তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা : সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, আওয়ামী লীগ উন্নয়নের নামে জনগণের টাকা লুটপাট করে। ২১৯ নভেম্বর শনিবার বিকেলে কুমিল্লার টাউন হল মাঠে ২০ দলীয় জোট আয়োজিত জনসভায় ওইকথা বলেন তিনি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগাম নির্বাচনের দাবিতে গণসংযোগের অংশ হিসেবে এ জনসভায় খালেদা জিয়া প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।

বেগম জিয়া বলেন- বিএনপি উন্নয়নের রাজনীতিতে বিশ্বাসী। আ’লীগ অন্যায় ও অবৈধভাবে ক্ষমতায় এসে দেশে কোন উন্নয়ন করেনি। আ’লীগ মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দল নয়, তারা কোন যুদ্ধ করেনি। বিএনপি মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেছে, তাই তাদের মধ্যে দেশপ্রেম আছে। আ’লীগ সারাদেশে উন্নয়নের নামে টাকা বরাদ্ধ করে লুটপাট করে পকেট ভারী করছে। দেশের অর্থনীতি অত্যন্ত লাজুক এবং বর্তমানে অর্থনীতিতে স্থবিরতা বিরাজ করছে। আ’লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে ছিলো ঘরে ঘরে চাকুরী দিবে কিন্তু চাকুরী দিতে পারেনি। দেশে এখন এক ব্যক্তির শাসন চলছে। পাঁচ রাষ্ট্রীয় ব্যাংকে দলীয় লোকদের ছাড়া আর কাউকে চাকুরী দেয়নি, ফলে ব্যাংকের টাকা লুট করেছে আ’লীগ। এর ফলে একের পর এক গার্মেন্টস বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। দেশে লুটপাট ও দুর্নীতি হচ্ছে আ’লীগের আমলে। আ’লীগ সরকারের একমাত্র নীতি হলো দুর্নীতি।
বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম জিয়া বলেন- আ’লীগ সরকার বিএনপির শীর্ষ নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানী করছেন। আ’লীগ হিন্দুদের বাড়ী-ঘর দখল, বিভিন্ন অফিসে টেন্ডারবাজি ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য করছে আ’লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা। যুবলীগ ও ছাত্রলীগের এসব নেতা-কর্মীরা প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে হামলা করছে। এ অস্ত্র তারা পেল কোথায় ? অস্ত্রধারী ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার করতে হবে। আ’লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা প্রতিনিয়ত ড্রাগের ব্যবসা করছে। বিএনপি আমলে র্যাব দেশে প্রশংসা লাভ করেছে কিন্তু র্যাব এখন খুন ও গুম বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। অবিলম্বে র্যাববাহিনী বিলুপ্ত/বাতিল করতে হবে। আ’লীগ সরকারের আমলেই পিলখানায় ৫৭জন উর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে নৃশংসভাবে করা হয়েছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নিদের্শ পায়নি বিধায় সেদিন সেখানে সেনাবাহিনী যায়নি। আ’লীগের আমলেই দেশে বোমাবাজি হয়েছে। আ’লীগ বলে যাদের মাথায় টুপি আছে কিংবা দাঁড়ি আছে তারা হলো জঙ্গী। আমি বলি, আলেমরা জঙ্গি নয়, তারা ধর্মের কথা বলে। আ’লীগের নেতা-কর্মীরাই হিন্দুদের বাড়ী-ঘর ও জমি দখল করছে। এমনকি আ’লীগের আমলেই হিন্দুরা দেশান্তর হয়েছে। এ সরকারের আমলে কোন ধর্মের মানুষই নিরাপদ নয়। সকল দলের অংশ গ্রহণে তত্ত্বাবধায় সরকারের অধীনে নির্বাচন চাই। তাই ঝুলুমবাজ ও চাঁদাবাজ সরকারের পতন ঘটানো ছাড়া বিকল্প কোন পথ নেই। আমি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য রাজনীতি করি না। দেশটাকে বাঁচাতে রাজনীতি করি। দেশটাকে বাঁচাতে যুবকদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। বিদেশীদের উদ্দেশ্য করে বেগম নেত্রী বলেন- পুলিশ বাহিনীকে মিশনে নিয়ে প্রশিক্ষণ, গুলি ও টিয়ার গ্যাস দেয়া বন্ধ করতে হবে। কারণ পুলিশবাহিনী মিশন থেকে ট্রেনিং নিয়ে এসে দেশের মানুষকে খুন ও গুম করছে প্রতিনিয়ত। দেশের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপির নেতা-কর্মীদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ ঝুলুমবাজ ও দুর্নীতিবাজ সরকারের পতন ঘটাতে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার আহবান জানান বিএনপির সভানেত্রী।
বেগম জিয়া স্মৃতিচারণ করে বলেন, কুমিল্লায় যখন আসি তখনই মনে হয় যে নিজের জেলায় এসেছি। স্বাধীন বাংলাদেশে জিয়াউর রহমানের প্রথম পোস্টিং ছিল এ কুমিল্লায়। কুমিল্লার মানুষ কর্মঠ এবং কুমিল্লা একটি প্রাচীণ শহর। বিএনপির আমলে কুমিল্লায় বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজসহ অনেক উন্নয়ন হলেও আ’লীগ আসার পর আর কোন উন্নয়ন হয়নি। আমি কুমিল্লাকে একটি আধ্যুনিক শহরে পরিণত করতে চাই। বেগম জিয়া সোয়া ৪টায় বক্তব্য শুরু করে দীর্ঘ ১ ঘন্টা বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা জনসভায়।
কুমিল্লা (দঃ) জেলা বিএনপির সভাপতি বেগম রাবেয়া চৌধুরীর সভাপতিত্বে বক্তব্য রাখেন- বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, এলডিপির সভাপতি কর্ণেল (অবঃ) অলি আহাম্মেদ, মুফতি মাওঃ আব্দুল লতিফ নিজামী, বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য এম.কে আনোয়ার, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ, ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া, মোঃ নজরুল ইসলাম খাঁন, ঢাকা মহানগর বিএনপির আহবায়ক ও সাবেক সিটি মেয়র মির্জা আব্বাস, জাতীয় পাটির (কাজী জাফর) মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দার, জাতীয় পাটির (মঞ্জু) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ, জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা শওকত মাহমুদ, কুমিল্লা (দঃ) জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাবেক সাংসদ হাজী আমিন-উর-রশিদ ইয়াছিন, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের মেয়র মনিরুল হক সাক্কু সহ জাতীয় ও জেলার পর্য্যায়ের বিভিন্ন নেতা-কর্মীগণ ।
এদিকে, ওই জনসভায় জাতীয় পাটির (মঞ্জু) চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ বলেছেন- ৫ই জানুয়ারি অবৈধ নির্বাচন বর্জন করেছে বাংলার মানুষ। আ’লীগ গণধোলাইয়ের ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যায়নি। ওই নির্বাচনী ভোট কেন্দ্রে কুকুর ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি। তাই ৫ই জানুয়ারীর নির্বাচন হলো ক্ষমতা দখলের নির্বাচন এবং কুত্তা মার্কা নির্বাচন। এ অবৈধ ও জুলুমবাজ সরকারের পতন ঘটাতে দেশের আপামর জনসাধারণকে সঙ্গে নিয়ে বিএনপি’র নেতা-কর্মীদেরকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। দেশে এখন আইনের শাসন নেই।
ওই সভায় অন্যান্য শীর্ষ নেতারা বলেছেন- দেশের সংবিধান অনুসারে ৫ই জানুয়ারি নির্বাচন হয়নি। তারা জোর করে ক্ষমতায় এসেছে। এর শূন্যতা পূরণ করতে হলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে হবে। আ’লীগের পায়ের নিচে মাটি নেই, তাই আ’লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে ভয় পায়। বেগম জিয়া ও তারেক রহমানকে সরিয়ে রাখতে একের পর এক মিথ্যা মামলা দেয়া হচ্ছে। কুমিল্লা লাকসাম উপজেলার বিএনপির নেতা হিরু-পারভেজকে গুম করে রেখেছে এ আ’লীগ সরকার। এ ঝুলুমবাজ সরকারের পতন ঘটাতে যেকোন আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। এ অবৈধ সরকারকে বিতাড়িত করতে জীবন দিতে হবে এবঙ রক্ত জড়াতে হবে বিএনপি ও ২০দলীয় নেতা-কর্মীদেরকে। এ সরকার কথায় কথায় গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি করছে। ইসলাম বিদ্বেষীদের আস্তানা এ বাংলার মাটিতে থাকবে না। আজ খুনের নেশায় আ’লীগ পাগল হয়ে গেছে। এ অপরাধী ও জালেমবাজ সরকারকে আন্দোলনের মাধ্যমে পতন ঘটাতে হবে।




