দীর্ঘ চার যুগ পর পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজিএসএস) থেকে জাতীয় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় এখন পাহাড়ের রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ শুরু হয়েছে। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্রগ্রাম আসন থেকে পিসিজেএসএস প্রতিষ্ঠাতা প্রয়াত মানবেন্দ্র নারায়ন লারমা (এমএন লারমা) সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছিল। পাহড়ে দীর্ঘ সময় ধরে সশস্ত্র সংগ্রাম করে সরকারের সাথে শান্তিচুক্তি করার পর ৮ম ও ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটি থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে অংশ নিলেও তখন নির্বাচনে জিতেনি। কিন্তু রাঙ্গামাটি আসনে এবার জেএসএস (সন্তু লারমা) সহসভাপতি ও আঞ্চলিক পরিষদ সদস্য ঊষাতন তালুকদার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে বিপুল ভোটে আওয়ামীলীগের পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদারকে পরাজিত করে এমপি নির্বাচিত হতে পারায় জেএসএস গণতন্ত্রের রাজনীতিতে ক্রমশঃ অগ্রসর হচ্ছে বলে বিশ্লেষকরা মত প্রকাশ করেন। নব নির্বাচিত সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার পাহাড়ে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা,শান্তিচুক্তি বাস্তবায়ন,সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উন্নতি ও সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করে পাহাড়িদের পাশাপাশি বাঙ্গালীদের অধিকার নিশ্চিত করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল। তিনি একজন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের মধ্যে শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবাযনে সরকারকে বাধ্য করতে পারবেন কিনা আর পাহাড়ে বিবদমান ইউপিডিএফ ও জেএসএস (এমএন লারমা) দলের সাথে ঐক্যমতে পৌঁছে শান্তি প্রতিষ্ঠায় কেমন ভ’মিকা রাখবেন,এখন সেদিকেই দৃষ্টি পাহাড়ের সাধারণ মানুষের। এদিকে নির্বাচনের পর পার্বত্য চট্রগ্রাম বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী দীপংকর তালুকদার বলেন,দীর্ঘ সময় ধরে জেএসএস অভিযোগ করে আসছিল ৩ পার্বত্য আসনের সরকারি দলের এমপি শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ভ’মিকা রাখেনি। তিনি ঊষাতন তালুকদারের সফলতা কামনা করে বলেন,এবার নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ঊষাতন তালুকদার শান্তিচুক্তি বাস্তবায়নে কার্যকর ভ’মিকা রেখে পার্বত্য অঞ্চল থেকে চাঁদাবাজি,অবৈধ অস্ত্রের ঝনঝনানি,অপহরণ,খুনসহ সকল প্রকার সন্ত্রাসী কর্মকান্ড চিরতরে বন্ধ করবেন। পার্বত্য শান্তিচুক্তির দেড় দশক অতিবাহিত হবার পরও কাক্সিক্ষত শান্তি না থাকায় ৩ পার্বত্য জেলার সাধাণ মানুষকে উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় জীবন যাপন করতে হয়। পার্বত্যাঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর সরকার ও পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতির মধ্যকার স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তিতে আশা করা হয়েছিল দীর্ঘদিনের পার্বত্য সংঘাত নিরসন হয়ে পাহাড়ে কাক্সিক্ষত শান্তি ও সমৃদ্ধি অর্জিত হবে। শান্তিচুক্তির ১৬ বছরেও পাহাড়ে শান্তি ফিরে না আসায় পাহাড়ি-বাঙ্গালীর মধ্যে দেখা দিয়েছে নানা অবিশ্বাস ও সন্দেহ। পাহাড়ে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি (সন্তু লারমা),ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেট্রিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ) ও জনসংহতি সমিতি (এমএন লারমা) সক্রিয়ভাবে নিজ নিজ এলাকায় কর্তৃত্ব বহাল রেখে প্রাধান্য বিস্তার করেছে। এই দলগুলো এখন পাহাড়ে শান্তিচুক্তির পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নিয়ে আধিপত্য বিস্তারসহ ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতে জড়িয়ে পড়ায় পাহাড় এক অশান্তির জনপদে পরিণত হয়েছে। চুক্তির পক্ষ বিপক্ষ দু’স¤প্রদায়ের মধ্যে চলছে স্বার্থ সংশ্লিষ্ট দ্বন্দ্ব আর পারস্পরিক সংঘাত। পাহাড়ে প্রায়ই গুম, অপহরণসহ নানা অশান্তির খবর শুনে শান্তিপ্রিয় সুশীল সমাজকে চিন্তিত থাকতে হয়। এখানে আঞ্চলিক দল গুলোর ভয়ে বিরাজমান পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষ মুখ খুলতে চায় না। এমনকি কেউ জানলে বা স্বচক্ষে দেখলেও এনিয়ে পাড়া প্রতিবেশি কারো সাথে বাক্য বিনিময় করে না। এ সব দলের পারস্পরিক সংঘাতসহ গুম,অপহরণ,মুক্তিপণ ও হত্যাকান্ডের সঠিক পরিসংখ্যান বা বিবরণ কারো জানা নেই। তবে এনিয়ে বিভিন্ন সংস্থা পরিসংখ্যান উল্লেখ করলেও বাস্তবে তা অনেক বেশি হবে বলে পাহাড়ের সাধারণ মানুষ অভিমত ব্যক্ত করেন। এদিকে চুক্তির মৌলিক বিষয় বাস্তবায়ন না হওয়ায় চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতিতে পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি সরকারের প্রতি চরম অসন্তুষ্ট। এনিয়ে পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতির সভাপতি ও পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় (সন্তু লারমা) বিভিন্ন সভা সমাবেশে লড়াই সংগ্রাম চালিয়ে দাবি আদায়ের দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল।

সূত্র জানায়, আঞ্চলিক পরিষদের কার্যবিধিমালা না থাকায় সংস্থাটির তেমন ক্ষমতা নেই। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন আইনে অসংগতিজনিত আপত্তি থাকায় ভূমি সমস্যাটি পার্বত্য এলাকায় জটিল হয়ে পড়েছে। চুক্তির ১৬ বছর পরও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ নির্বাচনের ব্যবস্থা না নেয়ায় সংস্থাগুলো নিয়েও জনমনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে। পার্বত্য এলাকায় প্রশাসনিক সমন্বয় না থাকায় এবং জেলা পরিষদ ও আঞ্চলিক পরিষদ অনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে থেকে যাওয়ায় ওসব প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমে জবাবদিহিতা নেই বললেই চলে। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ সরকারি দলের তথা সরকারের নিয়োগকৃত ব্যক্তিদের দ্বারা পরিচালিত হওয়ায় ওসব প্রতিষ্ঠান কতিপয় ব্যক্তির পুনর্বাসন কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত বলে সুশীল সমাজ অভিমত ব্যক্ত করেন। এই অবস্থায় পাহাড়ের মানুষের মাঝে অবিশ্বাস বাড়ছে ও আস্থার অভাব প্রকট হচ্ছে। বিগত সময়ে লক্ষণীয় যে, হঠাৎ করে পাহাড়ে সা¤প্রদায়িক উত্তাপের ঢেউ ছড়িয়ে পড়লে তখন পাহাড়ি-বাঙ্গালীর মধ্যে দেখা দিয়েছিল বিভেদ আর হানাহানি । অপরদিকে পাহাড়ে অস্ত্রবাজি,চাঁদাবাজি নিত্যনৈমিত্তিক হওয়ায় পাহাড়ে সামগ্রিক আইন শৃঙ্খলা নাজুক বৈকি। সচেতন মহলের মতে, এলাকায় শান্তি ও স¤প্রীতি বজায় না থাকলে উন্নয়ন বিপর্যস্ত হবেই। এদিকে ইউএনডিপি’র অর্থায়নে বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বা এনজিও’র দ্বারা পরিচালিত প্রকল্পের সুবিধা বাঙ্গালী জনগণ না পাওয়ায় তারা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। পার্বত্য এলাকায় শিক্ষার বিস্তার ও শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা লক্ষণীয নয়। পাহাড়ে অনেক উপজেলা রয়েছে যেখানে কলেজ নেই। সংঘাতপূর্ণ পার্বত্য এলাকায় শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে চুক্তি বাস্তবায়নের পাশাপাশি শিক্ষার উন্নয়নে ভূমিকা রাখা অত্যাবশ্যক। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার বিশেষ প্রকল্প গ্রহণ করে উক্ত প্রকল্পের আওতায় শিক্ষকদের সুবিধাদি প্রদান পূর্বক এক্ষেএে বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী কার্যকরী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন বলে সুশীল সমাজ অভিমত ব্যক্ত করেন। বর্তমান সরকার চুক্তি বাস্তবায়নে বদ্ধপরিকর এবং এনিয়ে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির কথা বললেও এতে পার্বত্য চট্রগ্রাম জনসংহতি সমিতি মোটেই সন্তুষ্ট নন। সাম্প্রতিক সময়ে সরকার চুক্তির অধিকাংশ শর্ত বাস্তবায়ন করেছিল এবং এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া বলে উল্লেখ করেছিল। পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ আইন যথাযথভাবে কার্যকর করা এবং এলক্ষ্যে পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ বিধিমালা চূড়ান্ত করে রাঙ্গামাটি,খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান এ তিন পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান-সদস্যদের নির্বাচন বিধিমালা এবং স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা বিধিমালা প্রণয়ন করে পার্বত্য চট্রগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচন সম্পন্ন করার জন্য সরকারের প্রতি আদিবাসী নেতৃবৃন্দ আহবান জানিয়েছিল।। তাছাড়া চুক্তিবিরোধী পক্ষ ইউপিডিএফ(ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট) এর সভাপতি প্রসিত খীসা সাম্প্রতিক সময়ে শান্তি চুক্তিকে ডেথ লেটার হিসেবে অভিহিত করেছিল। পাহাড়ের সাধারণ জনগণের মতে, পাহাড়ে শান্তি বজায় রাখার পূর্বশর্ত হল শান্তিচুক্তির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং পারস্পরিক উদার মানসিকতা নিয়ে হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে শান্তি ও অগ্রগতির পথে এগিয়ে যাওয়া। পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সাধারণ মানুষ আরও অভিমত ব্যক্ত করে বলেন , আগামী প্রজন্মকে দক্ষ মানব সম্পদে পরিণত করতে হলে সকল পক্ষকে নব উদ্যমে সুন্দর মানসিকতায় এগিয়ে যেতে হবে।




