মো: খালিদ হাসান, নড়াইল :, ইতিহাস ঐতিহ্যের আঁধার ‘কালিয়া উপজেলা’। অবহেলিত নড়াইল জেলার ৩ টি উপজেলার মধ্যে অন্যতম। আয়তন ৩১৭.৬৪ বর্গ কিলোমিটার, ১ টি পৌরসভা ও ১৪ টি ইউনিয়ন নিয়ে উপজেলাটি গঠিত । মোট জনসংখ্যা-২,২০,২০২ জন, পুরুষ- ১,০৯,০৭০ জন এবং মহিলা- ১,১১,১৩২ জন (২০১১ সালের শুমারি অনুযায়ী)। এখানেই জন্মেছিলেন বিশ্বের অসংখ্য ক্ষনজন্মা মহাপুরুষ। কালের গর্ভে হারাতে বসেছে এই শহরের অতীত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য। কালিয়া নামটির উৎস সম্পর্কে সঠিক তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে অনুমান করা হয়ে থাকে, কালীগঙ্গা নদীর ভরাট জমিতে যে জনপদ গড়ে উঠেছে সেটাই কালিয়া নামে পরিচিতি পেয়েছে।

বিশ্ববরেণ্য নৃত্যশিল্পী উদয় শংকর ও সহদর বিশ্বখ্যাত সেতার বাদক রবি শংকরের স্মৃতি বিজড়িত কালিয়াতে জন্মেছিলেন খ্যাতনামা লোককবি প্রফুল্লরঞ্জন বিশ্বাস। যার আঞ্চলিক ভাষার গান এখনো মানুষকে মুগ্ধ করে। প্রায় হাজার খানেক গান তিনি রচনা করেছিলেন। তার জনপ্রিয় গানের মধ্যে যে গানটি এখনো লোকমুখে শোনা যায়, “আইড়ে গরু বাঘের মুখতো দ্যাখো নাই, পাল গুতোয়ে বাছুর মাইরে করিছ বলের বড়াই”। এই কালিয়াতেই আছে এশিয়া মহাদেশের সর্ববৃহৎ পিতলের রথ, যার ওজন প্রায় ৪ টন। শতবছর পূর্বে ‘‘ভামিনী রঞ্জন সেন’’ এই রথটি নির্মান করেছিলেন। এ রথটি শহীদ আঃ সালাম ডিগ্রী মহাবিদ্যালয়ের প্রভাষক কোয়ার্টার সংলগ্ন মন্দিরে রক্ষিত আছে। অযত্নে আর অবহেলায় যদিও রথটির সৌন্দর্য অনেকটা বিলীন হতে বসেছে, তবুও এখন পর্যন্ত এটা দেখলে তখনকার শিল্পীশৈলী ও নিপূণতা আঁচ করা যায়। ৭১ এর বুদ্ধিজীবি শহীদ আব্দুস সালাম এর জন্ম এখানেই। ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্রের মহানায়িকা সুচিত্রা সেনের মামাবাড়ি কালিয়ার বেন্দা গ্রামে। ভারতীয় জনপ্রিয় নায়িকা কোয়েল মল্লিকের বাবা খ্যাতনামা অভিনেতা রন্জিৎ মল্লিকের বাবার বাড়ি কালিয়া উপজেলার ইলিয়াসাবাদ ইউনিয়নের বিলদুড়িয়া গ্রামে। কালিয়ার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অসংখ্য মহামানবের স্মৃতি বিজড়িত এই কালিয়া যেন মহামানবদের মতই দেশ থেকে দেশান্তরে স্ব-মহিমায় উজ্জ্বল।

কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্যি, স্বনামধন্য এই কালিয়া তার ইতিহাস ঐতিহ্যকে হারাতে বসেছে। রাজনৈতিক প্রতিহিংসাপরায়ণতা আর ক্ষমতার এককেন্দ্রীক প্রভাবে ন্যায়-অন্যায়ে আর অন্যায়-ন্যায়ে পরিণত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। শিক্ষা সংস্কৃতির চর্চা থেকে দূরে সরে গিয়ে মাদকের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাঁসাচ্ছে অসংখ্য তরুণ ও যুবক। দুর্নীতির করাল গ্রাসে হারাতে বসেছে শিক্ষা ব্যবস্থার মেরুদন্ড বিদ্যাপীঠগুলো। নৈতিকতা থেকে দূরে সরে গিয়ে জাতির গুরু শিক্ষকেরাই দূর্নীতিবাজ ও মাদকসেবীতে রুপান্তরিত হয়েছে। স্কুলের অফিসরুমের ভিতরে হরহামেসা ছাত্র-ছাত্রীদের সামনে সিগারেট ফুঁকতে দেখা যায় খোঁদ প্রধানশিক্ষকসহ অন্যান্য শিক্ষকদের। এই শিক্ষাগুরুর কাছ থেকে ছাত্র-ছাত্রী নৈতিকতার কি শিক্ষা পেতে পারে? ঘুষ দূর্নীতিতে ভরপুর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। স্কুলে শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার বাছবিচার না করে ঘুষ গ্রহণ করে বা দূর্নীতির মাধ্যমে নিয়োগ দেয়া হচ্ছে অযোগ্য ব্যক্তিদের। এসকল অযোগ্য ও অথর্ব শিক্ষকদের কাছ থেকে কেমন প্রজন্ম আমরা আশা করতে পারি তা সকলেরই জানা। পার্শ্ববর্তী উপজেলা লোহাগড়ার দিকে তাকালে দেখা যায় সম্পূর্ন উল্টো। প্রতি বছর পাশের হার সেখানে অনেক বেশী, এসএসসি-এইচএসসিতে এ+ গ্রেডে উন্নিতের হার কালিয়ার তুলনায় কয়েকগুণ বেশী। উচ্চশিক্ষার জন্যে ও ভাল ফলাফলের আশায় কালিয়ার অনেক ছাত্র ছাত্রী লোহাগড়ায় পাড়ি জমায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত কালিয়ার হর্তা কর্তাদের এবিষয়ে তেমন কোন খেয়াল নেই।

মানুষের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হওয়া উচিৎ বই। জ্ঞানকে বিকশিত করার জন্য যেখানে বই পড়া হয় সেটা লাইব্রেরী। সাধারণের বই পড়ার জন্য দরকার মোড়ে মোড়ে পাবলিক লাইব্রেরী। কালিয়াতে মোড়ে মোড়ে পাবলিক লাইব্রেরী না থাকলেও কালিয়ার প্রাণকেন্দ্রে পাইলট স্কুলের পাশে সর্বসাধারণের জন্য একটি লাইব্রেরী রয়েছে । জানা যায়, সেখানে অসংখ্য বই আছে নানা ভাষার এবং নানা রকমের। কিন্তু স্কুল কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও সাধারণ মানুষ এখনও জানে না এই লাইব্রেরীর কথা, এছাড়া সেখানে তাদের প্রবেশাধীকার আছে কিনা তাও তাদের জানা নেই । দ্বিতল ভবনের উপর তলায় লাইব্রেরী আর নীচতলার অফিসার্স ক্লাবে বসে প্রতিদিন বিকাল থেকে সরকারী কর্মকর্তাদের বিরামহীন তাসের আড্ডা। মাঝে মাঝে জুয়ার আড্ডাও বসে! এই আড্ডা চলে রাত অবধি। তাই লাইব্রেরীটা যে সাধারণের জন্য উন্মুক্ত তা সকলেরই অজানা। জনসাধারণকে লাইব্রেরীতে আসতে ও বই পড়তে উদ্বুদ্ধকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোন পদক্ষেপ নেই। কিছুদিন আগে লাইব্রেরীয়ানের সাথে কথা বললে তিনি পাঠকের অভাবজনিত কারন দেখান। পাঠক আনতে যথাযথ কর্তৃপক্ষের পদক্ষেপের কথা জানতে চাইলে কোন সদুত্তর মেলেনি।
দূর্নীতির আরেক সেক্টর কালিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদ। যেসব ক্ষণজন্মা মহাপুরুষদের ত্যাগ আর সাহসীকতার ফল আজকের এই লাল সবুজের পতাকাখচিত ভূখন্ড সেই মহাপুরুষরাই আজ অবহেলিত । অনেকে রোগে জর্জরিত , অর্ধাহারে অনাহারে জীবন যাপন করছেন। এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের অনেককে ভ্যান চালিয়ে ও ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতে দেখা যায়। সরকার কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানীর ব্যবস্থা করা হলেও অর্থনৈতিকভাবে দূর্বল এসকল মুক্তিযোদ্ধা ঘুষের টাকা যোগাড় করতে না পেরে সম্মানীভাতা পাশ করাতে পারছেন না। টাকার জোরে অনেক অমুক্তিযোদ্ধা আবার মুক্তিযোদ্ধা বণে গিয়ে ভোগ করছেন সকল রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা। মাসিক সম্মানীভাতা পাশ করাতে প্রায় ২০,০০০/- (বিশ হাজার টাকা) ঘুষ দিয়ে দীর্ঘদিন ঘুরতে হয় কর্তাব্যক্তিদের পিছু পিছু, এমন অভিযোগ করেছেন অনেক মুক্তিযোদ্ধা। আবার অনেক প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা আজও মুক্তিযোদ্ধা হিসাবে স্বীকৃতির জন্য সংগ্রাম করছেন। এবিষয়ে ঊর্ধ্বতন মহলের কোন পদক্ষেপ আজ পর্যন্ত দেখা যায়নি।

কালিয়া পিছিয়ে থাকার আরেকটি অন্যতম প্রধান কারণ যোগাযোগ ব্যবস্থার বেহাল দশা। কালিয়া একটি দ্বীপের মত চারপাশ নদী দ্বারা বেষ্টিত শহর। নবগঙ্গা নদীতে কোন ব্রিজ না থাকায় নিজস্ব জেলা নড়াইলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করা খুবই দুরুহ। কালিয়া নৌকাঘাটে নবগঙ্গার উপর একটি ব্রিজ কালিয়ার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি । একেরপর এক পরীক্ষা নিরীক্ষা হলেও যথাযথ কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে তা বাস্তবায়িত হচ্ছে না। রাস্তাঘাটে সরকারী যে বরাদ্দ থাকে তার সিকিভাগও ঠিকাদাররা নির্মান কাজে ব্যয় করেন না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে গোঁপনে রফা করে প্রতিনিয়ত চলছে এসব নির্মান কাজ। ফলে অল্প দিনের মধ্যেই রাস্তাঘাট ভেঙ্গে দুর্ভোগ পোহাচ্ছে সাধারণ মানুষ।
প্রতিটি অফিস আদালতে চলছে প্রকাশ্যে ঘুষ বানিজ্য। সেটেলমেন্ট, সাব-রেজিষ্টার, ভূমি অফিস, শিক্ষা অফিস (প্রাইমারী ও মাধ্যমিক), মৎস, যুব উন্নয়ন ইত্যাদি অফিসগুলো যেন দূর্নীতির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সেটেলমেন্ট অফিসের দূর্নীতি বিশেষভাবে মানুষকে ভাবিয়ে তুলছে। টাকা ছাড়া কোথাও সাধারণ মানুষের সেবা পাওয়ার সুযোগ নেই।
কালিয়া গড়ার রুপকার মরহুম এখলাস উদ্দিনের স¦প্নের কালিয়া বাস্তবে এখনো রুপান্তরিত হয়নি। তার পুত্র জনপ্রিয় নেতা এমপি কবিরুল হক (মুক্তি) সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে হাত দিলেও পারিপার্শি¦কতার কারণে সেটা সম্ভব হয়ে উঠছে না। এখলাস উদ্দিনের স্বপ্ন আজও যেন স্বপ্নই রয়ে গেছে। প্রতিটি সেক্টরে নৈতিকতা সম্পন্ন মানুষের পদচারনা প্রয়োজন। সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট মহলের দূর্নীতিমুক্ত হয়ে সততা ও নৈতিকতা সম্পন্ন পদক্ষেপ নিতে হবে। তবেই কালিয়ার অতীত গৌরবকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাই এই মুহূর্তেই কালিয়ার সর্বস্তরের মানুষকে ঘুরে দাড়াতে হবে। কালোকে কালো, সাদাকে সাদা, ভালকে ভাল, মন্দকে মন্দ বলতে শিখতে হবে। দূর্নীতিকে না বলতে হবে। প্রতিটি নাগরিককে যার যার অবস্থান থেকে যতটুকু পারা যায় সৎ হতে হবে। তা নাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে যাবে।




