গাজায় যুদ্ধ, অবরোধ ও ক্ষুধার মধ্যে এবারও ঈদুল আজহা পালন করতে যাচ্ছে ফিলিস্তিনিরা। এই ভূখণ্ডের বহু পরিবারের জীবন থেকে টানা তৃতীয় বছরের মতো উৎসবের আনন্দ হারিয়ে গেছে। নেই কোরবানির পশু, নেই নতুন পোশাক কিংবা হজে যাওয়ার সুযোগ। তারপরও ধ্বংসস্তূপের মধ্যে মানুষ আঁকড়ে ধরে আছে সামান্য আশার আলো। গাজার একটি তাঁবুতে বসে ৬৮ বছর বয়সী ইতিদাল হামদান স্মরণ করছিলেন তাঁর দীর্ঘদিনের স্বপ্নের কথা। স্বামীকে নিয়ে হজে যাওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁর। বহু বছর ধরে সেই স্বপ্ন দেখেছেন। ২০২৪ সালের হজযাত্রী তালিকায় তাঁদের নামও উঠেছিল। কিন্তু যুদ্ধ সবকিছু বদলে দেয়। গত বছর ইসরায়েলি হামলায় তাঁর ৬৭ বছর বয়সী স্বামী নিহত হন। ফলে এবারও হজে যাওয়ার সুযোগ হলো না তাঁর।

কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরাকে ইতিদাল বলেন, ‘দশ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমি এই স্বপ্ন দেখেছি। আমার স্বামী খুব হজে যেতে চাইতেন। কিন্তু সেই ইচ্ছা পূরণের আগেই তিনি নিহত হন।’
২০২৩ সালের অক্টোবরে শুরু হওয়া যুদ্ধের পর থেকেই গাজার সীমান্তে কড়াকড়ি আরোপ করেছে ইসরায়েল। ফলে টানা তৃতীয় বছরের মতো গাজা থেকে কেউ হজে যেতে পারছেন না। একই সঙ্গে বহু পরিবার এখনো নিজেদের বাড়িতে ফিরতে পারেনি। যারা ফিরতে পেরেছেন, তাঁদের অনেকের বাড়িই এখন ধ্বংসস্তূপ।

শুধু স্বামী নন, ইতিদাল হামদানের জীবনে ক্ষতির তালিকাটা অনেক দীর্ঘ। যুদ্ধে তাঁর দুই ছেলে ও ছয় নাতি-নাতনিও নিহত হয়েছেন। তবু তিনি আশা ছাড়েননি। একদিন হয়তো কাবা শরিফে যেতে পারবেন—এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি বেঁচে আছেন।
ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ কোরবানি। কিন্তু এবার গাজার অধিকাংশ মানুষের জন্য সেটিও প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছে। উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া থেকে বাস্তুচ্যুত পাঁচ সন্তানের বাবা ইমাদ সুহওয়েইল বলেন, ‘আগে প্রতি বছর আমরা কোরবানি দিতাম, একসঙ্গে খেতাম, গরিবদের মধ্যে মাংস বিতরণ করতাম। সেই দিনগুলো খুব সুন্দর ছিল।’ ইমাদ জানান, যুদ্ধের আগে যে ভেড়ার দাম ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ জর্ডানিয়ান দিনার, এখন সেটির দাম দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ হাজার শেকেল (প্রায় ৭ লাখ টাকা)। অথচ পশুগুলোও খুব দুর্বল। সাধারণ মানুষের পক্ষে এমন দাম দিয়ে পশু কেনা সম্ভব নয়।
গাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধ শুরুর পর ৯০ শতাংশের বেশি পশুখামার ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সঙ্গে জীবিত পশু প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা থাকায় সংকট আরও বেড়েছে। শুধু কোরবানি নয়, ঈদের অন্যান্য আনন্দও ম্লান হয়ে গেছে। ইমাদ সুহওয়েইল বলেন, ‘এখন সন্তানদের নতুন পোশাকও কিনে দিতে পারি না। নারী, শিশু, তরুণ সবাই ত্রাণের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। মনে হয় আমরা যেন আলাদা এক সম্প্রদায় হয়ে গেছি, যাদের ঈদের কোনো রীতি নেই।’
গাজার ৬৩ বছর বয়সী ফাওজি হামদানও একই হতাশার কথা জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা অবরুদ্ধ। বাইরে যেতে পারি না, হজ করতে পারি না, চিকিৎসাও নিতে পারি না। কিছুই স্বাভাবিকভাবে করা সম্ভব নয়।’
অন্যদিকে, ঘর-বাড়ি হারানো ৫৬ বছর বয়সী ইনতিসার আওদা স্মরণ করেন পুরোনো দিনের ঈদের কথা। তিনি বলেন, ‘আগে ঘরভর্তি অতিথি থাকত, রান্না হতো নানা খাবার, শিশুরা আনন্দ করত। এখন শুধু কষ্ট আর অপেক্ষা।’ তবে যুদ্ধের মধ্যেও ইনতিসার আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘আমরা অসহনীয় কষ্টে আছি, তবু আশা ছাড়িনি। আমি চাই, আগামী ঈদ যেন যুদ্ধ ছাড়া আসে।’




