শ্যামলবাংলা ডেস্ক : সন্ত্রাসবাদ ও জঙ্গিবাদ বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে এর মোকাবেলায় সব রাষ্ট্রকে এক হয়ে লড়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বিশ্বের নানা প্রান্তে জঙ্গিদের হামলা, বাংলাদেশে ইতালীয় নাগরিক খুন এবং হত্যার দায় স্বীকার করে জঙ্গি দল আইএসের কথিত বার্তার প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭০তম অধিবেশনে দেয়া ভাষণে তিনি ওই আহ্বান জানান। বুধবার বাংলাদেশ সময় রাতে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দফতরে বাংলায় দেয়া বাংলাদেশের সরকার প্রধানের ভাষণ জাতিসংঘের ওয়েব টিভিতে সরাসরি দেখা যায়।
৩০ সেপ্টেম্বর বুধবার সকালের (যুক্তরাষ্ট্র সময়) অধিবেশনে একাদশ বক্তা হিসেবে ভাষণ দিতে দাঁড়ান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস ও তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী আহমেত দুভাতগ্লুর পর তার পালা আসে।
শেখ হাসিনা বলেন, বিশ্বে মানব সভ্যতার অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার ক্ষেত্রে আজ আমরা সবচেয়ে বড় দুটি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি, যার প্রথমটি হচ্ছে সন্ত্রাসবাদ ও সহিংস জঙ্গিবাদ। বিশ্বশান্তি ও উন্নয়নের পথে এটি প্রধান অন্তরায়। ‘সন্ত্রাসীদের কোনো ধর্ম নেই। সন্ত্রাসবাদ এবং জঙ্গিবাদ একটি বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সব রাষ্ট্রকে একযোগে কাজ করতে হবে।’
নিজের সন্ত্রাস ও সহিংস জঙ্গিবাদের শিকার হওয়ার উদাহরণ হিসেবে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ট্রাজেডি এবং ২০০১ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা তুলে ধরেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ-মৌলবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি নিয়ে কাজ করছে বলেও বিশ্বনেতাদের জানান শেখ হাসিনা। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির অবসান ঘটাতে তার সরকারের অঙ্গীকারের কথা তুলে ধরে এক্ষেত্রে একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের বিচারের কথাও বলেন তিনি। বিশ্বে উন্নয়ন ও শান্তির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হিসেবে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবের কথা বলেন বাংলাদেশের সরকার প্রধান। ‘জলবায়ু পরিবর্তনজনিত চ্যালেঞ্জ কার্যকরভাবে মোকাবেলা করা সম্ভব না হলে আমাদের উন্নয়ন প্রচেষ্টা এগিয়ে নেয়া কোনোভাবেই সম্ভব হবে না।’ ‘আমাদের সামনে সামান্যই সুযোগ অবশিষ্ট আছে। এ বিশ্বকে নিরাপদ, আরও সবুজ এবং আরও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে আমাদের অবশ্যই সফলকাম হতে হবে,’ বলেন তিনি। পরবর্তী প্রজন্মের জন্য নিরাপদ ভবিষ্যৎ গড়তে নৈতিক সাহস ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞাকে কাজে লাগাতে বিশ্বনেতাদের প্রতি আহ্বান জানান শেখ হাসিনা।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, টেকসই উন্নয়নের জন্য এ বছরটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ বছরের শেষে প্যারিসে আমরা একটি অর্থবহ জলবায়ু চুক্তিতে উপনীত হওয়ার জন্য কঠোর পরিশ্রম করে যাচ্ছি। আমরা আশা করছি, দারিদ্র্য নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তন সীমিত রাখা এবং ধরিত্রীকে সুরক্ষার মাধ্যমে আমাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত হবে।
তিনি বলেন, টেকসই উন্নয়ন ত্বরান্বিত করা এবং শান্তিপূর্ণ ও স্থিতিশীল সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য আঞ্চলিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ আঞ্চলিক সহযোগিতা বৃদ্ধি করতে আঞ্চলিক সংস্থা প্রতিষ্ঠায় নেতৃস্থানীয় ভূমিকা পালন করে চলেছে। এছাড়া বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত এবং নেপালের মধ্যে ব্যবসা-বাণিজ্য এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির জন্য আমরা অবকাঠামো উন্নয়নের পদক্ষেপ নিয়েছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, অভিবাসন এবং মানব চলাচল আজ নতুনভাবে ইতিহাস এবং ভৌগোলিক পরিসীমা নির্ধারণে নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। অভিবাসনের পূর্ণ সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর জন্য রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সহযোগিতা প্রয়োজন। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে, উৎস এবং গন্তব্য দেশ হিসেবে আমরা ২০১৬ সালে গ্লোবাল ফোরাম অন মাইগ্রেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নেতৃত্ব দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
শেখ হাসিনা বলেন, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যতম প্রধান শান্তিরক্ষী প্রেরণকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গর্বিত। তিনি বলেন, এমডিজির সার্বিক অগ্রগতি আমাদের আরও বৃহদাকার, বলিষ্ঠ এবং উচ্চাভিলাষী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে অনুপ্রাণিত করেছে। এসডিজিতে যে উচ্চাশা প্রতিফলিত হয়েছে তা বাস্তবায়নে আমাদের সরকারি ও ব্যক্তিগতসহ অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক তহবিলের জোগান অবশ্যই বৃদ্ধি করতে হবে। এজন্য উন্নত দেশগুলোর পূর্ব প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী তাদের জিএনআইয়ের শূন্য দশমিক ৭ শতাংশ ওডিএ হিসেবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এবং শূন্য দশমিক ২ শতাংশ হারে স্বল্পোন্নত দেশগুলোকে প্রদান জরুরি। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশগুলোর পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তিতে প্রবেশাধিকার ও বিস্তার এবং অভিযোজনের যেসব চ্যালেঞ্জ রয়েছে তার দ্রুত সমাধান প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ আজ সারা বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। আমরা সীমিত সম্পদ দ্বারা বিশ্বের অন্যতম দ্রুততম দারিদ্র্য হ্রাসকারী দেশ হিসেবে নিজেদের পরিচিত করতে সক্ষম হয়েছি।




