ভোর হওয়ার আগেই গারো পাহাড়ের সীমান্তবর্তী জনপদে পাথরের ঠকঠক শব্দে শুরু হয় কর্মব্যস্ততা। ট্রাকের পর ট্রাক পাথর এসে পৌঁছায় শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরে। এরপরই মাথায় ঝুড়ি তুলে ট্রাক থেকে পাথর নামানো, বাছাই করা এবং স্তূপ করে রাখার কাজে নেমে পড়েন শত শত নারী শ্রমিক। দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পরও তাঁদের হাতে আসে সামান্য মজুরি।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার নাকুগাঁও স্থলবন্দরে বর্তমানে প্রায় তিন হাজার শ্রমিক কাজ করেন। তাঁদের বড় একটি অংশই নারী। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করেও একজন শ্রমিক দৈনিক পান মাত্র ৩২৫ টাকা মজুরি। বর্তমান বাজারদরে এই আয়ে সংসার চালানো কঠিন বলে জানিয়েছেন শ্রমিকেরা।
বন্দর সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৭ সালে নাকুগাঁওয়ে শুল্ক বন্দরের কার্যক্রম শুরু হয়। পরে ২০১৫ সালে ১৩ দশমিক ৪৬ একর জমি অধিগ্রহণ করে এটিকে পূর্ণাঙ্গ স্থলবন্দরে রূপ দেওয়া হয়। ভারত ও ভুটান থেকে ২১টি পণ্য আমদানির অনুমোদন থাকলেও বর্তমানে প্রায় পুরো কার্যক্রমই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে পাথর আমদানিতে। এই বন্দরে পাথরবোঝাই ট্রাক থেকে পাথর খালাস, মান অনুযায়ী পাথর বাছাই এবং নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেওয়ার মতো কষ্টসাধ্য কাজগুলো মূলত নারী শ্রমিকরাই করে থাকেন। অনেককে মাথায় করে পাথরের ঝুড়ি বহন করতে দেখা যায়।

পাথর শ্রমিক মরিয়ম বেগম (৪০) বলেন, “সকাল থেইকা সন্ধ্যা পর্যন্ত পাথর টানি। কিন্তু মজুরি পাই মাত্র সোয়া তিনশ টাকা। এই টাকা দিয়া চাল-ডাল কিনুম না পোলাপাইনের পড়ার খরচ দিমু? এই অল্প টাকায় আমাগো আর চলে না।” আরেক শ্রমিক আসমা বেগম (৩৫) জানান, তাঁর স্বামী অসুস্থ হওয়ায় সংসারের পুরো দায়িত্ব তাঁর ওপর। তিনি বলেন, “দুইটা মাইয়া স্কুলে পড়ে। সারাদিন পাথরের ধুলা খাইয়া ৩২৫ টাকা পাই। এই টেহা দিয়া সংসার চলে না, অসুখ-বিসুখে ওষুধ কেনারও উপায় থাকে না।”
নারী শ্রমিকদের অভিযোগ, একই ধরনের কাজ করলেও অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ শ্রমিকের তুলনায় নারীরা কম মজুরি পান। তাই নারী ও পুরুষ শ্রমিকের জন্য সমান মজুরি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। পাশাপাশি নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন শ্রমিকেরা। প্রতিদিন ভারী পাথর বহনের কারণে অনেক শ্রমিক শারীরিক নানা সমস্যায় ভুগছেন বলেও জানান তাঁরা।
এ বিষয়ে নালিতাবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা আফরিন বলেন, তৃণমূল পর্যায়ের নারী শ্রমিকদের স্বল্প মজুরির বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা প্রয়োজন। তিনি বলেন, “নারী ও পুরুষ শ্রমিকের পারিশ্রমিকে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত নয়। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে।”




