১১৬ তম জন্মবার্ষিকীতে শ্রদ্ধাঞ্জলি
বিপ্লব-সংগ্রামের সমার্থক রবি নিয়োগী। শত নির্যাতন-নিপীড়ন, কারাভোগ করেও মানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রামে তিনি ছিলেন সর্বদা লড়াকু সৈনিক। অগ্নিযুগের সিংহপুরুষ বিপ্লবী রবি নিয়োগী। তিনি ছিলেন আদর্শনিষ্ঠ, সৎ, নির্লোভ, নির্ভীক, দেশপ্রেমিক। আজীবন তিনি নিষ্ঠ ছিলেন মানুষের কল্যাণ চিন্তায়। বাংলা পঞ্জিকার বর্ষগণনা হিসাব মতে ১৬ বৈশাখ (মোতাবেক ৩০ এপ্রিল) বিপ্লবী রবি নিয়োগীর ১১৬তম জন্মবার্ষিকী। আজ এইক্ষণে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি এই মহান বিপ্লবীকে। তিনি আজ আমাদের মাঝে না থাকলেও বেঁচে আছেন তার কর্মে ও আদর্শে।
শেরপুর জেলা শহরের গৃর্দানারায়ণপুর এলাকার পুরাতন গরুহাটিতে ১৯১০ সালে জন্মগ্রহণ করেন বিপ্লবী রবি নিয়োগী। তার পুরো নাম রবীন্দ্র চন্দ্র নিয়োগী। তিনি রবি নিয়োগী নামেই সমধিক পরিচিত। তার পিতা রমেশ চন্দ্র নিয়োগী ও মাতা সুরবালা নিয়োগী কংগ্রেস রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জমিদার পরিবারের জন্ম হলেও বিপ্লবী রবি নিয়োগী ছিলেন সাধারন মানুষের কাতারে। তিনি বিপ্লববাদী ছিলেন। বিভিন্ন মেয়াদে ৩৪টি বছর কারাভোগ করেছেন। প্রথম তিনি গুপ্ত সমিতি যুগান্তরে দীক্ষা নিয়ে বিপ্লববাদী ধারায় সক্রিয় হয়েছিলেন। পরে আরো কয়েক বিপ্লববাদীকে নিয়ে যুগান্তরের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে ব্রিটিশ-ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হয়ে উদ্যোগী হন। সেই ধারায় পাকিস্তানকালে এবং বাংলাদেশের কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেছেন।

বিপ্লবী রবি নিয়োগী ১৯২৬ সালে শেরপুর জি.কে পাইলট হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করে ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজে ইন্টারমিডিয়েট ভর্তি হন। এখানেই মাত্র ১৬ বছর বয়সে স্বাধীনতা আন্দোলনে দীক্ষা নিয়ে যোগ দেন ‘যুগান্তর’ গোষ্ঠীতে। ১৯২৭ সালে আনন্দ মোহন কলেজ থেকে বহিস্কার হয়ে কলকাতায় বিদ্যাসাগর কলেজে ভর্তি হন। কলকাতায় অবস্থানকালে তৎকালীন রাজনীতির মূলধারায় সম্পৃক্ত হন এবং যুগান্তর দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সান্নিধ্যে আসেন। মাত্র ১৯ বছর বয়সে কলকাতায় পড়াশোনার পাঠ চুকিয়ে নিজ ভূমি শেরপুর এসে ১৯২৯ সালে আইন অমান্য আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। ১৯৩০ সালে কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন সত্যাগ্রহ আন্দোলনে ভূমিকা রাখায় প্রথম বারের মতো কারাবরণ করেন। ওই আন্দোলনের সময় রবি নিয়োাগীসহ ১৭ জন রাজনৈতিক কর্মী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। মাস্টার’দা সূর্যসেনের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠনের অব্যবহিত পরে মমনসিংহে যুগান্তর দলের যে কয়জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয় রবি নিয়োগী ছিলেন তাদের একজন।
যুগান্তর পার্টির অর্থ সংগ্রহ সংক্রান্ত ঝিনাইগাতীর সালদার জমিদার বাড়ীর মামলায় ১৯৩১ সালে অভিযুক্ত হয়ে সাত বছর কারাদন্ড হলে রাজশাহী জেলে আটক থাকেন বিপ্লবী রবি নিয়োগী। এখানে অবস্থানকালে তার সহকর্মীরা জেল সুপারকে হত্যার চেষ্টা করলে রবি নিয়োগীকে বিপজ্জনক বন্দি হিসেবে ‘আন্দামান সেলুলার’ জেলে পাঠানো হয়। সেখানে তিনি সাড়ে পাঁচ বছর বন্দীজীবন যাপন করেন। ১৯৩২ সালে আন্দামান জেলে অবস্থানরত ৩২ বিপ্লবী কারাবন্দি মিলে ‘কমিউনিষ্ট কনসালডেশন কমিটি’ গঠন করেন। ওই সময় রবি নিয়োগীর নামের পাশে অতি গুরুত্বপূর্ণ ও বিপজ্জনক কয়েদি হিসেবে ‘ডাবল স্টার মার্ক’ দেওয়া হয়, যা তাকে জীবনের শেষ পর্যন্ত তাড়িত করেছে। জেলখানার ভেতর কমিউনিষ্ট পার্টির প্রথম শাখা খোলায় ১৯৩৬ মালে তাকে ককাতার আলিপুর সেন্ট্রাল জেলে আনা হয়। সেখানে থেকে ময়মনসিংহ জেলে স্থানান্তর করে তাকে মুক্তি দেওয়ার পরদিনই ফের গ্রেপ্তার করায় দেড় বছরের সাজা খাটার জন্য দিনাজপুর ঘোড়াঘাট জেলে বন্দি থাকতে হয়। ১৯৩৭ সালে গঠিত অবিভক্ত বাংলার প্রথম সংসদীয় সরকারের আমলে মুক্তি পেয়ে বিপ্লবী রবি নিয়োগী ময়মনসিংহে ফিরে এসে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।

রবি নিয়োাগী গত শতাব্দির চল্লিশের দশকে বৃহত্তর ময়মনসিংহে কৃষক আন্দোলন ও কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। তিনি ১৯৪৩ সালে নালিতাবাড়ীতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলনের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন। ১৯৪৫ সালের ৫-৯ এপ্রিল ময়মনসিংহ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির উদ্যোগে নেত্রকোণায় যে সর্বভারতীয় কৃষক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় রবি নিয়োাগী ছিলেন তারও অন্যতম প্রধান উদ্যোক্তা। ১৯৪৬ সালে তেভাগা আন্দোলনে শেরপুরের নালিতাবাড়ী অঞ্চলে নেতৃত্ব দেন বিপ্লবী রবি নিয়োগী। ১৯৪৮ সালে ঐতিহাসিক টঙ্ক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত হন। তার নেতৃত্ব শেরপুর, শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী, ফুলপুর, হালুয়াঘাট, কমলাকান্দা এবং সুসং অঞ্চলে টঙ্ক আন্দোলন ব্যাপকভাবে গড়ে উঠেছিল। এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত মিথ্যা মামলায় ময়মনসিংহ কারাগারে বন্দি জীবন কাটান। এ সময় তার সহধর্মিণী জ্যোৎস্না নিয়োগীও ময়মনসিংহ ও ঢাকা জেলে কারারুদ্ধ ছিলেন।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময় বিপ্লবী রবি নিয়োগী বন্দি ছিলেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সময় তিনি সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করা ও নির্বাচনে ভূমিকা রাখায় তিন মাস আটক থাকেন। ১৯৫৫ সালে পুলিশ ধর্মঘটের সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ১৯৫৫-৫৬ সাল পর্যন্ত জেলে কাটান। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬৩ সাল পর্যন্ত সামরিক শাসক আইয়ুব খানের নির্যাতনের শিকার হয়ে কারাভোগ করেন তিনি। ১৯৬৫ সালে পাকিস্তান-ভারত যুদ্ধ বাঁধলে নিরাপত্তা আইনে কারারুদ্ধ হন। ১৯৬৯ সালে মুক্তিলাভ করার পর ১৯৭০ সালে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের আমলে তিনি ছয় মাস বন্দি থাকেন। পাকিস্তান আমলে চব্বিশ বছরের মধ্যে ২০ বছর তিনি জেলেই ছিলেন। আত্মগোপনে কেটেছে আরো প্রায় দুই যুগ। ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বিপ্লবী রবি নিয়োগী পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি, ১৯৫৭ সালে ন্যাপ গঠিত হলে ন্যাপ এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পর ন্যাপ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম নেতা ছিলেন।
বিপ্লবী রবি নিয়োগী ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় ডালু, শ্রীবরদী, নালিতাবাড়ী, হালুয়াঘাট, মহেন্দ্রগঞ্জ সীমান্তে বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ও মুক্তিযোদ্ধা মোটিভেশন ক্যাম্পে নিরলসভাবে কাজ করেছেন। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার ভূমিকা সবার প্রেরণার উৎস হয়েছিল। শেরপুর অঞ্চলের ত্যাগী নেতা রবি নিয়োগী স্বাধীন বাংলাদেশে কিংবদন্তি হয়ে ওঠেন। ব্রিটিশদের জুড়ে দেওয়া ’ডাবল স্টারে’র কারণে স্বাধীন বাংলাদেশের মাটিতেও কারাভোগ করেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর তৎকালীন শাসকগোষ্ঠী রবি নিয়োগীকে গ্রেপ্তার করে। সে সময় তিনি দু’বছরের বেশী সময় কারান্তরালে ছিলেন। সর্বশেষ গ্রেপ্তার হয়েছিলেন ১৯৮৮ সালে জনসভায় প্রচার অভিযান চালানোর সময়।
বিপ্লবী রবি নিযোগী কলম সৈনিক হিসেবেও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় নিষ্ঠ ছিলেন। তিনি সাপ্তাহিক একতা ও দৈনিক সংবাদের শেরপুর জেলা বার্তা পরিবেশক হিসেবে আজীবন কাজ করেছেন। তিনি ছিলেন শেরপুরে প্রগতিশীল সাংবাদিকদের একটি প্রতিষ্ঠান। রাজনীতি বিষয়ে তাঁর রচিত নিবন্ধ ‘একাত্তরের বিজয়গাঁথা : শেরপুর’, ‘শেরপুরের ইতিহাসে মুসলিম অবদান এবং তেভাগা আন্দোলন, সংগ্রাম ও ভবিষ্যৎ’ উল্লেখযোগ্য।
রবি নিয়োগী বিক্রমপুরের যোগেশ মুজমদারের কন্যা জ্যোৎস্না রানী নিয়োগীকে বিয়ে করেন। সহধর্মিনী জ্যোৎস্না নিয়োগী কমিউনিস্ট পার্টির একজন বিপ্লবী সদস্য ছিলেন। ১৯৫৩ সালে রবি নিয়োগী জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর অন্যান্যদের সহায়তায় শেরপুর কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ করেন। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্ট গঠনের ব্যাপারেও তিনি সক্রিয় ভুমিকা পালন করেন। জ্যোৎস্না নিয়োগীও ছিলেন এদেশের নারী মুক্তি, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের মুক্তির আন্দোলনেরও এক অসামান্য অগ্রসৈনিক। তাঁর জীবনের প্রায় ১২ বছর কেটেছে জেলহাজত ও আত্মগোপনে।
বিপ্লবী রবি নিয়োগী সর্বদাই একটি শোষণহীন, বৈষম্যহীন সুন্দর সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি বৃহত্তর জনগোষ্ঠির মুক্তির লক্ষ্যে আজীবন সংগ্রাম ও আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন। গণমানুষ থেকে কখনো বিচ্ছিন্ন হননি। তিনি বলতেন দেশ গঠনে সোনার মানুষ দরকার। তার ভাষায়-তিনি যাদের সোনার মানুষ বলতেন, আমাদের এখন শত-সহস্র নয়, লক্ষ-কোটি সেসব ‘সোনার মানুষ’ প্রয়োজন। বিপ্লবী রবি নিযোগীর ২০০২ সালের ১০ মে সূদীর্ঘ কর্মময় জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও কোনো বিপ্লবীরই মৃত্যু হয় না। বিপ্লবী রবি নিয়োগীরও মৃত্যু নেই। রবি নিয়োগীর মৃত্যুতে দেশ একজন বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা, বিপ্লবী রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবীকে হারিয়েছে সত্য। কিন্তু যুগ-যুগান্তরের মানবমুক্তির লড়াইয়ের ধারায় লড়াকু মানুষের সঙ্গেই থাকবেন, বেঁচে থাকবেন। বিপ্লবীর ১১৬ তম জন্মবার্ষিকীর স্মরণে নিজ জন্মভুমি শেরপুরে সাংবাদিক বিপ্লবী রবি নিয়োগী সভাকক্ষ পরিচালনা পর্ষদ বিশেষ কর্মসূচী গ্রহণ করেছে। এ উপলক্ষে শিশুদেও চিত্রাংকন প্রতিযোগিতা ও আলোচনা সভা আয়োজন করা হয়েছে।
লেখক : সাংবাদিক ও সংগঠক। সদস্য সচিব, সাংবাদিক বিপ্লবী রবি নিয়োগী সভাকক্ষ পরিচালনা পর্ষদ, শেরপুর। E–mail: hakimbabul@gmail.com




