স্টাফ রিপোর্টার : ‘দীর্ঘদিন পরে অইলেও শেখের বেডি যে আমগরে খবর নিল, এইডা বুলবার নয়। সোয়ামি হারাইয়া যে দুঃখ-কষ্ট পাইছিলাম, আজ শেখের বেডির সম্মান আতে পাইয়া সব দুঃখ-বেদনা ভুইল্যা গেছি।’ কাঁদতে কাঁদতে শাড়ির আঁচলে ছোখ মুছতে মুছতে কথাগুলো বলেন শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার সীমান্তবর্তী সেই সোহাগপুর বিধবাপল্লীর শহীদ ফজর আলীর স্ত্রী বীরাঙ্গনা জোবেদা বেগম (৮৬)। ৩০ জুন বৃহস্পতিবার দুপুরে স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৪ বছর পর ‘নারী মুক্তিযোদ্ধা’ হিসেবে স্বীকৃতি ও ভাতার প্রথম সম্মানী হাতে পেয়ে নিজের প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করতে গিয়ে ওই কথাগুলো বলেন তিনি।
এর আগে নালিতাবাড়ী উপজেলা নিবাহী কর্মকর্তা তরফদার সোহেল রহমান তার কার্যালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে জোবেদা বেগমসহ সোহাগপুর বিধবাপল্লীর ৪ বীরাঙ্গনার হাতে ৬ মাসের ভাতা বাবদ ৬০ হাজার টাকার চেক তুলে দেন। ভাতাপ্রাপ্ত অন্যরা হচ্ছেন সোহাগপুর বিধবাপল্লীর শহীদ বাবর আলীর স্ত্রী জোবেদা খাতুন (৭৪), শহীদ কাইঞ্চা মিয়ার স্ত্রী আছিরন নেছা (৭৯) ও শহীদ আবদুল লতিফের স্ত্রী হাসেনা বানু (৬১)। ওইসময় অন্যান্যের মধ্যে উপজেলা আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মো. রেজাউল করিম, মুক্তিযোদ্ধা আবুল হাশেম, সোহাগপুর শহীদ পরিবার কল্যাণ সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিনসহ নারী মুক্তিযোদ্ধাদের স্বজনরা উপস্থিত ছিলেন।
চেক হাতে পেয়ে আবেগে আপ্লুত শহীদ কাইঞ্চা মিয়ার স্ত্রী বীরাঙ্গনা আছিরন নেছা (৭৯) জানান, ‘বঙ্গবন্ধুর মাইয়া দেশ স্বাধীন হওয়ার ৪৪ বছর পরে আমগরে যে সম্মান দিলো তা আমি আমার সারাজীবনেও ভুলবো না। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, শেখের বেডি হাসিনারে যেন আল্লায় অনেক দিন বাঁচাই রাহে।’ সেদিনের সেই বিভৎস ঘটনার কথা স্মারণ করে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘ওই ঘটনাগুলার কতা মনে অইলে এহনো আমাগো কান্দন পায়। বছর ঘুইরা ওই দিন আইলেই মনে পইরা যায় পাকিগরে তান্ডবলীলার কতা। কি অত্যাচারডাইনা আমগরে শরিলের ওপর চালাইছে। এ কথা বলে শাড়ির আঁচলে চোখ ঢেকে তিনি বলেন, খোদায় যেন ওই নরপশুগরে বিচার করে।’
এছাড়া সোমবার ঝিনাইগাতী উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ সেলিম রেজা স্থানীয় রাঙ্গামাটি খাটুয়াপাড়া গ্রামের ৩ বীরাঙ্গনার হাতে তুলে দেন একই পরিমাণ অর্থের ভাতা। তারা হচ্ছেন শহীদ বাদশা মিয়ার স্ত্রী মোছাঃ আয়শা বেওয়া, মোজাফফর আলীর স্ত্রী বিবি হাওয়া ও তমিজ উদ্দিনের স্ত্রী মোছাঃ শরফুলি বেগম। ওইসময় উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এস এম আমিরুজ্জামান লেবু উপস্থিত ছিলেন।
এ ব্যাপারে জেলা মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট কমান্ডার নুরুল ইসলাম হিরু বলেন, শেরপুর জেলায় প্রথম দফায় সোহাগপুর ট্র্যাজেডির বীরকন্যাপল্লী ও কাটাখালি ট্র্যাজেডি রাঙ্গামাটিয়া খাটুয়াপাড়া গ্রামের ৭ জন বীরাঙ্গনা নারী মুক্তিযোদ্ধা সম্মাননা ভাতার গেজেটভুক্ত হয়েছেন। আরও কয়েকজনের নাম অপেক্ষমাণ রয়েছে। পর্যায়ক্রমে তারাও তালিকাভূক্ত হবেন বলে আশা করি। দীর্ঘদিন পরে হলেও ওইসব বীরাঙ্গনা তাদের প্রাপ্য মর্যাদা ফিরে পাওয়ায় আমরা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ সরকারের প্রতি অভিনন্দন জানাই।
উল্লেখ্য, ১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই পাক হানাদার বাহিনী ও তাদের স্থানীয় দোসররা নালিতাবাড়ী উপজেলার কাকরকান্দি ইউনিয়নের সোহাগপুর গ্রামে হানা দিয়ে নাম না জানা ৪০ জনসহ ১৮৭ জন নিরীহ মানুষকে হত্যা করে। একই সাথে তাদের পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় ১৯ নারী- যাদের মধ্যে বেঁচে আছেন এখন ১২ জন। আর একই বছরের ৬ জুলাই কাটাখালী ট্র্যাজেডির অংশ হিসেবে পাশবিক নির্যাতনের শিকার হন বেশ কয়েকজন নারী। পাশবিক নির্যাতনের শিকার ওইসব নারীরা বীরাঙ্গনা হিসেবে আলোচিত হলেও স্বাধীনতার দীর্ঘদিন পরও তাদের ছিলো না কোন স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন। ওই অবস্থায় বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণায় বীরাঙ্গনাদের তালিকা প্রণয়ন ও তাদের নারী মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতিসহ সমভাবে সুযোগ-সুবিধা প্রদানের উদ্যোগ নেয় সরকার। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি সোহাগপুরের ৪ ও রাঙ্গামাটি খাটুয়াপাড়ার ৩ বীরাঙ্গনার নাম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়।




