কম্পিউটার বা স্মার্টফোন ক্রেতাদের প্রথম প্রশ্ন থাকে, এর প্রসেসর কী? প্রতিটি ডিভাইসের মূল চালিকাশক্তি এর প্রসেসর, তাই এ প্রশ্ন খুবই স্বাভাবিক। এখন আর কম্পিউটার বা স্মার্টফোনের ব্যবহার কেবলই ওয়েব ব্রাউজিং, ভিডিও দেখা, অফিস স্যুটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। গ্রাফিকস ডিজাইন, সফটওয়্যার কোডিং বা ভিডিও এডিটিংও করছেন অনেকে। অনেকের পেশা এখন গেমিং, সঠিক প্রসেসরের গুরুত্ব তাদের কাছে অনেক।

প্রসেসরে কী আছে
কয়েক বছর আগেও প্রসেসরের মধ্যে দেখা যেত শুধু সেন্ট্রাল প্রসেসিং ইউনিট (সিপিইউ) ও গ্রাফিকস প্রসেসিং ইউনিট (জিপিইউ) কোর। এখন এর পাশাপাশি যোগ হয়েছে ডিজিটাল সিগন্যাল প্রসেসর (ডিএসপি), সিকিউরিটি চিপ (টিপিএম, সিকিউরিটি অনক্লেভ) ও নিউরাল প্রসেসিং ইউনিট (এনপিইউ) এবং মেমোরি ও স্টোরেজ কন্ট্রোলার। একসময় এসব হার্ডওয়্যার দেওয়া হতো মাদারবোর্ড চিপসেট অথবা আলাদা ডটারবোর্ডে। ফলে এখন বেশির ভাগ প্রসেসরকে বলা হয়, সিস্টেম অন আ চিপ (এসওসি)।ওয়ার্কস্টেশন, সার্ভার ও গেমিং ডেস্কটপ পিসি ছাড়া প্রায় সব ডিভাইসেই এখন এসওসি ব্যবহৃত হচ্ছে। একেকটি এসওসি একেক ধরনের কাজের জন্য তৈরি। যেমন—এএমডি জেড সিরিজের এসওসি তৈরি হয়েছে গেমিংয়ের জন্য, আবার ইন্টেল প্যান্থার লেক এসওসি তৈরি হয়েছে ব্যাটারি বাঁচিয়েও যতটা সম্ভব উচ্চ পারফরম্যান্সে সফটওয়্যার চালানোর জন্য। অন্যদিকে আইশিন এএক্স৬৩০ এসওসি তৈরি হয়েছে এআই চালানোর জন্য।
ল্যাপটপ
বাজারে কয়েক ধরনের ল্যাপটপ আছে। মোটাদাগে দুই প্রকারে সেগুলো ভাগ করা যায়। ব্যাটারিসাশ্রয়ী হালকা-পাতলা আলট্রাবুক এবং বড় আকৃতির গেমিং বা ওয়ার্কস্টেশন ল্যাপটপ। প্রসেসরের মধ্যেও রয়েছে দুই ধরনের আর্কিটেকচার। আলট্রাবুকের মধ্যে এখন চিরচেনা x64 আর্কিটেকচারের পাশাপাশি ARM64 আর্কিটেকচারের প্রসেসরও ব্যবহৃত হচ্ছে। অ্যাপলের পাশাপাশি এখন উইন্ডোজ ল্যাপটপেও আর্ম প্রসেসর ব্যবহার শুরু হয়েছে। এ ধরনের প্রসেসর অত্যন্ত বিদ্যুৎসাশ্রয়ী, খুব বেশি গরমও হয় না, তাই হালকা-পাতলা প্রিমিয়াম ল্যাপটপ তৈরিতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। তবে জনপ্রিয় অনেক সফটওয়্যার ও গেম এখনো আর্ম প্রসেসর সমর্থন করে না। ব্যবহার করা গেলেও পারফরম্যান্সে ঘাটতি রয়ে যায়। তাই আর্ম প্রসেসর, যেমন—অ্যাপল এম সিরিজ অথবা কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন এক্স সিরিজের ল্যাপটপ সবার জন্য নয়। যাদের হালকা-পাতলা ল্যাপটপ প্রয়োজন এবং কাজের প্রতিটি সফটওয়্যার আর্ম প্রসেসরে ভালোমতো চলে, শুধু তাদের জন্যই আর্মভিত্তিক ল্যাপটপ।

এক্স৬৪ প্রসেসর তৈরি করে ইন্টেল ও এএমডি। ল্যাপটপে এখনো ইন্টেল প্রসেসর বেশি জনপ্রিয়। আলট্রাবুকের জন্য রয়েছে ইন্টেল কোর আলট্রা এবং কোর আই ইউ সিরিজের প্রসেসর। এএমডির আলট্রাবুক প্রসেসরও রাইজেন ইউ সিরিজের অন্তর্গত। গেমিং বা ওয়ার্কস্টেশনে কোর আলট্রা প্রসেসরের পাশাপাশি ব্যবহৃত হচ্ছে কোর আই এইচ/এইচএক্স এবং রাইজেন এইচ সিরিজের প্রসেসর।
এখন ল্যাপটপ বাজারে ইন্টেল কোর আই সিরিজের ১২, ১৩ ও ১৪তম প্রজন্মের প্রসেসর রয়েছে। এগুলো সবই অন্তত এক থেকে তিন বছর আগের হার্ডওয়্যার, যদিও ল্যাপটপ নির্মাতারা এখনো সেগুলো নতুন ডিভাইসে ব্যবহার করছে। বর্তমান ইন্টেল প্রসেসরের নাম শুধু ‘কোর’ বা ‘কোর আলট্রা’। নতুন কোর/কোর আলট্রা সিরিজেরও রয়েছে তিনটি প্রজন্ম। ল্যাপটপ কেনার সময় তাই প্রসেসরের সিরিজ এবং প্রজন্ম জেনে নেওয়া জরুরি। এএমডি প্রসেসরের ক্ষেত্রেও নামকরণ বেশ জটিল। প্রায় দুই বছরের পুরনো রাইজেন ৭০০০/৮০০০ সিরিজের পাশাপাশি রয়েছে নতুন রাইজেন এআই ২০০, ৩০০ ও ৪০০ সিরিজের প্রসেসর।
বাজেট সমস্যা না থাকলে সব সময়ই সর্বশেষ প্রজন্মের প্রসেসর কেনা উচিত। ইন্টেলের ক্ষেত্রে সেটি কোর আলট্রা সিরিজ ৩ এবং এএমডির ক্ষেত্রে রাইজেন এআই ম্যাক্স ৪০০ সিরিজ। প্রজন্মের পাশাপাশি প্রসেসরের মডেলও গুরুত্বপূর্ণ। এএমডি ও ইন্টেলের প্রতিটি প্রজন্মের মধ্যে রয়েছে মোট চারটি মডেলের প্রসেসর। ক্ষমতা অনুযায়ী সেগুলোকে ৩, ৫, ৭ ও ৯—এই চারটি মডেল সিরিজে ভাগ করে থাকে নির্মাতারা। বেশির ভাগ ব্যবহারকারীর জন্য কোর/আলট্রা ৫ ও রাইজেন এআই ৫ প্রসেসর যথেষ্ট। বাজেট স্বল্পতায় কোর/রাইজেন ৩ প্রসেসর বেছে নেওয়া যেতে পারে, ভারী কাজের জন্য কোর আলট্রা/রাইজেন এআই ৭ বা ৯ প্রসেসর কেনা উচিত। ভারী কাজের জন্য ইউ সিরিজের প্রসেসর যথেষ্ট নয়, বেছে নিতে হবে এইচ বা এইচএক্স সিরিজের প্রসেসর। কিছু বাজেট ল্যাপটপে ইন্টেল এন বা এএমডি অ্যাথলন সিরিজের প্রসেসর ব্যবহৃত হয়। এগুলো একেবারে হালকা কাজের জন্য তৈরি, সীমিত বাজেট না হলে এসব প্রসেসর না কেনাই ভালো। এইচ বা এইচএক্স সিরিজের প্রসেসরযুক্ত ল্যাপটপ কিছুটা গরম হবে এবং দীর্ঘ ব্যাটারি লাইফও পাওয়া যাবে না।
বেশির ভাগ ইন্টেল প্রসেসরের বিল্টইন জিপিইউ উচ্চমানের গ্রাফিকসযুক্ত গেম খেলার জন্য তৈরি নয়। তবে সর্বশেষ কোর আলট্রা ৭ সিরিজ ৩ প্রসেসরে থাকা জিপিইউ উচ্চমানের গেম চালাতে সক্ষম। যাঁরা গেমিংয়ের জন্য ল্যাপটপ কিনবেন তাঁদের অবশ্যই আলাদা জিপিইউসহ মডেল নির্বাচন করতে হবে। এএমডি প্রসেসরে বিল্টইন গ্রাফিকসে ক্যাজুয়াল গেমিং বা ই-স্পোর্টস খেলা যাবে। ভিডিও এডিটিং বা থ্রিডি গ্রাফিকসের কাজে এখনো ইন্টেল জিপিইউ এগিয়ে। এর মধ্যে থাকা হার্ডওয়্যার কোডেকগুলো ভিডিও সম্পাদনা বা গ্রাফিকস রেন্ডারিংয়ে দারুণ কাজের। এ ছাড়া বিশেষায়িত যেসব সফটওয়্যারে অঠঢ-৫১২ প্রয়োজন সেগুলো ইন্টেল প্রসেসর ছাড়া ভালো পারফরম্যান্স দেয় না।
ডেস্কটপ
গেমিং ও ওয়ার্কস্টেশন পিসিতে কয়েক বছর ধরেই এএমডি রাইজেন প্রসেসর বেশি জনপ্রিয়। এখন বাজারে পাওয়া যাচ্ছে রাইজেন ৯০০০ সিরিজের ডেস্কটপ প্রসেসর। যাঁরা ওয়ার্কস্টেশন তৈরি করতে চান তাঁদের জন্য রয়েছে থ্রেডরিপার প্রো ডব্লিউ৯০০০০ সিরিজ। এএমডি প্রসেসরগুলো সহজেই ওভারক্লক করা যায়, ইন্টেলের তুলনায় গরম কম হয় এবং উচ্চগতির র্যাম ব্যবহারে পারফরম্যান্স বাড়ে, তাই এএমডি প্রসেসরের জনপ্রিয়তা বেশি। ইন্টেলও একেবারে পিছিয়ে নেই, কোর আলট্রা সিরিজের প্রসেসরগুলো ধীরে ধীরে জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। তবে ১২-১৩ প্রজন্মের ইন্টেল কোর আই সিরিজের প্রসেসর রাইজেনের তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে। ল্যাপটপের মতোই বাজেট ডেস্কটপে রাইজেন/কোর ৩, মাঝারি শক্তির ডেস্কটপে রাইজেন/কোর ৫ এবং উচ্চশক্তির ওয়ার্কস্টেশন বা গেমিং পিসিতে রাইজেন/কোর ৭ বা ৯ ব্যবহার করা যেতে পারে।
গেমিংয়ের জন্য এএমডি বিশেষায়িত এক্স৩ডি সিরিজের প্রসেসর তৈরি করে। রাইজেন ৫, ৭ ও ৯ সিরিজে গেমিংয়ের জন্য এক্স৩ডি মডেলের প্রসেসর আছে। গেমিং পিসি ছাড়া এক্স৩ডি প্রসেসর অপ্রয়োজনীয়।
এএমডি প্রসেসর কিনলে মাথায় রাখতে হবে, উচ্চগতির ডুয়াল চ্যানেল র্যাম অত্যন্ত জরুরি। নইলে আশানুরূপ পারফরম্যান্স পাওয়া যাবে না। গেমিং পিসি তৈরিতে ‘রি-বার’ অপশনটিও জরুরি। আধুনিক গেমিং মাদারবোর্ড ও প্রসেসরে এটি দেওয়া থাকে, কিন্তু কিছু বাজেট মাদারবোর্ডে অপশনটি দেওয়া হয় না।
স্মার্টফোন ও ট্যাবলেট
আইফোনে বরাবরই অ্যাপলের নিজস্ব ‘এ’ সিরিজের প্রসেসর ব্যবহৃত হয়, গুগলের নিজস্ব ‘জি’ প্রসেসর ব্যবহৃত হয় পিক্সেলে। এ দুই নির্মাতার তৈরি ডিভাইস কেনার ক্ষেত্রে আসলে প্রসেসর বেছে নেওয়ার উপায় নেই। অন্যান্য অ্যানড্রয়েড ডিভাইস নির্মাতা একসময় কোয়ালকম স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসর বেশি ব্যবহার করলেও এখন মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি এবং ইউনিসক টাইগার প্রসেসরও হরহামেশা ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্ন্যাপড্রাগন প্রসেসরের রয়েছে চারটি সিরিজ। বাজেট ডিভাইসের জন্য স্ন্যাপড্রাগন ৪, মাঝারি মূল্যের জন্য স্ন্যাপড্রাগন ৬, উচ্চ-মাঝারি বাজেটের মডেলের জন্য স্ন্যাপড্রাগন ৭ এবং ফ্ল্যাগশিপ ডিভাইসের জন্য স্ন্যাপড্রাগন ৮। বাজারে সচরাচর স্ন্যাপড্রাগন ৬ ও ৭ সিরিজের প্রসেসরযুক্ত অ্যানড্রয়েড বেশি দেখা যায়। দৈনন্দিন ব্যবহারের পাশাপাশি মাঝারি গ্রাফিকসে গেম খেলার জন্য স্ন্যাপড্রাগন ৬ বা ৭ যথেষ্ট। ফ্ল্যাগশিপ পারফরম্যান্স প্রয়োজন হলে অবশ্য স্ন্যাপড্রাগন ৮ সিরিজ কেনা ছাড়া গতি নেই। প্রতিটি সিরিজের মধ্যে কয়েক প্রজন্মের প্রসেসর আছে, যেমন—সর্বশেষ ফ্ল্যাগশিপ প্রসেসরের নাম ‘স্ন্যাপড্রাগন ৮ এলিট জেন ৫’। ফোনের প্রসেসরটি কোন প্রজন্মের সেটিও কেনার সময় জেনে নেওয়া জরুরি। স্ন্যাপড্রাগন ৭ ও ৮ সিরিজের মধ্যে আবার আছে এস সিরিজ। একই প্রজন্মের হলেও ৮এস ও ৭এস প্রসেসরগুলো অপেক্ষাকৃত দুর্বল। যেমন—স্ন্যাপড্রাগন ৮ জেন ৩-এর তুলনায় স্ন্যাপড্রাগন ৮এস জেন ৩ দুর্বল।
মাঝারি বাজেটের ফোনগুলোতে এখন মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি ৭০০০ ও ৮০০০ সিরিজের প্রসেসর ব্যবহৃত হচ্ছে। কিছু নির্মাতা জি৯৯ ও জি১০০ প্রসেসরও ব্যবহার করছে। এগুলোর পারফরম্যান্স অনেকটা স্ন্যাপড্রাগন ৬ বা ৭-এর সমান, তবে গেমিংয়ে সামান্য পিছিয়ে। অতিরিক্ত গরম হয় এবং ব্যাটারির চার্জ দ্রুত ফুরিয়ে যায়—মিডিয়াটেক প্রসেসরের একসময় এমন দুর্নাম থাকলেও গত কয়েক বছরে এ সমস্যা দেখা যায়নি। কিছু ফ্ল্যাগশিপে ডাইমেনসিটি ৯০০০ সিরিজের প্রসেসর সুনামের সঙ্গে ব্যবহৃত হচ্ছে।
বাজেট ডিভাইসগুলোতে ইউনিসক টাইগার প্রসেসর ব্যবহৃত হয় বেশি। সবচেয়ে বেশি দেখা যায় টি৬১৫ মডেলের প্রসেসর। এগুলো স্বল্প বাজেটের মধ্যে চলনসই পারফরম্যান্স দিতে সক্ষম, তবে উচ্চমানের গেমিং পারফরম্যান্স আশা না করাই শ্রেয়।
গেমিংয়ের জন্য স্ন্যাপড্রাগন ৭ বা ৮ সিরিজের প্রসেসরযুক্ত অ্যানড্রয়েড কেনা উচিত অথবা আইফোন। মিডিয়াটেক প্রসেসরগুলোর গেমিং পারফরম্যান্স মন্দ নয়, তবে স্ন্যাপড্রাগন এখনো রয়েছে এগিয়ে। স্ন্যাপড্রাগন ৭ ও মিডিয়াটেক ডাইমেনসিটি ৭০০০ সিরিজের প্রসেসরগুলো বেশির ভাগ ব্যবহারকারীর জন্য যথেষ্ট, বাজেট থাকলে স্ন্যাপড্রাগন ৮ বা ডাইমেনসিটি ৯০০০ সিরিজের ডিভাইস কেনা উচিত। নিতান্তই বাজেট সমস্যা না হলে স্ন্যাপড্রাগন ৪ বা হেলিও জি৯৯/১০০ কেনা অনুচিত। স্মার্টফোন ও ট্যাবলেটে একই ধরনের প্রসেসর ব্যবহৃত হওয়ায় এসব কথা ট্যাবলেটেও প্রযোজ্য।
অনুষঙ্গ
র্যাম ও স্টোরেজের গতির পাশাপাশি কুলিং সিস্টেমের ওপরও নির্ভর করে প্রসেসরের পারফরম্যান্স। ডেস্কটপ কেনার সময় উচ্চগতির র্যাম ও এসএসডি স্টোরেজও কিনতে হবে, পাশাপাশি থাকতে হবে মানসম্মত কুলার। ল্যাপটপের ক্ষেত্রে অনলাইনে রিভিউ না দেখে কেনা উচিত নয়। একই কথা স্মার্টফোন বা ট্যাবলেটের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য, স্টোরেজ ও র্যামের গতি সচরাচর ফোনের বক্সে লেখা থাকে না, তাই ইন্টারনেটে রিভিউ দেখে কেনা জরুরি। অনেক ফোনেই প্রয়োজনীয় কুলিং সিস্টেম না থাকায় প্রসেসরগুলো ভালো গেমিং পারফরম্যান্স দেয় না।




