তৈয়বুর রহমান টনি, নিউইর্য়ক : বোয়িং কোম্পানীকে বাংলাদেশে হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ উৎপাদন এবং অন্যান্য খাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহবান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।গত বৃহস্পতিবার দুপরে নিউ ইয়র্কের গ্র্যান্ড হায়াৎ হোটেলে আমেরিকান চেম্বার ও বিজনেস কাউন্সিল ফর ইন্টারন্যাশনাল আন্ডারস্ট্যান্ডিং (বিসিআইইউ)’র মধ্যাহ্নভোজে দেয়া বক্তব্যে এ আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।এছাড়া ওই দিন সকাল ১০টায় শেখ হাসিনা ভয়েস অফ আমেরিকার বাংলা বিভাগকেও একটি সাক্ষাৎকার দেন।মার্কিন ব্যবসায়ীদের সাথে মধ্যাহ্নভোজে পর পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম সাংবাদিকদের বলেন, ভিশন ২০২১ ও ২০৪১ এর মাধ্যমে শিল্পনির্ভর মধ্যম ও উন্নত দেশ হওয়ার পথে সহায়তা করতে বাংলাদেশে বিনিয়োগ বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এজন্য মার্কিন বিনিয়োগকারীদের বর্তমান সরকারের বিনিয়োগ সহায়ক নীতির সুবিধা নিতে আহবান জানান।

মার্কিন ব্যবসায়ীরা প্রধানমন্ত্রীকে জানান, বাংলাদেশে যে একটি পরিবর্তন এসেছে তা তারা দেখতে পেরেছেন এবং স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের পোষাক কারখানায় অগ্নিকান্ডের পরও কোন শ্রমিকের মৃত্যু না হওয়ায় তারা সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তাদের কাছে ২০৪১ সালের মধ্যে কিভাবে নুতন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চান তা ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বোয়িং কোম্পানীকে বাংলাদেশে হেলিকপ্টারের যন্ত্রাংশ উৎপাদনের জন্য বিনিয়োগের আহবান জানান।শাহরিয়ার আলম বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাদের বলেছেন যে, প্রতিবছর বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ৬ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানী করে এবং এজন্য বাংলাদেশী ব্যবসায়ীদের ৮০০ মিলিয়র ডলার শুল্ক দিতে হয়। অনেক উন্নত দেশকে এর চেয়ে কম শুল্ক দিতে হয়।পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেছেন, দুই দেশই সন্ত্রাসবাদের সমূল উৎপাটন চায়, দূরে সরিয়ে দিতে চায় মৌলবাদ ও চরমপন্থাকে।
বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের আগ্রহের কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৯৬ সালে প্রথম দফায় তিনি ক্ষমতা নেয়ার সময় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ২৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগ ছিলো। ২০০১ সালে ক্ষমতা ছাড়ার সময় তা দাঁড়ায় ১ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারে। এর কারণ উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এইএস’এর মতো প্রতিষ্ঠানকে আমরা বাংলাদেশে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগে অগ্রাধিকার দিয়েছি। হরিপুর ও মেঘনাঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু করে এই কোম্পানি ধীরে ধীরে তাদের বিনিয়োগ বহুগুনে বাড়িয়েছে।প্রধানমন্ত্রী বলেন, তবে দুঃখজনক হচ্ছে, ২০০৯ সালে তার সরকার যখন ফের ক্ষমতায় ফেরে তখন বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগ ৪০ মিলিয়ন ডলারে নেমে আসে। তিনি বলেন ২০১১ সালের মধ্যে বিনিয়োগ ১১৭.১৪ ডলারে উন্নীত করা হয়। আর ২০০৯ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র মোট বিনিয়োগ করে ৩৩১.৩৫ মিলিয়ন ডলার। যদিও এ পরিমান অনেক কম।

শেখ হাসিনা বলেন, ২০১৪ সালের সবশেষ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সরাসরি বিনিয়োগে দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। তবে গোটা বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যে বিনিয়োগ তার তুলনায় বাংলাদেশে তাদের বিনিয়োগ অনেক কম, বলেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, আগামী তিন বছরের মধ্যে এই বিনিয়োগের হিসাব বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাবে এটাই প্রত্যাশা।বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে সহজ কর অবকাশ সুবিধা, কম শুল্কে যন্ত্রপাতি আমদানি, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য শতভাগ সমান সুবিধা, বাধাহীন এক্সিট পলিসি, মুনাফা নিজ দেশে নেয়াসহ নানা সুবিধা দেয়া হচ্ছে বলে জানান শেখ হাসিনা।তিনি বলেন, বাংলাদেশে সাতটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা জমি নিয়ে শ্রমঘন শিল্প প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবেন। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ৮ কোটি তরুণ জনশক্তি এবং ১৬ কোটি ক্রেতার বিশাল বাজার বিনিয়োগকারীদের সহায়ক হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে হওয়া বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহযোগিতা চুক্তির (টিকফা) ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত হবে বলেও আশা প্রকাশ করেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানা বিরোধ মিমাংশার পর বাংলাদেশ সমুদ্রে যে অগাধ জলরাশির অধিকার পেয়েছে সেখানে সমুদ্র তলদেশে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদের প্রাচুর্য রয়েছে। এই সম্পদ আহরনে বিনিয়োগ প্রয়োজন। আর এ কাজেও অন্যদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রেরও দুটি কোম্পানি কাজ পেয়েছে বলে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।তিনি বলেন, ২০১৪ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের, বিশেষ করে তৈরি পোশাকের প্রধান গন্তব্য। এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বন্দরগুলোতে বাংলাদেশ ৮ থেকে ২২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী জানান, গত বছর বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রে ৫ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলারের তৈরি পোশাক রপ্তানি করেছে, যার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের কাছ থেকে ৮৩২ মিলিয়ন ডলারের শুল্ক পেয়েছে।বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বাংলাদেশ ৬ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করছে, গত এক দশকে দারিদ্রের হার ৫৭ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, মাথাপিছু আয় ৬৫ শতাংশ বেড়েছে, ডাবল ডিজিট থেকে মুদ্রাস্ফিতি আবার ৭.৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়েছে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা হয়ে প্রায় এক কোটি, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে বলেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি আরও তথ্য দেন এই সময়ে রপ্তানি আয় তিন গুন বাড়িয়ে ১০.৫৩ বিলিয়ন থেকে ৩০.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়েছে। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের পরিমান ৫ বিলিয়ন ডলার থেকে ১৪.৫ বিলিয়ন ডলার দাঁড়িয়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০ বিলিয়ন ডলারের কোটা ছুয়ে এখন ২২ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।প্রধানমন্ত্রী যুক্তরাষ্ট্রের বিনিয়োগকারীদের বলেন, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ছাড়াও জাহাজ নির্মাণ, রিসাইক্লিং, রাসয়নিক সার, অটোমোবাইল, হালকা প্রকৌশল, কৃষি-প্রক্রিয়াকরণ, ঔষধশিল্প, সিরামিক, প্লাস্টিক, পাটজাত পণ্য, তথ্য প্রযুক্তি, সমুদ্রসম্পদ আহরন, পর্যটন, চিকিৎসা উপকরণ, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে।হোটেল গ্র্যান্ড হায়াতের ইম্পেরিয়াল হলে এই কর্মসূচিতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরো অংশ নেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত, প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন, প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচটি ইমাম, অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মসিউর রহমান, যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মোহাম্মদ জিয়াউদ্দিন, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব আবদুস সোবহান সিকদার, সিনিয়র সচিব আবুল কালাম আজাদ প্রমুখ।




