তাপস কুমার, আত্রাই (নওগাঁ) : ‘মৌমাছি মৌমাছি কোথা যাও নাচিনাচি-দাড়াও না একবার ভাই/ওই ফুল ফোটে বনে, যাই মধু আহরণে, দাঁড়াবার সময়তো নাই’। নব কৃষ্ণ ভট্টাচার্ষের বিখ্যাত শিশুতোষ কবিতাটি এখনও পাঠ্য পুস্তকে আছে। তাবে তার অর্থবহতা আর নেই। কালের আবর্তে, সময়ের ও প্রকৃতির পরিবেশ-প্রতিবেশের অভিঘাতে বদলে গেছে অনেক কিছু।

স্বার্থপর মানুষের অবিবেচনায় প্রকৃতির আর সব পতঙ্গের সাথে সাথে এখন প্রাকৃতিক মৌমাছিও হারিয়ে যেতে বসেছে। তাই প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধু মৌমাছির ঐক্যবদ্ধ অবস্থান আগের মতো আর চেখে পড়ে না। তবে পালিত মৌমাছি অর্থাৎ চাষ করা মৌমাছির এখন সুদিন চলছে। প্রাকৃতিক সেই বন আর নেই। তাই সেখানে আর ফুল ফোটে না। গুনগুনিয়ে মধু আহরণে যাবার সুযোগও সংকুচিত হয়েছে মৌমাছির। অন্যদিকে দাঁড়াবার জায়গা কোথায় আছে আর মৌমাছিদের। মাঠের ধানের সেই বড় ছায়াদার বৃক্ষতো সেই কবেই গিলে ফেলেছে ইটভাটা। প্রাণঘাতী (কার্বহাইড্রোড) উচ্চ দ্রবণীয় কীটনাশক জমিতে ব্যবহার বেড়েই চলেছে। ফলে জীবন ও প্রজনন রক্ষায় কুলিয়ে উঠতে পারছে না শ্রমী ক্ষুদ্র প্রাণীটি। অথচ চোখটা বন্ধ করে মনের জানালা খুলে একবারে নিকট অতীতের দিকে তাকালে বিলের গ্রামে-মাঠে-গ্রহন্থের বাড়ির পাশের গাছটিতেও ফসলের মৌসুম তো বটেই, অমৌসুমেও মৌমাছিদের (ক্ষুদে ও বড় মৌমাছির) চাক চোখের রেটিনায় ঢুকে যেতে। আশির দশকের এমন কেউ কি আছেন, যিনি তখন কিশোর-যুবক অথচ মৌমাছির চাক ভাঙতে গিয়ে তার কামড় খাননি।
মনে আছে কি মৌমাছিদের নিয়ে লাখো প্রবাদ। মৌমাছিরা নাকি গ্রামের মানুষের ভালো-মন্দ বুঝে চাক বাঁধতো। আর মৌমাছিরা যখন গুনগুনিয়ে উড়ে যেতো, তখন অনেক গুহস্থ বধূ ঢেঁকির শব্দ শুনে তার বাড়িতে চাক বাঁধে। এখন এ সবইতো কথার কথা। মৌমাছির বিচরণ ও চাক বাঁধার দৃশ্য দেখতে হলে খুঁজে ফিরতে হবে। না একবারেই যে চোখ পড়বে না, তাতো নয়। এই যেমন সেদিন উপজেলা নির্বাচন। গেলাম বিভিন্ন ভোটকেন্দ্রে। পথে উপজেলার বিশা ইউনিয়নের সমসপাড়া গ্রামে দেখি এক বাড়ির উঠোনের আম গাছের ডালে বিশাল এক বড় মৌমাছির চাক। আগের দিনে বিশেষ করে রবি ফসলের মৌসুমে মৌমাছিদের দেখা মিলতো খুব। কারণ আমাদের অনেক ফসল যেমন, সরষে জাতীয় ফসল পরপরাগায়ন নির্ভর। মৌমাছিরা এ সব ফসলের পরাগায়ন (পলিনেশায়) ঘটায়। আর ফলের মৌসুমেতো মৌমাছিদের জয়জয়কার। প্রায় সব ফলেরই পরাগায়ন ঘটে মৌমাছির মাধ্যমে। আম লিচু সবই। মৌচাক থেকে মাসে দুইবার মধু সংগ্রহ করা যায়। একটি মৌচাক থেকে প্রতিবার ৫/৬ কেজি মধু সংগ্রহ করা যায়। সর্বগ্রাসী গুনের প্রাকৃতিক এই নির্যাস। মধুর ঔষাধি গুনের কথা কি বলে শেষ করা যায়। তখন মৌবনে এক মধুর গুঞ্জরনে ধ্রপদীলয়ের এক অপরূপ প্রকৃতি ধরা দেয়। পতঙ্গ বিজ্ঞানীরা তাইতো বলেন, মৌমাছিরা আছে বলেই এখনো জীবনে মধুময়তার নাগাল মেলে।




