শ্যামলবাংলা ডেস্ক : সাভারের নিশ্চিন্তপুরসহ আশপাশের পোশাকপলীতে এখনও স্বজনহারাদের হাহাকার। অনাথ শিশুদের কান্নায় ঘুম ভাঙে গ্রামবাসীর। সাভারের রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর ঘণ্টা, দিন, মাস পেরিয়ে পূর্ণ হলো বছর। গত বছর ২৪ এপ্রিল ঢাকার অদূরে সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকায় ৯ তলা ভবন রানা প্লাজা ধসে পড়ে। নিমিষেই থেমে গেল শত শত শ্রমিকের জীবনের কোলাহল। মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয় রানা প্লাজা। নিহত হন এক হাজার ১শ ৩৫ জন শ্রমিক।

টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়ার সীমানা পেরিয়ে গোটা দুনিয়ার কোটি কোটি মানুষের চোখ ভিজে ওঠে। বিশ্বের বিভিন্ন গণমাধ্যমের শিরোনাম হয় ‘বাংলাদেশ’। ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা হয় এক হাজার ১শ ১৬ জনের মরদেহ। বাকিরা চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। জীবিত উদ্ধার করা হয় দুই হাজার ৪শ ৩৮ জনকে। ১শ ৫ জনের মরদেহ আজ পর্যন্ত শনাক্ত করা যায়নি। এখনও স্বজনকে খুঁজে ফিরছেন শোকার্ত মানুষ। ভবন ধসের পর টানা ২০ দিন চলে উদ্ধার অভিযান। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে অভিযানে যোগ দেয় হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। স্বতঃফূর্তভাবে উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে তারা আবারও প্রমাণ করে ‘মানুষ মানুষের জন্য’।
ঘটনার পর শ্রমিকদের পাশে এসে দাঁড়ান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তার হস্তক্ষেপে সশস্ত্র বাহিনী, পুলিশ, র্যাব, আনসার ও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিজেদের বেতন থেকে ও কল্যাণ ফান্ড থেকে অর্থ সহায়তা দিয়েছে। বিজিএমইএ, ব্যবসায়ী সংগঠন, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানসহ সাধারণ মানুষ আর্থিক- চিকিত্সা সামগ্রী দিয়ে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর পর আটকে পড়াদের উদ্ধারে এগিয়ে আসে সাধারণ মানুষ, সেনা, নৌ ও বিমান বাহিনী, র্যাব, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবক সংগঠন। সেই সময় শ্রমিকদের পাশে দাঁড়ায় সবকটি রাজনৈতিক দল। আহতদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্স, কর্মকর্তা কর্মচারী ও বেসরকারি সংস্থাসমূহ।আহতদের সাভার সিএমএইচে, সিআরপি এবং বেসরকারি এনাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ স্থানীয় ২২টি বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে চিকিত্সা দেয়া হয়। গুরুতর আহত ৮৫০ জনকে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট, পঙ্গু হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সিএমএইচ, বারডেম, অ্যাপোলো, ইউনাইটেড ও স্কয়ার হাসপাতালে চিকিত্সাসেবা দেয়া হয়। এছাড়া ওই সময় রাজধানীর প্রায় সকল সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল রানা প্লাজার দুর্ঘটনায় আহত শ্রমিকদের চিকিত্সা দিয়ে সহযোগিতা করেছে।
উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়ে মারা গেছেন বেসরকারি উদ্ধারকর্মী ইজাজ উদ্দিন চৌধুরী কায়কোবাদ। তার চিকিত্সার জন্য সিঙ্গাপুর পাঠাতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৩৫ লাখ টাকা দিয়েছেন। অশনাক্ত শ্রমিকদের ডিএনএ পরীক্ষার জন্য ৫০ লাখ টাকা দেন প্রধানমন্ত্রী। নিহত শ্রমিকদের স্বজনদের প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল হতে ২২ কোটি ১১ লাখ ৫২ হাজার ৭২০ টাকা বিতরণ করা হয়েছে। ২২টি হাসপাতাল ওই সময় চিকিত্সাধীন শ্রমিকদের চিকিত্সাসেবার জন্য ১ কোটি ৪২ লাখ ১৪ হাজার টাকা দেন প্রধানমন্ত্রী। এছাড়া পুনর্বাসন কার্যক্রম চালিয়ে আসছেন প্রধানমন্ত্রী। বিজিএমইএসহ অন্যান্য সংগঠন নিহত শ্রমিকদের পরিবারের আর্থিক সহায়তাসহ পুনর্বাসন সহযোগিতা করেছে।
রানা প্লাজায় স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামীকে। স্বামী হারিয়েছেন প্রিয়তমা স্ত্রীকে। ভাইকে ফেরত না পাওয়ার বেদনায় কাতর বোন। বোনের লাশের প্রতীক্ষায় ভাই। সন্তানের মৃত্যুশোকে ব্যাকুল মা-বাবা। ছোট্ট অবুঝ শিশুর কণ্ঠে ‘মা-বাবার’ ডাক। তবে মা-বাবার স্নেহের বন্ধন ছিন্ন হওয়া শিশুরা এখনও জানে না, কী অমূল্য সম্পদ তারা হারিয়েছে। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডিতে ছিন্নভিন্ন হয়েছে একেকটি সংসার। টানাপড়নের এসব সংসারে সুখের কমতি ছিল না। গত এক বছরে আহত শ্রমিকের কেউ কেউ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। শোক ভুলে শুরু করেছেন নতুন জীবন। আবার দুঃসহ সেই বেদনাকে ভুলতে পারেননি অনেকে। চোখে অশ্রু তার হৃদয়ে স্বজনহারা বেদনার ভার নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।
দিনটি স্মরণে আজ বিভিন্ন সংগঠন নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ কার্যালয়ে সকাল ১১টায় হবে দোয়া, র্যালি ও সংবাদ সম্মেলন। সকাল সাড়ে ৮টায় রানা প্লাজার স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবে গণসংহতি আন্দোলন। ৯টায় শোক র্যালি ও স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ করবে গার্মেন্টস শ্রমিক কর্মচারী লীগ। সকাল সাড়ে ১০টায় একই স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাবে গার্মেন্ট শ্রমিক মুক্তি আন্দোলন। সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে কাফনের কাপড় পরে প্রতিবাদ মিছিল ও স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা জানাবে গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতি। ১১টায় শ্রম মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভ মিছিল করবে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল। এছাড়া সকালে নতুনধারা বাংলাদেশ, জাগো বাংলাদেশ গার্মেন্ট শ্রমিক ফেডারেশন, গার্মেন্ট শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন জুরাইন কবরস্থানে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করবে।
রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের দ্রুত বিচারের দাবিতে দুপুর ১২টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করবে কর্মজীবী দল। সকাল ১১টায় প্রেস ক্লাবের সামনে সমাবেশ ও মিছিল করে বিজিএমইএ কার্যালয় ঘেরাওয়ের ঘোষণা দিয়েছে গার্মেন্ট শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র। সকাল ১০টায় প্রেস ক্লাবের সামনে মানববন্ধন করবে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল রিসার্চ অ্যান্ড হিউম্যান রাইটস। গাজীপুর থেকে রানা প্লাজা অভিমুখে শ্রমিক পদযাত্রা করবে শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন। রানা প্লাজার ট্র্যাজেডির পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের গৃহীত কার্যক্রম অবহিতকরণ বিষয়ে বিকেল ৩টায় সংবাদ সম্মেলন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বিকেল ৩টায় শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় এবং আইএলওর আয়োজনে একটি শেয়ারিং সেশন অনুষ্ঠিত হবে। বিকেল সাড়ে ৪টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত সেগুনবাগিচা শিল্পকলা একাডেমিতে সচেতনতামূলক চিত্র প্রদর্শনী করবে অক্সফাম।




