জামালপুর-৩ (মেলান্দহ-মাদারগঞ্জ) আসন থেকে নির্বাচিতরা কেউ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী হননি। যা স্বাধীনতার ৪ দশক পরে হলেও মির্জা আজম রেকর্ড ভাঙ্গলেন। শুধু কি তাই! আমাদের আসন থেকে নির্বাচিতরা কেউই বিরোধী দল-সরকারি দলের প্রতিমন্ত্রী মর্যাদাবান চীফ হুইপ, হুইপও ছিলেন না। এতেই শেষ নয়; মির্জা আজমের মতো যুবলীগ সেক্রেটারী কিংবা অন্য দলের কেউ এ আসন থেকে এত বড় পদ মর্যাদা পাননি। এটি মেলান্দহ-মাদারগঞ্জবাসির নিরহংকার গর্বও। কৌতুহলীদের নানা প্রশ্নের মুখে পড়েই আজকের লেখাটির আবির্ভাব।

জাতীয় পর্যায়ে এমন নেতার খ্যতি অর্জন একটি কঠিন কাজ। রাজনৈতিক ফর্মূলায় নেতার নীতি-আদর্শ ও কর্মই নাকি নেতৃত্বকে পাকাপোক্ত করে। দেশ-জনতার সেবার কাজ করার সুযোগ সৃষ্টি করে। নেতা হন জননন্দিত। কর্মের মধ্যেই নেতাকে বাঁচিয়ে রাখে। কর্ম দোষেই নেতাকে আবার ইতিহাসের আস্তাকুড়ে পড়তে হয়। সময়ের পটপরিবর্তনের সাথে টক্কর দিয়ে মুহুর্তেই জন বিচ্ছিন্ন হতে হয়।
একটি বিষয় স্পষ্ট হচ্ছে; যা কাওকে ছোট করার জন্য নয়। গোটা জেলায় এবার মির্জা আজম একমাত্র মন্ত্রী। এর আগে দু’জন শ্রদ্ধাভাজন প্রভাবশালী মন্ত্রী ছিলেন। খুব সম্ভবত: তাদের দ্বারা কাঙ্খিত উন্নয়ন না হওয়ায় ছিটকে পড়েছেন। তাদের বিষয়ে মিডিয়ায় অনেক খবরাখবর প্রকাশ হয়েছে। বিএনপির আমলে শ্রদ্বাভাজন মরহুম ব্যরিস্টার আ: সালাম তালুকদার, তার ভাতিজা মেজর অব. আনোয়ারুল কবির তালুকদার, সিরাজুল হক প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। জাতীয় পার্টির আমলে এম.এ. সাত্তারও মন্ত্রী ছিলেন। এরবহু আগে নির্বাচনী এলাকা মাদারগঞ্জের তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী গিয়াস উদ্দিন ছিলেন। এদের কর্মের পূর্ণ সাফল্য না থাকলেও উলেখযোগ্য অবদানের কথা আজো মানুষের কাছে শোনা যায়। আবার কারোর নেতিবাচক সমালোচনাও কম নয়। ইতোমধ্যেই মানুষ বলাবলি করছে-আপনার বিষয়ে আলোচিত হবে কোনটি? সমালোচনা ইতিবাচক হোক এটাই আমাদের কাম্য। তবে এ কথাও সত্য যে, আপনি মন্ত্রী না হয়ে এমপি হয়েও অনেক উন্নয়নের স্বাক্ষী রেখেছেন। দলমত নির্বিশেষে আপনার কাছে কোন লোক গেলে ফেরত দেননি। দলীয় টানে কারোর ক্ষতি করেননি। মূল্যায়ন করেছেন-কোন দল নয়- আপনার নির্বাচনী এলাকার একজন ভোটার হিসেবে। এখন ভাবতে হবে সারা দেশের গণমানুষের কথা। যা নেতার বিশেষ গুণ। শিক্ষা-অবকাঠামো ছাড়াও; বৈদেশিক সহায়তায় এনজিওদের পরিচালিত প্রকল্পটি নিজ নির্বাচনী এলাকায় বাস্তবায়নের জন্য অসামান্য অবদান রেখেছেন। যে খবরটি অনেক সচেতন মহলও জানে না।
সাবেক শ্রদ্ধাভাজন সাত্তার মন্ত্রী এক জনসভায় বলেছিলেন- মন্ত্রী হলে নাকি এমপি’র তুলনায় কাজ করার সুযোগ কম থাকে। তিনি যুক্তি উত্থাপন করে বলেন-এমপি হলে শুধু নির্বাচনী এলাকার চিন্তা। মন্ত্রী হলে ভাবতে হয় গোটা দেশ-জাতিকে নিয়ে। এখানেই বিস্তর ফারাক। সাত্তার ভাইয়ের ফর্মূলাটি সত্য হলে আ’লীগ সরকারের জামালপুরের প্রভাবশালী দু’মন্ত্রীর ভাগ্যেও কি তাই ঘটেছে? তানাহলে কাঙ্খিত উন্নয়ন হল না কেন? এটি ভুলে গেলে চলবেনা। এই হিসেবে মন্ত্রী হয়ে উন্নয়নের প্রশ্নে সামনে আপনার কঠিন পরীক্ষা।
রাজনীতিক হিসেবে মির্জা আজমের রাজনীতির চালবাজির কথা সংসদ থেকে এখন চা’র দোকানেও। কোন নেতাকে কোন পথে ভিড়াতে হবে? কোন চাল কখন কিভাবে দিতে হবে? মির্জা আজমের কৌশলগত কমনসেন্স বহুল আলোচিতও। রাজনীতির বিশ্লেষকদের ধারণা-নিজ দল ও বিরোধী দলের নেতার ইতিবাচক, নেতিবাচক কর্মকান্ড কিংবা বাস্তবতা থেকে শিক্ষা না নিলে চৌকস হওয়া যায়না। সম্ভবত: রাজনীতিতে মির্জা আজম এ শিক্ষা গ্রহণ করেছেন। আবার দলীয় কোন কোন লোক মির্জা আজমের ইতিবাচক সমালোচনায় বলেছেন-যুবলীগের সেক্রেটারী নিতে যে অভিজ্ঞতা অর্জন হয়েছে। যুবলীগের সেক্রেটারী হয়ে সারা দেশ তথা দেশ-বিদেশেও নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করেছেন। এ শক্তিশালী নেটওয়ার্কটি মির্জা আজমের উত্থানের স্বপ্ন বাস্তবায়ন হতে থাকে। এ নিয়ে কতিপয় নেতা-এমপি মন্ত্রী বিরাগ ভাজনও হয়েছেন বলেও কল্প কাহিনীর মতোও সমালোচিত হচ্ছে। আ’লীগের বিরোধী শিবির প্রকাশ্যে মির্জা আজমের নামে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতেও বাদ যাচ্ছেনা। বিডিআর বিদ্রোহের সময় মির্জা আজমের প্রশংসনীয় ভূমিকায় দেশ বড় বিপর্যয় থেকে রক্ষা পায়।
এ কথাও সত্য রাজনীতির বলিতে বেশ ক’টি মার্ডার কেসের আসামী হওয়ার কথা বলাবলি কম হয়নি। তবে উচ্চ আদালতে মির্জা আজমকে বে-কসুর খালাস দেয়া হয়। মির্জা আজম যাদের ইঙ্গিতে মার্ডার কেসের আসামী হন। তাদের সাথে সখ্যতা গড়ে উন্নয়নের কাজে সহায়তা করা; তাদের কাছ থেকে সংবর্ধনা নেয়া একটি যাদুর কাঠির বন্ধন বলে মনে হয়। এটিই তার রাজনীতির প্রজ্ঞার পরিচয় বহন করেছে।
মির্জা আজমের উন্নয়নের কাজর মধ্যে মাদারগঞ্জবাসিকে স্বাধীন করার কাজগুলো আজীবন মনে রাখার মতো। তাহচ্ছে-জেলা সদরের সাথে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। মাদারগঞ্জবাসিকে সড়ক পথে আগে যেতে হতো একমাত্র মেলান্দহ হয়ে। এখন যেতে পারছেন-মেলান্দহ ছাড়াও হাজরাবাড়ি ও শ্যামগঞ্জ কালিবাড়ি হয়েও। এছাড়া মাদারগঞ্জ থেকে উত্তর বঙ্গের সাথে সরাসরি যোগাযোগের জন্য যমুনা নদীর উপর দিয়ে আরেকটি সেতু নির্মাণ হতে যাচ্ছে। এটিও তার উন্নয়ন কাজের একটি। আর এটিকে এমন স্থানে নির্মাণ হতে যাচ্ছে সেই নির্মাণাধীন সেতুটির সংযোগ স্থল কাকতালীয়ভাবে হলেও বিরোধী দল বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের ছেলে তারেকের বাড়ির পাশ দিয়ে। বিজ্ঞজনের ধারণা যদি মির্জা আজম ক্ষমতায় নাও থাকেন-তারপরও সেতুর কাজ সম্পন্ন হবে। খুব সম্ভবত: এজন্যই মাদারগঞ্জবাসি মির্জা আজমকে আজীবন নির্বাচিত করতে কার্পন্যও করবেনা। এ ক্ষেত্রে ভোটযুদ্ধে মেলান্দহ থেকে প্রাপ্ত ভোট বোনাস হিসেবে ধরলেও ভুল হবেনা।
শেষ কথা হলো-মির্জা আজমকে ২২জানুয়ারী মেলান্দহ উমির উদ্দিন পাইলট হাই স্কুল মাঠে গণসংবর্ধনা দেবে। এজন্য সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। শোনা যাচ্ছে জন নন্দিত কণ্ঠশিল্পী মমতাজ এমপিও গান গাইবেন। ইতোমধ্যেই এটির সাড়া জাগিয়েছে। মির্জা আজমকে টানা ৩ দিন জামালপুরে পৃথক সংবর্ধনা দেয়া হবে। লক্ষণীয় বিষয় হলো এর আগে প্রভাবশালী পূর্ণ মন্ত্রী থাকলেও সংবর্ধনার এত জোয়ার কিংবা এত্তো পরিমাণ তোরণ নির্মিত হয়নি। এতেই প্রমাণ করে মির্জা আজম জননন্দিত নেতা।
অপ্রিয় হলেও সত্য বিএনপির আমলে দলটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব জামালপুরে আগমন করেছিলেন। তার আগমনেও এত্তো সংখ্যক তোরণ নির্মিত হয়নি। তবে তারেকের আগমনে শহরের রাস্তায় পানি ঢেলে পরিচ্ছন্ন’র আওতায় আনা হয়েছিল। মির্জা এই রেকর্ডও ভাঙ্গলেন বলেও মানুষ মনে করছেন। জামালপুর, মেলান্দহ ও মাদারগঞ্জে মির্জা আজমকে সংবর্ধনা জানাতে প্রায় তিন শ’ তোরণ নির্মাণ হচ্ছে বলে নেতা-কর্মীরা জানিয়েছেন। সংবর্ধনাকে ঘিরে আলোচনা সমালোচনার যবনিকা হচ্ছে-তারেক জিয়া একবার এই জামালপুরের সংবর্ধনায় দেশ ব্যাপী সমালোচিত হন। যা এখনো অব্যাহত আছে। সেই তারেক এখন দেশ ছাড়া। তারেকের পরিণতি এখন সিনেমা ফে’ল। এখান থেকে শিক্ষা নেয়ার মত অনেক দিক নির্দেশনা আছে বলে আমরা মনে করি।
প্রতিবেশী ভারতের সাবেক প্রধান মন্ত্রী রাজিব গান্ধিকে ফুলের তোড়ায় বোমা সেট করে হত্যা করা হয়। জননন্দিত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, সাবেক প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও রেহায় পায়নি। এদের চেয়ে জননন্দিত আজম ভাই নন। মনে রাখতে হবে অতি উৎসব কাল হয়। আজম ভাইকে বলব মন্ত্রী হলে দায়িত্ব বাড়ে। বাড়ে শত্র“তাও। তাই, সাবধান আজম ভাই। আপনার মেধা-মননশীলতা, ধৈর্য্য ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগালে শুধু মাদারগঞ্জবাসীই নয়, উপকৃত হবে গোটা জাতি তথা সমগ্র দেশ।
আপনি বিগত নির্বাচনে মেলান্দহ-মাদারগঞ্জের উন্নয়নের অংশ হিসেবে মেলান্দহ পৌরসভাকে তৃতীয় থেকে দ্বিতীয়, রেল স্টেশন সংস্কার, অসমাপ্ত রাস্তা-ঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ, মেলান্দহ উমির উদ্দিন পাইলট স্কুলকে সরকারি করণ, গ্যাস সংযোগ, বিদ্যুতের উন্নয়ন করার প্রতিশ্র“তি দিয়েছিলেন। এর মধ্যে অনেক গুলোর উন্নয়ন হয়েছে। বাকি কাজ অসমাপ্তই আছে। মেলান্দহবাসি যে স্কুল মাঠে সংবর্ধনা দিচ্ছে সেই উমির উদ্দিন স্কুলটি সরকারি করণে ঘোষণা দেবেন এটি বড় দাবির একটি।
একই সাথে আপনার কাছে আবেদন নিবেদন-দীর্ঘ দিন যাবৎ জামালপুর গামী ঝিনাই সেতুর টোল আদায়ের হার বিশ্ব রেকর্ড। আপনি জানেনকি? শুধু প্রতিটি সিএনজির ড্রাইভারকে দৈনিক অন্তত: ১শ’র উপরে টোলের টাকা গুণতে হচ্ছে। যা কর্মজীবি কায়িক শ্রমিকদের উপর নেহায়েত অবিচারের শামিল। সারাদেশের ন্যায় টোল আদায়ের শান্তিপূর্ণ সমাধান হতে পারে এমন-দৈনিক পারাপারের জন্য একটি নির্দিষ্ট টাকার সিস্টেম থাকতে পারে। এখানে তা হচ্ছে না। কিন্ত ছোট-খাট যানবাহন প্রতিবারের আপ-ডাউনের বিপরীতে নিয়মিত টোল আদায় খেটে খাওয়া মানুষের পক্ষে বিবেচনার অধিকার রাখে। সম্ভব হলে ইজারাদারের টোল আদায় মেয়াদান্তে জনস্বাথেই টোল প্রত্যাহার মেলান্দহ, মাদারগঞ্জ, ইসলামপুর, দেওয়ানঞ্জ ও রৌমারী-কুড়িগ্রামবাসীর। পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে লিখছি। অভিনন্দন মির্জা আজম ভাই। আমাদের আজম ভাইকে।
লেখক : সাংবাদিক, দৈনিক ইত্তেফাক, মানবাধিকার কর্মী ও সভাপতি মেলান্দহ রিপোর্টার্স ইউনিটি। ই-মেইল:




