এস, এম, আজিজুল হক : সত্যি আপনার জুড়ি মেলা ভার। কখনও নেতা, কখনও কবি, কখনও প্রেমিক, কখনও কারো ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়ি, কখনো অভিমানী। আসলে যে আপনি কি, তা বোধ হয় আপনি নিজেও ঠাহর করতে পারেননা। আপনার কোন কথা সত্যি আর কোন কথা মিথ্যা-তাও বোঝা দায়। তবে আপনি যে একটা শিশুমনের মানুষ-এ বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। জাতী আপনার মনটা বুঝলোনা, এটাই দুঃখ। তবে রাজনীতি যে কবিতা নয়, রাজনীতি যে আবেগ নয়, রাজনীতি যে নিরোর বাঁশির সুর নয়-এ কথা অতি নির্মম হলেও সত্য। আর এই সত্যটাকে আপনি বুঝতে চাননা বলেই যত গন্ডগোল। সকালের কথা বাসি হতে না হতেই বিকেলে আর এক কথা বলা আপনার শিশু মনেরই পরিচয় বহন করে। আপনার মনে জটিলতা, কুটিলতা আছে বলে মনে হয়না। অথচ আজকের রাজনীতি জটিলতা কুটিলতা আর মিথ্যাচারে যে ভরা, এ সত্য আপনার চেয়ে বেশী কারো বোঝার কথা নয়। কারন ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়ি হয়ে কি পেয়েছেন আপনি ? এটা তো হবার কথা ছিলনা ? এর কারন কি কখনও খতিয়ে দেখেছেন ? অবশেষে চরম অভিমান আর ঘৃনায় আপনি আত্মহত্যা করার প্রত্যয় ব্যাক্ত করেছেন। জাতী আপনার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিল। জাতী পুরুষ নেতৃত্বকে বরণ করার জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু আপনি নিজেই সব ওলট পালট করে দিলেন। কারো ক্ষমতায় যাওয়ার সিড়ি না হয়ে একটু ধৈর্য্য ধরে এগুতে পারলে আজ দাবার ঘুটি আপনার কোটে আপনা আপনি এসে যেতে। সা¤প্রতিক রাজনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে জাতী দু’নেত্রীর কবল থেকে মুক্তির প্রহর গুনতে শুরু করেছিল। কিন্তু তারা যাবে কোথায়? জাতীর এই সা¤প্রতিক গন্তব্যের পথে আপনি নিজ হাতে কাটা বিছিয়ে দিলেন অবশেষে। মানুষের মন না বুঝলে গল্প লেখা যায়না, মা মাটি মানুষকে ভাল না বাসলে কবিতা লেখা যায়না। সে দিক বিবেচনায় জাতীর দুঃখ কষ্ট, চাওয়া, পাওয়ার হিসেব আপনার চেয়ে বেশী কে আর বোঝে। আপনি কবিতা লিখতে পারেন, আপনি প্রেম করতে জানেন, আপনি মানুষের দুঃখ বোঝেন, কষ্ট বোঝেন, অথচ তাদের চাওয়া বোঝেন না? আপনি প্রেমিকের মত শূধু অভিমান করতে জানেন, রাষ্ট্র নায়কের মত দৃঢ় কোন সিদ্ধান্ত নিতে জানে না, নেতার মত করে রাজনৈতিক কর্মকান্ড পরিচালনার সঠিক দিক নির্দেশনা দিতে জানেনা। তাইতো আমরা লিখতে পারি-কত রঙ্গ জানোরে যাদু কত রঙ্গ জানো। আপনার ক’টা রিভলবার আছে, জাতী তা জানতে চায়না, আপনি কি মাপের প্রেমিক, তাও জাতি জানতে চায়না, আপনি কি মানের কবি সেটাও জাতীর কাছে মুখ্য বিষয় নয়। আত্মহত্যা করবেন কি, করবেন না-সেটা একান্তই আপনার ব্যাক্তিগত ব্যাপার। আর রিভরবারের বুলেট দ্বারাই যখন আত্মহত্যা করতে চাইছেন, তখন চারটে রিভলবার লাগবে কেন? একটা রিভলবারের একটা বুলেটই তো যথেষ্ট হওয়ার কথা। নাকি এ রিভলবারগুলোও আপনার কথার মত সত্যি নয়? রাজনীতি করেন বিধায় এখন জাতীর কাছে প্রশ্ন উঠেছে-আপনি কোন প্রকৃতির নেতা। নেতাই যখন আত্মহত্যার হুমকি দেয়, তখন তার কর্মী বা অনুসারীদের কি দশা? ছোট বেলায় আমার এক পরশী মুরুব্বী নারীর স্বামী মারা যাবার পর তার বিলাপ করে কান্না শুনেছিলাম। সেই বিলাপ করে কান্নার কথা আজো স্পষ্ট করে মনে আছে। মহিলা কান্নার বিলাপের কথা ছিল-“ ও মানুষরে (স্বামীকে মানুষ বলছিল) –তুমি) মোর্যা গ্যালা (মারা গেলে) আমাক লেইহ্যা (লিখে) পড়্যা দিয়া গ্যালানা, মানুষরে ওমানুষ”। আপনার আত্মহত্যার কথা শুনে ওই মহিলার কান্নার বিলাপের কথা বার বার মনে পড়ছে। আপনিতো আত্মহত্যা করবেন-আপনার অনুসারীদের কিছু বলে গেলেন না? তারাও কি আত্মহত্যা করবে নাকি আমার আলোচিত মহিলার মত দ্বিতীয় সোয়ামী ধরবে? আপনিতো প্রেমিক, আপনিতো কবি। আপনার এত সহজে আত্মহত্যা করার ইচ্ছা জাগার কথা নয়? নাকি এটাও আপনার শেষ কথা নয়? আপনার শেষ কথা-তথা শেষ পরিনতি কি, তা আলাহ মাবুদই জানেন। আপনার প্রতি এদেশের মানুষের ভালবাসা খুব একটা কম ছিলনা। কিন্তু নাটাই কাটা ঘুড়ির মত আপনার কথাবার্তায় সে পরিমানটা কমতে শুরু করেছে। আপনি কি জানেন, যারা মিনিটে মিনিটে কথা বদলায়- গাঁও গেরামের মানুষ তাদেরকে “এরশাদ” বলে ডাকা শুরু করেছে? এক সময় বোকাদেরকে যেমন মফিজ বলে ডাকা হতো-অনেকটা সে রকমই ব্যাপার স্যাপার। মফিজ নামের কি চালাক চতুর মানুষ নাই? কোন মফিজ কবে কোথায় বোকামী করেছিল, আমরা জানিনে। অথচ আমাদের মনে প্রানে গেথে গেছে-বোকা শব্দের অর্থ মফিজ। যেমন মিরজাফর মানে বিশ্বাসঘাতক হিসেবে স্বীকৃত। ধিকৃত মানুষ হিসেবে যেমন রাজাকাররা স্বীকৃত। আসলে আপনি কোন নামে স্বীকৃতি লাভ করতে পছন্দ করেন, বা কোন বিষয়ে বিশেষায়িত হতে চান-সেটা আজো অনাবিস্কৃত। কিন্তু এবার মনে হয় সেই অনাবিস্কৃত বিশেষণ আবিস্কার হতে চলছে। ছোট্ট একটা সত্যকে যেমন হাজার হাজার মিথ্যা দিয়ে ঢেকে রাখা যায়না, তেমনি সকাল বিকাল কথা বদলিয়েও পার পাওয়া দুস্কর। আর তা না হলে আপনি আত্মহত্যা করতে চাইবেন কেন? জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো মানুষ আর মৃত মানুষের মধ্যে খুব একটা তফাৎ আছে কি? মৃত মানুষ যখন আত্মহত্যার হুমকি দেয়-তখন তা পৌরানিক গল্প কবিতার প্লট হয়ে যায়। রাজনীতিতে একটা কথা আছে-যে নিজের জীবনের নিরাপত্তা দিতে পারেনা, সে কখনও বিপ্লবী হতে পারেনা। তাইতো আত্মঘাতি যোদ্ধারা কখনও বিপ্লবীর মর্যাদা পায়না। আপনার নামের বিশেষণ ছিল শ্বৈরাচার-এখন মুল নামটাই বিশেষণে রুপ নিতে বসেছে। ইতিহাস খ্যাত গোয়েবল্স মিথ্যাচারী নেতা ছিলেন সত্য, তবে তিনি যা বলতেন-সেই বলা মিথ্যা কথা থেকে এক চুলও নড়তেন না। আর এই দৃঢ়তা তাকে এমন বিশ্বাস এনে দিয়েছিল যে, একটা মিথ্যা বার বার বললে বা প্রচার করলে এক সময় মানুষ তাকে সত্য বলে ধরে নেয় বা মেনে নেয়। আর এটাই গোয়েবল্স থিওরি নামে খ্যাত। কিন্তু আপনি আপনার বলা কথা নিজেই অবিশ্বাস করেন এবং দ্রুত তা পাল্টিয়ে ফেলেন। মানুষ ডিগবাজী খায় সত্য কিন্তু কথার ডিগবাজী হয়, এটা অনেকেই জানতো না। কথার ডিগবাজীর যাদুকর হিসেবে আপনার জুড়ি মেলা ভার। কবিতার পংতিমালায় চাঁদের জোস্নায় ম্লান করা যায় কিন্তু বৈষয়িক জীবনে ম্লান করতে পানির প্রয়োজন হয়। তাই বলি-যথেষ্ট হয়েছে। এবার শুধু কবিতাই লেখেন-রাজনীতি না হয় অন্যরা করুক। আপনি ভাল করেই জানেন-গান মানেই কবিতা, কিন্তু সব কবিতায় গান হয়না।




