টির মধ্যে ১৪২টি কবর শনাক্ত করেছে গণপূর্ত। কবরগুলো পাকাকরণের কাজ শেষের আগেই ভেঙে যাচ্ছে প্রতিটি কবরের টাইলস। লাগানো হয়নি মার্বেল পাথর ও অন্যান্য সৌন্দর্য বর্ধনের অংশও।
সরেজমিনে গেলে স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের স্বজনরা জানান, দেশের সূর্য সন্তানদের কবর সংরক্ষণে ওই অনিয়ম রাষ্ট্রদ্রোহিতার শামিল। তারা দ্রুত কাজ শেষ করার দাবি জানান। ওই বিষয়ে শ্রীবরদী উপজেলার শঙ্করঘোষ এলাকার প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা শামসুল হকের সন্তান জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, কর্তৃপক্ষের উদাসিনতার সুযোগে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কবরগুলোর নির্মাণ কাজ করেছে একেবারেই দায়সারাভাবে। সেইসাথে কাজে রয়েছে অনিয়ম। মানহীন কাজ করায় কাজ শেষ হওয়ার আগেই কবরে ফাটল দেখা দিয়েছে। টাইলস ভেঙে গেছে। একই কথা জানিয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা দুলাল মিয়ার ছেলে জানান, কোনরকমে কবরটার চারপাশ পাকা করলেও কাজ পুরোপুরি শেষ করাা হয়নি। মুক্তিযোদ্ধাদের নামফলক লাগানো হয়নি।

গোশাইপুর ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার আলহাজ্ব মো. নুরুল ইসলাম জানান, মুক্তিযোদ্ধাদের কবর নির্মাণেও যদি কর্তৃপক্ষের উদাসিনতায় অনিয়ম-দুর্নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়, তখন কষ্টের কথা প্রকাশের ভাষা থাকে না। তিনি ওই বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানান। একই দাবি জানান বীর মুক্তিযোদ্ধা খাদেম আলী, বীর মুক্তিযোদ্ধা মিজান উদ্দিনসহ বেশ কয়েকজন।
উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিটের সাবেক কমান্ডার আমিনুল ইসলাম প্রকল্পের বাস্তবায়ন কাজে ধীরগতি ও অনিয়ম অবহেলার বিষয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সেইসাথে তিনি কাজের স্বচ্ছতা ফেরাতে ও অনিয়ম ঠেকাতে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তির দাবি জানান।
অন্যদিকে ভৌত অবকাঠামোর কাজ এখনও বাকি থাকলেও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মোহাম্মদ ইউনূস এন্ড ব্রাদার্স প্রাইভেট লিমিটেডের কর্মকর্তা সৌরদ্বীপ দাবি করেন, কবর নির্মাণের কাজ প্রায় ৯৬ ভাগ শেষ হয়েছে। এখন কর্তৃপক্ষ নির্মাণ কাজে কিছু পরির্বতন চাচ্ছে, সেগুলোও করে দেওয়া হবে। তার প্রশ্ন, এ নিয়ে এখন রিপোর্ট করার কি আছে?
আর শেরপুর জেলা গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী সরদার মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, বীর মুক্তিযোদ্ধাদের কবর সংরক্ষণের কাজ শেষের দিকে। তবে অর্থ সঙ্কটের কারণে এবং কিছু কিছু জায়গা দুর্গম হওয়ায় কাজ কিছুটা থমকে রয়েছে। আমি নতুন এসেছি। এসেই যত দ্রুত সম্ভব কাজ শেষ করার জন্য ঠিকাদারকে তাগাদা দিয়েছি।
এ ব্যাপারে শেরপুরের জেলা প্রশাসক আব্দুল্লাহ আল খায়রুম বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলীর সাথে কথা বলব। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও কোন অনিয়ম হয়ে থাকলে অবশ্যই তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।




