মো: শাহ্ জামাল
২০ এপ্রিল ছিল টক অব দ্যা মেলান্দহ। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানদের বিদায়-বরণ অনুষ্ঠানে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্য পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম এমপিকে সূধীজনের কাছে ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি টক দ্যা মেলান্দহে পরিণত হয়েছে। সর্ব মহলে জিজ্ঞাসা; কি হয়েছিল সেদিন। স্থানীয় একটি পত্রিকায় এ সংক্রান্ত কয়েকটি লাইন ছাপার পর জানার কৌতুহল আরো বেড়ে যায়। পরদিন ২১এপ্রিল নবনির্বাচিত উপজেলা চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানবৃন্দ প্রথম অফিস করেছেন। অনেক দিন পর নবাগত উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানদের সাথে কুশল বিনিময় কালেও ওই দিনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। প্রশ্নবানের মধ্যেও নবাগতদের এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করতে দেখা যায়নি।
অনুষ্ঠান চলাকালে প্রটোকল ভাঙ্গার অভিযোগে বিদায়ী উপজেলা চেয়ারম্যান ফারহান জাহেদী সফেন অনুষ্ঠানের উপস্থাপক প.প. কর্মকর্তা ডা. মীর মাসুদুর রহমানকে রুক্ষভাষা প্রয়োগ শেষে তারদিকে তেড়ে যান। মির্জা আজমের উপস্থিতিতে এমন অদ্ভূত পরিস্থিতি সামাল দিতে অতিথিবৃন্দরা বিদায়ী চেয়ারম্যানকে অবশেষে বারণ করেন। প্রাণচাঞ্চল্য পরিবেশটি ডিজিটাল পদ্ধতির মতো মুহূর্তেই ভেস্তে যায়।
যেভাবে ঘটনার অবতারণা হয়েছিল তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হচ্ছে-নবাগত উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান ও জামালপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি নূরুল আলম সিদ্দিকী বক্তব্য দেয়ার সময় বিদায়ী চেয়ারম্যান প্রতিবাদ স্বরে দাড়িয়ে বলেন-বন্ধ করুন আপনার বক্তব্য। এরপরই হলরুমে পিন পতন শব্দও শোনা যায়নি। সবাই নিরব। অবাকও। পরের ডায়লগ ‘উপজেলা চেয়ারম্যানের বক্তব্যের পরে কিভাবে ভাইস চেয়ারম্যান বক্তব্য দিতে পারেন?’ উপস্থিতিরা কিছুটা আঁচ করতে পারেন; আসল বিষয়টি কি? তড়িঘড়ি করে ওই ভাইস চেয়ারম্যান বক্তব্য শেষ করে তার আসনে বসেন। এরপরই বিদায়ী চেয়ারম্যান বকাবকির একপর্যায়ে উপস্থাপকের দিকে তেড়ে যান।
অবশ্য জেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক ফারুক আহাম্মেদ চৌধুরীর বক্তব্যে ওই ভাইস চেয়ারম্যানের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন চেয়ারম্যান বক্তব্য দেয়ার পরে ভাইস চেয়ারম্যান বক্তব্য দিতে পারেন না। উপস্থাপক অনুরোধ রাখতে গিয়ে এমন পরিবেশ জন্ম দেয়াকে ভাল চোখে দেখেননি। এ অনুরোধটুকু না করলেও চলতো। এরপর উপস্থিতিদের মাঝে বক্তব্যের সুযোগ দেয়া-না দেয়ার পক্ষে-বিপক্ষে এবং প্রটোকল মানা-না মানার মন্তব্য চলে। সবকিছু মিলে এক অদ্ভূত পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
এমতাবস্থায় মির্জা আজম অনাকাংখিত ঘটনার জন্য দু:খ প্রকাশ করে সূধীজনের কাছে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টি আকর্ষন করেন। এরপর ফারুক চৌধুরীর বক্তব্যের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করে মির্জা আজম বলেন, একশ’ দিনের কর্মসূচিতে দলীয় নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততা থাকায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে। তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, আগামীর প্রকল্পে দলীয় লোক থাকলেও কাজ আদায় করে নেয়ার কঠোর অবস্থানের কথা ব্যক্ত করেন। আইন শৃংখলা রক্ষায় তদবীর বাণিজ্য বন্ধেরও নির্দেশ দেন। ওসিকে সঠিক আইন প্রয়োগের প্রতি যতœবান হবার নির্দেশ দেন। সাধারণ মানুষ যাতে হয়রানি না হয়, সেদিকেও ইঙ্গিত দেন।
মির্জা আজমের বক্তব্যের পরে মিটিং শেষে বাইরে এ বিষয়ে নানা কথা ছড়ায়। এক পর্যায়ে নবনির্বাচিত উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান নূরুল আলম সিদ্দিকীকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি কাউকে কোন অনুরোধ করিনি। আমাকে বক্তব্য দিতে দেবে এটাও আমার অজানা। ফারুক চৌধুরীর কথার প্রতি উত্তর করিনি। কারণ তাকে শ্রদ্ধা করি। তবে উনি যখন জননিরাপত্তা আইনের মামলার আসামী হন; তখন সাংবাদিকদের ভূমিকার কথাটি ভুলে গেছেন। বিশেষ করে আমার পরিবেশিত ইনকিলাবের রিপোর্টের। কারণ মামলা থেকে রেহাই পেতে ওই সময়ে ইনকিলাবের রিপোর্টের গুরুত্বটি ছিল বেশী।
অনুষ্ঠানের সভাপতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, হয়তবা কেউ আকার-ইঙ্গিতে বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেছেন। যার জন্য উপস্থাপক কথা রক্ষা করতে গিয়ে বিব্রতবোধ করছিলেন।
উপস্থাপক ডা: মীর মাসুদুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষন করা হলে তিনি জানান, নবাগত ওই ভাইস চেয়ারম্যানকে বক্তব্য দিতে মঞ্চের বিশেষ অতিথিদের কয়েকজন অনুরোধ করেছিলেন। আমি তাদের অনুরোধ রক্ষা করতে গিয়েই এমন অবস্থায় পড়ি। মূল কথা হলো বিদায়ী চেয়ারম্যান-ভাইস চেয়ারম্যানদের ন্যায় নবাগতদেরও বক্তব্য দেয়ার জন্য নাম তালিকা করা ছিল। কিন্ত মাননীয় মন্ত্রী মহোদয়ের সময়ের স্বল্পতার দরুণ যে ক’জনের নাম বাদ দেয়া হয়েছিল, তাদের মধ্যে ওই সাংবাদিক-ভাইস চেয়ারম্যানের নামও ছিল। বিশেষ অতিথি ও অনুরোধকারীদের মধ্যে উপজেলা আ’লীগের যুগ্ম আহবায়ক আবুল মনসুর খান দুলাল জানান, বিদায়ীদের মেয়াদ অনেক আগেই চলে গেছে। বিদায়ীদের পরে অনুষ্ঠানটি ছিল নবাগতদেরই। এজন্য আমিসহ কয়েকজনেই বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেছিলাম। সেটি ছিল চেয়ারম্যান বক্তব্য দেয়ার আগেই।
মূলত: ওই সভাতে আরো কিছু বিষয় ছিল যা চোখের পড়ার মতো। আ’লীগ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষ শক্তি হয়েও মঞ্চে মুক্তিযোদ্ধার কোন প্রতিনিধিকে ডাকা হয়নি। এমনকি মুক্তিযোদ্ধার কাউকে কথা বলারও সুযোগ দেয়া হয়নি। এছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের সম্মান রক্ষার স্বীকৃতিটি সাংবিধানিক। কিন্ত মঞ্চে নির্বাচিত ১১টি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান-মেম্বারদের সমিতিও আছে। সেদিন এই নির্বাচিতদের যে কাউকে মঞ্চে জায়গা দিলে আরো সুন্দর স্বার্থক হতো বলে মনে করা হচ্ছিল। আলোচিত বিষয় হচ্ছে উপস্থাপক যদি ওই মুহূর্তে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে সমন্বয় করতেন। তাহলে এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না। আর উপস্থাপক নি:সন্দেহে একজন মেধাবী। কিন্ত বহুমুখী প্রতিভাবান নন- যা তার উপস্থাপনায় বার বার ধরা পড়েছে। আর সব বিষয়ে সকলের প্রতিভা থাকাটা বিরল বৈকি? সব কিছু ভুলে আমাদের সামনের চলার পথ হোক সবার কল্যাণে। প্রত্যাশা মেলান্দহবাসির। পরিশেষে বিদায়ী চেয়ারম্যান ফারহান জাহেদী সফেন রাজনীতি থেকে সরে যাবার কথাটিও সরব হয়েছে। আমরা উদিয়মান রাজনীতিককে হারানোর কথাটি মেনে নিতে পারি না। এ ক্ষেত্রে মির্জা আজমের দিক নির্দেশনামুলক বক্তব্য আমাদের মাঝে আশার আলো যুগিয়েছে। আমরা এই সত্য-সুন্দরকে নববর্ষের স্বাগত জানাই।

লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক ইত্তেফাক ও সভাপতি মেলান্দহ রিপোর্টার্স ইউনিটি।




