শেরপুরের সীমান্তবর্তী গারো পাহাড়ে বেদখলীয় বনের জমি উদ্ধারের অভাবে জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। এককালে শেরপুরের গারো পাহাড়ে ছিল শাল গজারীসহ দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির বৃক্ষে ভরপুর। সেসময় গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে বিভিন্ন জাতের পশুপাখি ও বন্যপ্রাণী দেখা যেত। কিন্তুু কালের পরিক্রমায় দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ দিনে দিনে উজাড় ও বনের জমি বেদখল হওয়ায় বন্যপ্রাণীও এখন দেখা মেলে না।

জানা গেছে, ১৯৯১ সালে গারো পাহাড়ের পরিবেশবান্ধব বৃক্ষ নিধন করে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সামাজিক বন (উডলড) বাগান সৃজন করা হয়। যেসব গাছে কোন পশুপাখি পর্যন্ত ও বসে না। অভিযোগ রয়েছে, সামাজিক বনের অংশিদারদের এ কারণে বনের জমি দখল প্রক্রিয়া বৃদ্ধি পায়। যুগযুগ ধরে শতশত একর বনের জমি বেদখল অবস্থায় রয়েছে। বনের এসব বেদখলীয় জমি উদ্ধারের কোন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে না বন বিভাগের পক্ষ থেকে। এ অভিযোগ পরিবেশবিদদের। ফলে একদিকে যেমন বনের জমি দিনে দিনে সংকুচিত হচ্ছে, অপরদিকে সরকার প্রতিবছর বিপুল পরিমাণের রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি গারো পাহাড়ের জীববৈচিত্র্য হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়েছে।
জানা গেছে, ১৯৪৭ সালে দেশে জমিদারি প্রথা প্রচলিত থাকাকালে জমিদাররা শেরপুর জেলার ৩ টি উপজেলার সীমান্তে ৪০ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ২১ হাজার একর বনের জমি বনসহ বনবিভাগের কাছে হস্তান্তর করে। গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে তখন শালগজারীসহ বিভিন্ন প্রজাতির দেশীয় বৃক্ষে ছিলো ভরপুর। এসব বৃক্ষের ফলফলাদি খেতে গারো পাহাড়ে বিভিন্ন জাতের পশুপাখি ও বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য ছিলো। স্থানীয়দের মতে, পশুপাখির কোলাহলে গারো পাহাড় প্রায় সময় থাকতো মুখরিত। কিন্তু পশুপাখির খাদ্য উৎপাদনকারী দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ উজাড় ও বনের জমি বেদখল হওয়ায় গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্যের বিলুপ্তি ঘটেছে। জানা গেছে, জবরদখলকারিরা দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে এসে বনের জমি দখল করে ঘর-বাড়ি নির্মাণ করে বসবাস করে আসছে। শতশত একর বনের জমিতে গড়ে তোলা হয়েছে জনবস্তি। বনের জমিতে বসবাসকারীদের পরিবারের সদস্য সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তারা বনের জমিতে বস্তি স্থাপনের পরিধিও দিনদিন বাড়াচ্ছেন। শতশত একর বনের জমিতে এখন পুরোদমে চাষাবাদ হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, সে সময় থেকে স্থানীয় একশ্রেণির অসাধু বন কর্মচারীদের যোগসাজশে এসব জমি বেদখল হয়। বর্তমানেও শেরপুরের গারো পাহাড়ের বনের জমি বেদখল থেমে নেই। সন্ধ্যাকুড়া, গোমড়া, হলদীগ্রাম, গজারীকুড়া, গিলাগাছা, ভালুকা, গান্ধিগাঁও, বাকাকুড়াসহ বিভিন্ন এলাকার বনের জমি দখল করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রভাবশালীরা নানা কৌশলে বনের জমি দখল করে নিচ্ছে। অথচ এসব জমির খাজনা পরিশোধ করতে হচ্ছে বন বিভাগের। বনের জমি বেদখল হওয়ায় গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য ও হারাচ্ছে।

সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সীমান্তের ৪০ কিলোমিটার এলাকায় বনের জমি দখল করে বলখেলার মাঠ, রাবার বাগান, বিনোদন কেন্দ্র, দোকানপাট, হাট-বাজার পর্যন্ত গড়ে তোলা হয়েছে। বনবিভাগের একটি সূত্র জানায়, বনের ২১ হাজার একর জমির মধ্যে প্রায় ১ হাজার একর জমিই এখন জবরদখলদারদের হাতে। তবে বেসরকারিমতে এর পরিমাণ আরও বেশি হবে। বন বিভাগের পক্ষ থেকে বনের এসব জমি উদ্ধারের বিষয়ে প্রতিবছর শুধু তালিকা তৈরি করে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে প্রেরণ করা হচ্ছে। কিন্তু বনের জমি উদ্ধার হচ্ছে না। অভিযোগ রয়েছে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও রাজনৈতিক দলের নেতাদের সদিচ্ছার অভাবে বেদখলীয় জমি উদ্ধারের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে না। বন বিভাগের দেয়া তথ্যমতে, এসব বনের জমি উদ্ধারের ব্যাপারে বনবিভাগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময় জবরদখলদারদের বিরুদ্ধে মামলাও দেয়া হয়েছে। কিন্তু বনের জমি উদ্ধার হয়নি। তবে বনবিভাগের পক্ষ থেকে লোকবলের অভাবে বনের বেদখলীয় জমি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। এতে সংকুচিত হয়ে পরেছে বন্যহাতির আবাসস্থল।
১৯৯৬ সাল থেকে গারো পাহাড়ের বনাঞ্চলে শুরু হয়েছে বন্য হাতির আনাগোনা। গারো পাহাড়ে বন্য হাতি ব্যতীত অন্য কোন পশুপাখি এখন আর চোখে পড়ে না। বনের জমি বেদখল হওয়ায় আবাসস্থল ও খাদ্য সংকটে পড়েছে হাতির দল। এতে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব এখন প্রকট আকার ধারণ করেছে। প্রতিনিয়ত বন্যহাতির তান্ডবে গারো পাহাড়ে বসবাসকারী হাজার হাজার মানুষ রয়েছে চরম বিপাকে। বর্তমানেও গারো পাহাড়ের সীমান্ত ঘেঁষে অবস্থিত পাহাড়ি গ্রামগুলোতে থেমে নেই বন্যহাতির তান্ডব। উপুর্যপরি বন্যতাতির তান্ডবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে বন এলাকায় বসবাসকারি হাজার হাজার মানুষ। জবরদখলদাররা হাতির কবল থেকে ঘর-বাড়ি ও ফসল রক্ষার তাগিদে বাড়ি ও ফসলের মাঠের চারপাশে বৈদ্যুতিক ফাঁদ পাতা হচ্ছে। এতে ফাঁদে পড়ে মারা যাচ্ছে হাতি। আবার সনাতন পদ্ধতিতে মশাল জ্বালিয়ে ঘর-বাড়ি ও ক্ষেতের ফসল রক্ষা করতে গিয়ে হাতির পায়ে পিষ্ট হয়ে মারা পড়ছে মানুষও। পরিবেশবিদদের মতে, এসব বনের জমি দখলমুক্ত করে দেশি প্রজাতির বৃক্ষ রোপণ করা হলে বন্য হাতির খাদ্য ভান্ডার গড়ে উঠার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্য নিশ্চিত হবে। এতে গারো পাহাড়ের সৌন্দর্য বৃদ্ধির পাশাপাশি সরকারের ঘরে আসবে বিপুল পরিমাণের রাজস্ব।
ময়মনসিংহ বন বিভাগের রাংটিয়া রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম বলেন, গত বছর ৫০ একর জমি উদ্ধার করা হয়েছে। বালিজুরি রেঞ্জ কর্মকর্তা মো, সুমন মিয়া বলেন, গত এক বছরে বনের প্রায় ১ একর বেদখলীয় জমি উদ্ধার করে দেশীয় প্রজারির বৃক্ষ সৃজন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, বেদখলীয় পুরো জমি উদ্ধার করে দেশীয় প্রজাতির বৃক্ষ সৃজন করা হলে মানুষ-হাতির দ্বন্দ্ব কমিয়ে আনা সম্ভব।
এ ব্যাপারে ময়মনসিংহ বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিমের সাখে কথা হলে তিনি বলেন, বনের বেদখলীয় জমি উদ্ধারের বিষয়ে শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।




