পাবনা প্রতিনিধি : ক্যানেল পদ্ধতিতে জমিতে পানি সেচ দিয়ে পাবনা আইআরডি (ইরিগেশন) প্রকল্পে প্রতি বছর অতিরিক্ত এক লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন ফসল উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। তবে আন্ডার পাস ওয়াটার সাপ্লাই পদ্ধতি প্রয়োগ করে ফসল উৎপাদনের কাঙ্খিত এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব বলে প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন।
জানা যায়, বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়নে সবচেয়ে আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন পাবনা আইআরডি প্রকল্পের কাজ ১৯৮০ সালে শুরু হয়ে ১৯৯২ সালে শেষ হয়। প্রকল্পের আওতাভুক্ত এক ফসলী জমি তিন ফসলীতে রূপান্তর এবং ১৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দিয়ে এক লাখ ৯১ হাজার মেট্রিক টন অতিরিক্ত ফসল উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা নির্ধারন করা হয়। কিন্তু গত ২২ বছরে এই লক্ষ্যমাত্রার ২৫ ভাগও অর্জিত হয়নি।
বেড়া পাউবো’র সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রকল্পের সেচ সুবিধা প্রদানের জন্য সাড়ে ৪২ কিঃ মিঃ প্রধান সেচ ক্যানেল, ১৯টি সেকেন্ডারী ক্যানেল, ৪৭টি টারশিয়ারী ও চার শতাধিক মাইনর ক্যানেল নির্মান করা হয়। ১৯৯২ সালে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়। ১৯৯২ সাল থেকে গত অর্থবছর পর্যন্ত সেচ ক্যানেলের ডাইক বাঁধগুলো মজমুত করন, সম্প্রসারন, সেচ ও নিস্কাশন ক্যানেল সংস্কার বাবদ এডিবি এবং জিওবি’র প্রায় সাড়ে তিন’শ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়েছে। অথচ আজ পর্যন্ত প্রকল্পের একটি সেকেন্ডারি, ৩০টি টারসিয়ারী ও দুই শতাধিক মাইনর ক্যানেলে পানির প্রবাহ ঘটানো সম্ভাব হয়নি।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, রবিবার (০১ ডিসেম্বর) থেকে দেশে বোরো আবাদ মৌসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু পাউবো কর্তৃপক্ষ আজ পর্যন্ত পাবনা আইআরডি প্রকল্পে বোরো আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারন করতে পারেনি। প্রকল্পের সেচ ক্যানেলের ক্ষতিগ্রস্থ ডাইক বাঁধগুলো সংস্কার করা হয়নি। ফলে প্রকল্প থেকে কাঙ্খিত সেচ সুবিধা পাওয়া যাবে কি-না তা নিয়ে কৃষকদের মঝে দেখা দিয়েছে সংশয়। গত মওসুমে প্রকল্পের কমান্ড এরিয়ায় আবাদ হয়েছিল মাত্র চার হাজার হেক্টর জমিতে। সেচ সার্ভিস চার্জ আদায় এবং চলতি বোরো মওসুমে জমিতে সেচ প্রদানের ব্যাপারে নির্বাহী প্রকৌশলীসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোন মাথা ব্যাথা বা তৎপরতা নেই বলে কৃষকেরা অভিযোগ করেছেন।
এলাকার কৃষকেরা ক্ষোভের সাথে জানান, পাবনা আইআরডি প্রকল্পটি মূলত পাউবোর এক শ্রেনীর দূর্নীতিবাজ প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের কাছে সোনার ডিম পাড়া হাঁসে পরিনত হয়েছে। এই প্রকল্পের কল্যানে তাদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও সেচের মাধ্যমে অধিক ফসল উৎপাদন করে কৃষকদের ভাগ্যের পরিবর্তন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। প্রকল্পটি চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে সেচ ক্যানেল, নিস্কাশন ক্যানেল ডাইক বাঁধ মেরামত, সংস্কার ও পুনরাকৃতিকরণ কাজের নামে ভূয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা আত্মসাত করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রে জানা গেছে।
এলাকাবাসী ও পানি উন্নয়ন বিভাগের একটি দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর সেচ ক্যানেলের ডাইক বাঁধ সংস্কার, পুনরাকৃতিকরনের নামে ডাইক বাঁধে স্লোপের মাটি কুপিয়ে ওলট পালট করে বিল উত্তোলন করে নেয়া হয়েছে। এমনকি কোন কোন ক্যানেলের কাজের প্রাক্কলন রিভাইস করে দ্বিগুন তিনগুন টাকা উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। নাম মাত্র কাজে মাটি কুপিয়ে ওলট-পালট করায় ক্যানেল বাঁধ দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে সেচ মৌসুমে ক্যানেলে পানি প্রবাহ ঘটানোর পর বার বার ডাইক বাঁধ ভেঙ্গে উঠতি ফসল ক্ষতিগ্রস্থ হয়।
প্রকল্পের পানি ব্যবহারকারী ফেডারেশনের কর্মকর্তা ও কৃষকরা অভিযোগ করেছেন, দীর্ঘ ২২ বছর ধরে প্রকল্পের সেচ ক্যানেল, নিস্কাশন ক্যানেল ত্র“টিমুক্ত, ডাইক বাধ পুনরাকৃতিকরনের নামে কোটি কোটি টাকা ব্যয় দেখানো হয়। প্রকৌশলী ও ঠিকাদাররা পরস্পর যোগসাজশে নাম মাত্র কাজ করে বরাদ্দের সিংহভাগ টাকা লুট-পাট করছে। এতে প্রকৌশলী ঠিকাদারদের ভাগ্যের পরিবর্তন হলেও প্রজেক্টের অবকঠামোর তেমন কোন উন্নতি হয়নি। বিভিন্ন সময়ে এসব অনিয়ম ও দূর্নীতির তদন্ত হলেও টাকার ভারে সব ধামাচাপা পড়ে গেছে।
প্রকল্পের কমান্ড এরিয়াভূক্ত বেড়া উপজেলার মোহনগঞ্জ, হরিরামপুর, কৈটোলা, নতুন পেঁচাকোল, মাছখালি, সাঁথিয়া উপজেলার গাগড়াখালী, ছেচানিয়া, সানিলা, বড়গ্রাম, বোয়াইলমাড়িসহ ৩০ টি গ্রামের কৃষকরা গত ২২ বছর ধরে প্রকল্পের সেচ সুবিধা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন। প্রকল্প এলাকার কয়েকটি গ্রাম এলাকা সরেজমিন ঘুড়ে দেখা যায়, ওই গ্রামগুলোর কৃষকরা মাঠে নিজ উদ্যোগে সেচযন্ত্র স্থাপন করে বোরো চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
পানি ব্যবহারকারি সমিতির সভাপতি আনছার আলী জানান, প্রকল্পের সেচ সুবিধাভোগী চাষিদের তিনটি ফসল আবাদের জন্য বিঘা প্রতি বছরে মাত্র ১৮০ টাকা সার্ভিস চার্জ দিতে হয়। এতে প্রকল্পের সেচ সুবিধা প্রাপ্ত কৃষকদের ফসল উৎপাদন খরচ অনেক কম পড়ছে। অপরদিকে প্রকল্পের কমান্ড এরিয়াভূক্ত অথচ সেচ সুবিধা বঞ্চিত কৃষকদের নিজ উদ্যোগে সেচযন্ত্র স্থাপন করে জমিতে সেচ দিতে হয়। এর ফলে শুধুমাত্র বোরো ধান আবাদে কৃষকদের সেচ বাবদ সাড়ে তিন হাজার টাকা বেশি ব্যয় করতে হয়। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেন।
প্রকল্পের কমান্ড এরিয়াভূক্ত ১৮ হাজার ৬৮০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা প্রদানের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহনের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, বোরা মওসুম শুরু হয়েছে। কিন্তু আজ পর্যন্ত পাউবো কর্তৃপক্ষ সেচ লক্ষ্যমাত্র নির্ধরন করতে পারেনি। কিন্তু অধিক ফসল উৎপাদনে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার ব্যাপারে তাদের কোন তৎপরতা নেই বলে তিনি অভিযোগ করেছেন।
বেড়া পাউবোর প্রকৌশলী মোঃ ফাইজার রহমান জানান, মূলত; এটি সেচ নির্ভর ইরিগেশন প্রজেক্ট। এই প্রজেক্টের সমস্যা চিহিৃত করে পরিকল্পিত সমাধানের মাধ্যমে সেচ ও ফসল উৎপাদনের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব। কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যারাই এ প্রজেক্টের দায়িত্বে এসেছেন তারা কেউই সমস্যার সমাধান এবং ইরিগেশনের উন্নয়নে কোন কাজ করেননি।
তিনি বলেন, পাবনা প্রকল্পের জমি উচু-নিচু। ক্যানাল পদ্ধতিতে উচু জমিতে সেচ প্রদান সম্ভব নয়। তাছাড়া এ অঞ্চলের মাটি বেলে দো-আঁশ হওয়ায় পানির চাপে ক্যানেল ডাইক বাধ ভেঙ্গে ফসলের ক্ষতি ও পানির অপচয় হয়। দেখা দেয় সেচ সঙ্কট। যদি আন্ডার পাস ওয়াটার সাপ্লাই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়, তা হলে উচু নিচু জমিতে সফল ভাবে সেচ দেয়া এবং পানির অপচয় রোধ করা সম্ভব হবে। এছাড়া আন্ডার পাস ওয়াটার সাপ্লাই পদ্ধতি ব্যবহার করা হলে প্রজেক্টের বড়পিট ও ক্যানেলের অব্যবহৃত প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমি আবাদের আওতায় আসবে বলে তিনি জানান।
বেড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী কবিবুর রহমান বলেন, অতীতে পাবনা আইআরডি প্রকল্পে কি হয়েছে, তা আমার জানা নেই। আধুনিক প্রযুক্তি সম্পন্ন এ ইরিগেশন প্রকল্পটি পুরোদমে চালু করার জন্য পরিকল্পিতভাবে পানি সেচ ও নিস্কাশন ক্যানেলসহ অন্যান্য অবকাঠামোর ব্যাপক সংস্কার ও উন্নয়ন করতে হবে। তবেই প্রকল্পের কাঙ্খিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভাব হবে বলে তিনি জানান।




