শেরপুরের ঝিনাইগাতীতে ধান ব্যবসায়ী বিল্লাল হোসেন (৪০) হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর এক নারীর সঙ্গে কথিত পরকীয়ার জের ধরে পরিকল্পিতভাবে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে। তবে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না বলে জানিয়েছে পুলিশ। নিহত বিল্লাল হোসেন উপজেলার নলকুড়া ইউনিয়নের জারুলতলা গ্রামের মরহুম জুলহাস উদ্দিনের ছেলে। তিনি ধান ব্যবসার পাশাপাশি সুদের ব্যবসাও করতেন।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, পূর্ব গজারিকুড়া গ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবারের সদস্য সুরমা ম্রংয়ের সঙ্গে বিল্লালের ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়। সুরমার স্বামী নিপিন মানখিন কর্মসূত্রে গাজীপুরে থাকেন। তাদের ছেলে জুলিয়াস ম্রংও স্ত্রীকে নিয়ে ঢাকায় বসবাস করেন। ওই সুযোগে বিল্লালের ওই বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত ছিল বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
স্থানীয়দের দাবি, একপর্যায়ে বিল্লাল ও সুরমার মধ্যে অনৈতিক সম্পর্কের বিষয়টি জানাজানি হলে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাদের সতর্ক করেন। কিন্তু এরপরও তাদের যোগাযোগ অব্যাহত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে।
পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, সম্প্রতি সুরমার ছেলে জুলিয়াস ম্রং বাড়িতে আসার পর বিল্লাল ও সুরমার কথিত সম্পর্কের বিষয়টি তার নজরে আসে। এর জের ধরেই বিল্লালকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়ে থাকতে পারে।

জানা গেছে, গত ৪ আগস্ট রাত ১০টার দিকে খাবার খাওয়ার পর চা পান করার কথা বলে বাড়ি থেকে বের হন বিল্লাল। এরপর তিনি আর বাড়ি ফেরেননি। স্বজনরা বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান না পেয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন। পরে ১২ আগস্ট বিকেলে জারুলতলা এলাকার রঞ্জনা ঝর্ণার পাশে একটি বাঁশঝাড়ের নিচে মাটিচাপা অবস্থায় বিল্লালের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের মুখ ও চোখে আঘাতের চিহ্ন ছিল বলে জানা গেছে। এছাড়া শরীরের একটি অঙ্গ কেটে ফেলার অভিযোগও উঠেছে। পুলিশ সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ শেরপুর জেলা সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠায়। ময়নাতদন্ত শেষে ১৩ আগস্ট বিকেলে পারিবারিক কবরস্থানে বিল্লাল হোসেনের মরদেহ দাফন করা হয়।
এদিকে মরদেহ উদ্ধারের পর পুলিশ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারী-পুরুষসহ ১৯ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেয়। ১৩ আগস্ট বিল্লালের ছোট ভাই আনোয়ার হোসেন বাদী হয়ে সুরমা ম্রংসহ আটজনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাত কয়েকজনকে আসামি করে ঝিনাইগাতী থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। পরে এক নারীসহ পাঁচজনকে আদালতে সোপর্দ করা হয়।
অন্যদিকে মরদেহ উদ্ধারের পর ক্ষুব্ধ লোকজন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কয়েকটি বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য দিলু ম্রং জানান, কয়েকটি বাড়ি থেকে গরু-ছাগল, টাকা-পয়সাসহ বিভিন্ন মালামাল নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। হামলার সময় কয়েকজন পুরুষকে মারধরও করা হয়। পরে পুলিশ তাদের উদ্ধার করে হেফাজতে নেয় এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি, হত্যাকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের অবশ্যই আইনের আওতায় এনে শাস্তি দিতে হবে। তবে হত্যার সঙ্গে জড়িত না থাকা সত্ত্বেও তাদের বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাট চালানো হয়েছে। তারা এসব ঘটনারও বিচার দাবি করেছেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পূর্ব গজারিকুড়া এলাকার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বসতিতে পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। এদিকে পরিস্থিতি শান্ত রাখতে জাতীয়তাবাদী ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী দলের নেতারাও ঘটনাস্থলে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে।
ঝিনাইগাতী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম নূর মোহাম্মদ বলেন, প্রাথমিক তদন্তে পরকীয়ার জের ধরে সুরমা ম্রংয়ের স্বজনেরা বিল্লাল হোসেনকে হত্যা করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তদন্ত শেষ হলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে। তবে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বাড়িঘরে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের অভিযোগ অস্বীকার করে ওসি বলেন, এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে।




