‘সবার সুখে হাসব আমি, কাঁদব সবার দুখে, নিজের খাবার বিলিয়ে দেব, অনাহারীর মুখে’Ñ পল্লী কবি জসিম উদ্দিনের এ অমর চরণকে অনুসরণ করেই যেন অনাহারীর মুখে আহার তুলে দেয়ার প্রত্যয়ে কাজ করে যাচ্ছে শেরপুরের স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ‘নৃ ফাউন্ডেশন’। একদল প্রচারবিমুখ যুবকের গড়ে তোলা এ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে শেরপুর শহরের শহীদ দারোগ আলী পৌর পার্ক মাঠে প্রায় ৮ মাস যাবত প্রতিদিন দুপুরে অসহায়-হতদরিদ্রদের মুখে বিনামূল্যে তুলে দেওয়ার পর এবার রমজান মাস শুরু হওয়ায় তারা এখন মাসব্যাপী হতদরিদ্রদের জন্য ইফতারের আয়োজন করেছে। ১৪ এপ্রিল বুধবার থেকে শুরু হওয়া ওই ইফতার আয়োজনে ১৯ এপ্রিল সোমবার পর্যন্ত ৬ দিনে প্রায় ৪ শতাধিক হতদরিদ্র মানুষকে পেটপুরে ইফতারী করানো হয়েছে। এতে ইফতারে অংশ নেওয়া হতদরিদ্র লোকজনসহ স্থানীয় সচেতন মহলের অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন ওই উদ্যোগ-আয়োজনে।

জানা যায়, শেরপুরের দরিদ্র মানুষের মুখে খাবার জোগানোর ব্রত নিয়ে নৃ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ‘অনাহারীর আহার’ নামে শহরের পৌর পার্কে বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয় গত বছরের ১৫ আগস্ট থেকে। শুরুতে প্রতিদিন দুপুরে ২৫ জন অসহায় হতদরিদ্র মানুষের জন্য ডিম, ডাল ও ভাতের ব্যবস্থা করা হয়। ২৫ জনের প্রত্যেকের জন্য আলাদা থালা ও গ্লাসের ব্যবস্থা করা হয়। আবার সেগুলো জীবাণুমুক্ত রাখার জন্য ব্যবহার শেষে সাথে সাথে সাবান পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয়। হাত ধোয়ার জন্য নিরাপদ পানি ও সাবানের ব্যবস্থা করা হয়। যারা খাবার বিতরণের দায়িত্বে নিয়োজিত আছেন তাদের জন্য মাস্ক, চশমা, ফেস শিল্ড, গ্লাভস, গাউন দেয়া হয়। দৈনিক ১ হাজার ৫০ টাকা থেকে ১ হাজার ১০০ টাকার খরচে এ সময় শুধুমাত্র উদ্যোক্তাদের নিজস্ব অর্থায়নেই কার্যক্রমটি চলমান ছিলো। সেই সাথে মাঝে মাঝে চলতো বিশেষ কোন দিবস উপলক্ষে উন্নত খাবারের ব্যবস্থা। ক্রমবর্ধমান চাহিদার প্রেক্ষিতে এক মাস অতিবাহিত হওয়ার পরপরই উপকারভোগীর সংখ্যা ২৫ জন থেকে ৩০ জনে উন্নীত করা হয় এবং দৈনিক খরচ গিয়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৫০ টাকা। বর্তমানে সেখানে মাঝে মাঝে ৫০-৬০ জনও খাবার গ্রহণ করে থাকেন। করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মধ্যেও বন্ধ হয়নি তাদের কার্যক্রম। যথাযথ স্বাস্থ্যবিধি মেনে খাবার বিতরণ ও নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা পরামর্শের পাশাপাশি কয়েক দফায় উপকারভোগীদের মাঝে বিতরণ করা হয় মাস্ক। শুরুতে অনেকটা নীরবে-নিভৃতে চলতে থাকে অনাহারীর আহারের কার্যক্রম। ধীরে ধীরে এই সেবাধর্মী ও অনুসরনীয় কাজটি শেরপুরের বেশ সাড়া ফেলে দিয়েছে। মানবসেবার উদ্দেশ্যে পরিচালিত এ কার্যক্রমের উদ্যোক্তারা প্রচারবিমুখ হওয়ায় তাদের নাম প্রকাশ করতে চাননি। নৃ ফাউন্ডেশনের উদ্যোক্তারা প্রতিমাসে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ অনাহারীর আহারে অনুদান দিচ্ছেন এবং একইসাথে নৃ ফাউন্ডেশনের ভালো কাজে জড়িত থাকতে এলাকার অনেকেই তাদের অনুদান দিচ্ছেন। এছাড়াও অনেকে তাদের ফেসবুক পেইজ ফলো করে স্বপ্রণোদিত হয়ে অনুদান দিতে আগ্রহী হচ্ছেন। ইতোমধ্যে অনাহারীর আহার’ কর্মসূচি দেখে শেরপুর পৌরসভার তরফ থেকে ২০ হাজার টাকার বিশেষ অনুদান প্রদান করেন পৌর মেয়র আলহাজ্ব গোলাম মোহাম্মদ কিবরিয়া লিটন। এর আগে সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফিরোজ আল মামুন অনাহারীর আহার কর্মসূচি পরিদর্শন করেন। ওইসময় তিনি নৃ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত শীতবস্ত্র বিতরণ কর্মসূচির জন্য ৫০টি কম্বল ও ৩০ প্যাকেট খাবার অনুদান হিসেবে প্রদান করেন। দেশের বাইরে থেকেও তাদের অনেক শুভাকাক্সক্ষী সহায়তা করছেন অনাহারীর খাবার যোগাতে। আবার কেউবা নিজের, পরিবারের বা প্রিয়জনের জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকী, আপনজনের মৃত্যুবার্ষিকী কিংবা অসুস্থতা উপলক্ষেও অনাহারীর আহারে আয়োজন করেন বিশেষ খাবারের।
এদিকে এখন পবিত্র রমজান মাস শুরু হওয়ায় দুপুরের খাবারের বদলে ইফতারীর আয়োজন করা হয়েছে। এতে অসহায় হতদরিদ্ররা সেখানে গিয়ে বিনামূল্যে ইফতার করতে পারছেন। প্রথম রোজায় ৫০ জনকে ইফতারী করানো হলেও এরপর থেকে প্রতিদিন ৭০ জনকে বিনামূল্যে ইফতারী করানো হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আয়োজকরা।
অন্যদিকে ‘অসহায়ের সহায়’ নামে এবার নৃ ফাউন্ডেশন তার দ্বিতীয় কার্যক্রম শুরু করেছে। এ কার্যক্রমের মাধ্যমে মূলত অস্বচ্ছল কিন্তু প্রতিভাবান ও মেধাবী, অভাবী কিন্ত উদ্যমী ও মেহনতি, পুঁজিহীন কিন্তু উদ্যোক্তা মনোভাব পোষণ করেন এমন মানুষদেরকে তাদের স্বপ্নপূরণে এবং অগ্রযাত্রাকে মসৃণ করতে সাধ্যের মধ্যে সহযোগিতা করে ও দু:সময়ের সহায় হয়ে নৃ ফাউন্ডেশন পাশে থাকবে। এরই আওতায় একজন অস্বচ্ছল মেধাবী ছাত্রকে শিক্ষা সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। ১৭ এপ্রিল সদর উপজেলার লছমনপুর ইউনিয়নের ঝাউগড়া এলাকার মৃত আব্দুল মালেকের ছেলে মো: শাওনুজ্জামানকে তার এসএসসি পরীক্ষার রেজিষ্ট্রেশন ফি বাবদ ২ হাজার ৪০০ টাকার চেক প্রদান করা হয়। শাওনুজ্জামান ছনকান্দা ডা. এম টি হোসেন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহন করবে। তার পিতা পেশায় একজন আইসক্রিম বিক্রেতা ছিলেন। একমাত্র উপার্জনক্ষম পিতার মৃত্যুতে পড়াশোনার খরচ বন্ধ হয়ে যায় শাওনের। শাওন এই শিক্ষা সহায়তা পেয়ে আনন্দিত। তার জন্য এ শিক্ষা সহায়তা ধারাবাহিকভাবে অব্যহত থাকবে বলে জানান সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। ওইসময় ছনকান্দা ডা. এম টি হোসেন উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জনাব জয়নাল আবেদিনের উপস্থিতিতে শাওন চেকটি গ্রহণ করে। সহায়তা প্রদানকালে নৃ ফাউন্ডেশনের পক্ষে সহ-সভাপতি লতিফা আক্তার শ্যামা, সাধারণ সম্পাদক মাজহারুল হক লুটু ও অর্থ সম্পাদক জনাব রাজীব আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
শেরপুরের বিশিষ্ট সমাজসেবক ও মানবাধিকারকর্মী রাজিয়া সামাদ ডালিয়া অনাহারীর আহার কার্যক্রমের বিষয়ে বলেন, এটি অবশ্যই একটি মহতি একটি উদ্যোগ। একদল উদ্যমী যুবকের উদ্যোগে বেশ কিছু অসহায় হতদরিদ্র ব্যক্তি প্রতিদিন একবেলা ভালো খাবার পাচ্ছে। তাদের মতো সবাই যার যার জায়গা থেকে এগিয়ে এলে সমাজের চিত্রটা পাল্টাতে বেশিদিন লাগবে না।
নৃ ফাউন্ডেশনের কার্যক্রম ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তাদের ফেসবুক পেইজে মেসেজ দিয়ে জানতে চাইলে জানানো হয়, নৃ ফাউন্ডেশনের মূল উদ্দেশ্য দেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় শেরপুরের পিছিয়ে পড়া মানুষকে বিভিন্নভাবে সহায়তা করে স্থানীয় টেকসই উন্নয়নকে বেগবান করা ও হতদরিদ্র মানুষের যে কোন প্রয়োজনে পাশে দাঁড়ানো। অনাহারীর আহারের মাধ্যমে অসহায় দরিদ্র মানুষের জন্য বর্তমানে বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ কর্মসূচি দিয়ে কার্যক্রম শুরু করলেও অল্প সময়ের মধ্যে নৃ ফাউন্ডেশনের পক্ষ হতে ‘অসহায়ের সহায়’ শিরোনামে স্থায়ীভাবে কিছু মানুষকে নিয়মিত উপার্জনের উৎস তৈরি করে দেওয়াসহ শেরপুরের সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ শিক্ষা সহায়তা কার্যক্রমও শুরু করা হবে। তারা আরও জানান, মানবপ্রেম ও সকলের সহযোগিতাকেই নৃ ফাউন্ডেশন তাদের মূলধন হিসেবে বিবেচনা করে।




