ads

বুধবার , ২৬ নভেম্বর ২০২৫ | ১১ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের নিবন্ধনপ্রাপ্ত অনলাইন নিউজ পোর্টাল
  1. ENGLISH
  2. অনিয়ম-দুর্নীতি
  3. আইন-আদালত
  4. আন্তর্জাতিক
  5. আমাদের ব্লগ
  6. ইতিহাস ও ঐতিহ্য
  7. ইসলাম
  8. উন্নয়ন-অগ্রগতি
  9. এক্সক্লুসিভ
  10. কৃষি ও কৃষক
  11. ক্রাইম
  12. খেলাধুলা
  13. খেলার খবর
  14. চাকরির খবর
  15. জাতীয় সংবাদ

কড়াইল বস্তিতে কেন বারবার আগুন?

শ্যামলবাংলা ডেস্ক
নভেম্বর ২৬, ২০২৫ ৯:৩৬ অপরাহ্ণ

ভূমিকম্পের ট্রমা কাটতে না কাটতেই ঢাকার সবচেয়ে বড় ঘনবসতিপূর্ণ কড়াইল বস্তিতে ঘটল ভয়াবহ আগুনের ঘটনা। রাজধানীর মহাখালী-গুলশানের আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর কড়াইলের টিনের চালের জরাজীর্ণ খুপড়ি ঘরের মাঝখানে ব্যবধান শুধু একটি লেকের। তবে সামান্য দূরত্বের আড়ালে লুকিয়ে জীবন-মানের আসমান-জমিন পার্থক্য। কড়াইল বস্তির আগুন যেন এক অনাহূত পুরোনো অতিথি, অপ্রত্যাশিত স্বত্ত্বেও ঘুরে ফিরে আসে, রেখে যায় ছাই, কান্না আর ক্ষত। সংগতকারণে কড়াইল বস্তির নিম্ন-আয়ের মানুষের হৃদয়ে আটকে থাকা আতঙ্কের নাম আগুন।

Shamol Bangla Ads

সচেতন নাগরিক মহল বলছেন, যে শহরে একদিকে কাঁচের আড়ম্বর, আরেকদিকে মানুষ টিন-কার্ডবোর্ডে ঘনবসতিতে জীবন সাজায়, সেই শহরের আগুন শুধু ঘর পোড়ায় না! পোড়ায় সমতার স্বপ্ন, নিরাপত্তার অধিকার, আর বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও।

কিন্তু কেন এই কড়াইল বস্তিতে বারবার আগুন লাগে? কারণ কী? কে বা কারা দায়ী? আগুনের খবর পেয়েও কেন ফায়ার সার্ভিস বার বার আটকে যায় পথে? আগুনের নেপথ্যে কারও কোনো গোপন উদ্দেশ্যও কি অমূলক? সরকারেরই বা কী উদ্যোগ? সব প্রশ্নের উত্তর মেলে না কখনোই। মোটাদাগে কারণগুলো উঠে আসে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ের তদন্তে। কিন্তু তাতে আগুন লাগা বন্ধ হয়নি, নিঃস্ব হওয়া বাসিন্দারা কোমর সোজা করে দাঁড়াতেই আবারো নিঃস্ব হওয়ার করুণ পরিণতিও শেষ হচ্ছে না।

Shamol Bangla Ads

মহাখালী-বনানী-গুলশানের মতো বাণিজ্যিক-অভিজাত এলাকার মাঝখানেই প্রায় ৯০ একর এলাকা জুড়ে ঘনবসতিপূর্ণ এক বস্তি কড়াইল। প্রায় লাখ খানেক মানুষের বসবাস এই বস্তিতে। এখানকার বাসিন্দাদের জীবিকা দিনমজুরি, ড্রাইভিং, ভাঙ্গারি ব্যবসা, গার্মেন্টস, রিকশা, ছোট ব্যবসা, ডে-লেবার, হকারি। কর্মজীবী নারী বাসিন্দাদের অধিকাংশরাই ছোট দোকানি, গার্মেন্টস ও বাসা-বাড়িতে কাজ করেন। যেখানে আধুনিক নগর পরিকল্পনায় একজন মানুষের ন্যূনতম থাকা-খাওয়ার বন্দোবস্ত প্রধান প্রায়োরিটি, সেখানে কড়াইল বস্তিতে গড়ে প্রতি ৪০-৫০ বর্গফুটে একজন মানুষ বসবাস শুধু মানবিক সংকটই নয়, অগ্নিকাণ্ডের জন্যও যেন প্রস্তুত বারুদভাণ্ডারের ন্যায়। তারই যেন প্রমাণ দিতে হয় প্রতিবছর আগুনে। কখনো কখনো বছরের ২/৩ বারও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে কড়াইল বস্তিতে। সবশেষ মঙ্গলবার (২৫ নভেম্বর) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে কড়াইল বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের খবর জানায় ফায়ার সার্ভিস।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মিডিয়া কর্মকর্তা শাহজাহান শিকদার জানান, মঙ্গলবার বিকেল ৫টা ২২ মিনিটে খবর পেয়ে মোট ১৯টি ইউনিট কাজ করে। রাত সাড়ে ১০টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। পরদিন বুধবার সকাল সাড়ে ৯টায় আগুন পুরোপুরি নির্বাপণ সম্ভব হয়।
কড়াইল বস্তির মূল বউবাজার এলাকার বাসিন্দা আব্বাস আলী জানান, বউবাজারের কুমিল্লা পট্টি, বরিশাল পট্টি ও ক- ব্লক এলাকায় আগুনের সূত্রপাত। ওই অংশে হাজারখানেক ঘর ছিল। আগুন লাগার পর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। আগুন নির্বাপনে অংশ নেওয়া ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা এবং বাসিন্দারা বলছেন অন্তত ১২০০ ঘর পুড়ে গেছে। ২৬ নভেম্বর সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত সরেজমিনে দেখা যায়, কড়াইল বস্তির অধিকাংশ ঘরই জোড়াতালি দেওয়া। টিন, বাঁশ, প্লাস্টিক, কাঠ, কার্ডবোর্ডে তৈরি ঘর। যেসব মূলত আগুনের বা অগ্নিকাণ্ডের ক্ষেত্রে প্রচণ্ড দাহ্য সব উপকরণ। যা আগুনকে থামতে না দিয়ে হাত ধরে দৌড়ানোর সুযোগ করে দেয়।

সরেজমিনে দেখা যায়, টিনশেড ঘরকেই কোথাও কোথায় দ্বিতল, তিনতলায় রূপ দেওয়া হয়েছে। কোথাও ৫/৭টা বড় ঘর মিলে একটি করে ওয়াশ রুম ও রান্নাঘর। যেখানে পালা করে নিত্যদিন সেরে নিতে হয় গোসল, বাথরুম ও রান্নার কাজ। তবে বস্তিতে এমন কিছু নেই যা এখানে মেলে না। কী বৈধ আর কী অবৈধ। যেন টাকা হলে সবই মেলে বস্তিটিতে। তবে বার বার আগুনের কারণে গেল বছর বস্তিতে গ্যাসের লাইন সরকারিভাবে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ বস্তির বাসিন্দাদের।

কেন বারবার আগুন কড়াইল বস্তিতে? এমন প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে জানতে চাওয়া হয়, ক্ষতিগ্রস্তসহ বস্তি বাসিন্দাদের কাছে। এরমধ্যে উঠে আসে অন্তত আটটি কারণ। তারমধ্যে অন্যতম, প্রথমত : অস্থায়ী, ঘন, দাহ্য গঠনের অবকাঠামো। বস্তির রাস্তা প্রায় মানুষের কাঁধের চেয়েও সরু। ঘরগুলোর মধ্যবর্তী দূরত্ব এতটাই কম যে কোথাও কোথাও দেয়ালই যেন দেয়ালের সঙ্গে মিশে আছে। আগুন লাগলে বাতাস তাকে পাখির ডানার মতো ছড়িয়ে দেয়। দ্বিতীয়ত : অনুমোদনহীন বিদ্যুৎ সংযোগ। এখানে বেশির ভাগ বিদ্যুৎ লাইনই অবৈধ ও ঝুলন্ত তারবিশিষ্ট। সরবরাহের তুলনায় অতিরিক্ত লোড-শর্টসার্কিটের মতো সম্ভাব্যতাকে অবস্যম্ভাবী করে তুলেছে। তৃতীয়ত : বস্তির প্রায় ৭০ শতাংশ বাড়িতেই গ্যাস সিলিন্ডার। নিরাপত্তা মানহীন সিলিন্ডার, রেগুলেটর লিক, চুলার গ্যাস জমে থাকা— এগুলো নিয়মিত বিস্ফোরণের সূত্র।

চতুর্থত : লেক ঘেঁষে ৯০ একর এলাকা জুড়ে গড়ে উঠা বস্তিটিতে সহজপ্রাপ্য পানির উৎস নেই। তারমধ্যে সরুর রাস্তার কারণে ফায়ার সার্ভিসসহ জরুরি সেবার গাড়িও ঢুকতে বেগ পেতে হয়। প্রতিবারই আগুন নির্বাপণের পর ফায়ার সার্ভিসের পক্ষ থেকে বলা হয়- “আগুন নেভাতে সবচেয়ে বড় সমস্যা—পানি আর ঢুকতে না পারা।”

পঞ্চমত : আগুনের পর বড় ফায়ার ট্রাক ঢুকতে পারে না। পানি সরবরাহের হোস পাইপও অনেক সময় ফেটে যায়। সংকীর্ণ গলি, ভাঙাচোরা পথ সব মিলিয়ে ফায়ার সার্ভিসের জন্য কড়াইল বস্তির আগুন মানে দুঃস্বপ্ন। ষষ্ঠ কারণের অন্যতম হচ্ছে- বস্তিতে দখলদারিত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব-বিস্তার। বস্তির জমি সরকারি হলেও বছর বছর এ নিয়ে নানা সংঘর্ষ, স্বার্থ, উচ্ছেদ, পাল্টা-উচ্ছেদের ঘটনা যেন হরহামেশা। অনেকগুলো কারণের মধ্যে ভুক্তভোগীদের দাবি ও জোর সন্দেহে- ‘কারও না কারও লাভ হয় আগুনে’।

সপ্তমত : সরকারি তদারকি নেই বসতিপূর্ণ বস্তিতে। একেক সময় একেক পরিকল্পনার কথা শোনো গেলেও আদতে বস্তির বসতি ও ঘনত্ব বেড়েছে, সেবা বা জীবন মান বাড়েনি। নিরাপত্তায় সাবস্টেশন হয়নি, ড্রেনেজ পরিকল্পনা নেই, নেই ফায়ার হাইড্রেন্টও।

ফায়ার সার্ভিসের পর্যবেক্ষক দল ও বাসিন্দাদের মতে আগুনের ভয়াবহতা কিংবা আগুনের উৎপত্তির শুরুতেই ডিটেক্ট করতে না পারাও অন্যতম কারণ। তাছাড়া দিনের বেলায় ফাঁকা আর রাত্রিকালীন ঘন ভিড়। রান্নার বেশিরভাগ আগুন লাগে সন্ধ্যা বা রাতে— যখন রান্নার সময়, বিদ্যুতের চাপ বেশি।

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রাথমিকভাবে কড়াইল বস্তিতে সম্ভাব্য কারণ ৩টি- ১. বৈদ্যুতিক শর্ট সার্কিট, ২. গ্যাস সিলিন্ডার ফাটল ৩. অসাবধানতাজনিত আগুন। তবে তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা এটাও বলছেন, ‘ঘনবসতিতে আগুন স্বাভাবিকের চেয়েও দ্রুত ছড়ায়। প্রতিকার না করা হলে এটা আবারও ঘটবে। আগুনের উৎপত্তির প্রয়োজনীয় প্রমাণ পাওয়া কঠিন, কারণ ঘরগুলো সম্পূর্ণ পুড়ে ছাই হয়ে যায়।

ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের সাবেক মহাপরিচালক (ডিজি) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আলী আহমেদ খান বলেন, এলপিজি গ্যাস যত্রতত্র ব্যবহার হচ্ছে। বস্তির ঘরগুলো খুব ঘিঞ্জি, একটার সঙ্গে আরেকটা লাগানো। ঘরগুলো কাঠ ও টিন আর কাগজের বক্স দিয়ে বানানো। যা দাহ্যবস্তু। ইলেকট্রনিক লাইনগুলো অনেক নিম্নমানের। রান্নার কাজে ব্যবহৃত গ্যাসের সিলিন্ডারের লিকেজ থেকে আগুন লাগলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। তিনি বলেন, বস্তিতে আধিপত্য বিস্তারের জন্য আগুন লাগাতে পারে। সেটার সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক কারণেও আগুন লাগানো হতে পারে। গোয়েন্দারা ভালো বলতে পারবেন।
আগুন নেভাতে দেরির কারণ ও সমাধানে পরামর্শ দিয়ে তিনি বলেন, ফায়ার সার্ভিসে নতুন কোনো সদস্য কড়াইলের বস্তিতে গেলে সে রাস্তা খুঁজে পায় না। এজন্য অভিজ্ঞ এবং যারা কড়াইল বস্তি সম্পর্কে জানে শুধুমাত্র তারাই দ্রুত আগুন নেভাতে পারবে। কারণ কড়াইল বস্তি সম্পর্কে তাদের ধারণা রয়েছে। আমি যখন দায়িত্বে ছিলাম তখন আলাদা একটি ইউনিট ছিল কড়াইলের জন্য। সেখানে সাব স্টেশন করা, ফায়ার হাইড্রেন্ট স্থাপন ও অভিজ্ঞ জনবলকে মোতায়েন করার পরামর্শ দেন তিনি।

Need Ads

সর্বশেষ - ব্রেকিং নিউজ

Shamol Bangla Ads
error: কপি হবে না!