আব্দুর রহমান, বাকৃবি সংবাদদাতা : ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বহুমুখী উত্পাদন ব্যবস্থার বিকল্প নেই। এ উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের একোয়াকালচার বিভাগের প্রফেসর ড. মাহফুজুল হক মাছ ও সবজির সমন্বিত চাষ পদ্ধতি আবিষ্কার করেছেন।

অনেক এলাকায় পুকুর পাড়ে প্রচুর গাছপালা থাকে এবং পুকুরের পানিতে ছায়া তৈরী করে সূর্যালোক অনুপ্রবেশে বাধা প্রদান করে। এতে করে পুকুরের জলে মাছের উত্পাদন ও পুকুরের পাড়ে সবজি উত্পাদন নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হয়। তবে, পুকুরের জলে যেখানে সূর্যালোক পড়ে সে জায়গায় সবজি উত্পাদনের একটি সম্ভাবনা রয়েছে। এই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে একটি নতুন বিশেষ জল-ভিত্তিক একোয়াকালচার সিস্টেম, IFCAS ইফকাস (Integrated Floating Cage Aquaponics Systems) এর উপর একটি একশন গবেষণা পরিচালনা করছেন ড. রিপন। এখানে গবেষনার মৌলিক ধারনাটি এরকম যে পুকুরস্থিত খাচায় ও পানিতে মাছের জন্য যে খাবার দেয়া হয় তাতে নাইট্রোজেনাস ও অন্যান্য রাসায়নিক পদার্থ তৈরী হয় যা মাছের বৃদ্ধির জন্য ক্ষতিকারক কিন্তু উদ্ভিদের জন্য চমত্কার সার। ইফকাসের পদ্ধতিতে সবজির মাদায় ব্যবহৃত পুকুরের কাদায় যে জৈব সার থাকে তাও উদ্ভিদের জন্য একটি উত্কৃষ্ট সার। মাদায় ব্যবহৃত পুকুরের কাদা একদিকে সবজির চারা রোপনের মিডিয়া হিসেবে এবং অন্যদিকে সারের উত্স সার হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এরকম সমন্বয়ের কারণে এ পদ্ধতিতে পুকুরের পানির পরিবেশ ঠিক রেখে মাছ ও সবজি উত্পাদন একটি টেকসই পদ্ধতি হতে পারে বলেও জানান পদ্ধতিটির উদ্ভাবক।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সহায়তায় কৃষি পুষ্টি এক্সটেনশন প্রজেক্ট (এএনএপি), বাংলাদেশের বরিশাল অঞ্চলে বাস্তবায়িত হচ্ছে সমন্বিত মাছ ও সবজি চাষের এই পদ্ধতিটি। মাছ চাষীদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ প্রদান করে তাদের একাজে উদ্ধুদ্ধ করা হয়। এ পদ্ধতিতে একটি ৯ বর্গমিটার আয়তনের লোহার বার দিয়ে তৈরি ফ্রেমকে ভাসিয়ে রাখার জন্য কাঠামোটির চার কোণে ফ্লোট বসানোর জন্য চারটি খাঁজ রাখা হয়। স্থানীয়ভাবে প্রাপ্ত প্লাস্টিকের কন্টেইনার দিয়ে তৈরী ফ্লোট ইফকাসকে ভাসিয়ে রাখার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। লোহার ফ্রেমের অনুপ্রস্থ বরাবর দুটি ফ্লোটের মাঝে সবজি রোপনের জন্য একটি করে মাদা তৈরী করা হয় যেখানে পুকুরের শুকনো কাদা, গোবর ও অন্যান্য জৈব সার মিশিয়ে দেয়া হয়। মাদাটির নিম্নাংশ পুকরের পানিতে লেগে থাকার কারণে পানি থেকে উদ্ভিদ সার বস্তু সহজে গ্রহন করতে পারে, এতে করে উদ্ভিদের জন্য কোন সেচের প্রয়েজেন হয় না। লোহার কাঠামোর নীচে সমগ্র এলাকা একটি আয়তাকার নেট দিয়ে ঘিরে খাচা বা কেজের অনুরূপ একটি গঠন তৈরী করা হয়। কাঠামোর উপরিতলের গঠন বরাবর সবজি গাছ বেয়ে চলার জন্য বাঁশের ফালি দিয়ে একটি মাচা তৈরী করা হয়।
চাষীদের পছন্দ অনুযায়ী লতানো সবজি, এবং পুকুরের পানি থেকে পুষ্টি শোষণ করতে পারবে এরকম জাতের সবজি মাদায় রোপন করা হয়। জালের খাচার ভেতর মনো-সেক্স তিলাপিয়ার পোনা ১০০/ঘনমিটার হারে মজুদ করে ভাসমান খাদ্য প্রয়োগ করা হয়। ইফকাসের বাইরে, পুকুরের অবশিষ্ট এলাকা সাধারণ কার্প চাষ কৌশল অনুযায়ী রুই-কাতলা চাষের জন্য ব্যবহৃত হয়। গবেষণার প্রথম চক্রের (জুলাই-অক্টোবর, ২০১৩) শুরুতে ৯ টি পরিবারের সঙ্গে গবেষণায় নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত উত্সাহব্যঞ্জক ছিল। চাষীরা সবগুলো ইফকাস পুকুরের সূর্যালোক এক্সপোজার এলাকায় স্থাপন করেছিল। প্রায় সকলেই মাচার উচ্চতা মূল নকশা থেকে অনেকটা উঁচু করেছিল যাতে করে লম্বা সবজি যেমন চিচিঙ্গা বা লাউ মুক্তভাবে বাড়তে পারে।
এ পদ্ধতি ব্যবহার করে উত্পাদন সমুন্নত রাখতে গভীর ছায়াময় পুকুরের পানিতে গাছের পাতা ও অন্যান্য জৈব অংশ নিয়মিত পরিস্কার করা, পুকুরের পানিতে হররা টানা এবং তলদেশের কাদাও নিয়মিত পরিস্কার করতে হবে। ইতিমধ্যেই কয়েকটি সরকারি ও বেসরকারি সংস্থা এ প্রযুক্তিটি সম্প্রসারণের জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছে। আর্থিক খরচ-লাভ বিশ্লেষন সাপেক্ষে এই সমন্বিত মাছ ও সবজি চাষের এই পদ্ধতিটি শুধুমাত্র ছায়াময় পুকুরের জন্যই নয় বরং এটি বহুমালিকানা পুকুর, বিল, খাল, নদী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারনে সৃষ্ট জলাবদ্ধ এলাকা, ইত্যাদিতে ব্যবহার করে লাভবান হতে পারবেন বলেও তিনি জানান।




