বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শেরপুরে আন্দোলনবিরোধীদের গুলিতে নিহত এইচএসসি পরীক্ষার্থী সবুজ মিয়া জিপিএ-৪.৩৩ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন। শ্রীবরদী উপজেলার খড়িয়াকাজিরচর ইউনিয়নের রূপারপাড়া গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে সবুজ শ্রীবরদী সরকারি কলেজ থেকে মানবিক বিভাগে চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। ১৫ অক্টোবর মঙ্গলবার এইচএসসি ২০২৪ এর প্রকাশিত ফলাফলে সে উত্তীর্ণ হয়। এদিকে সবুজের ফলাফল শুনে নতুন করে শোকাহত হয়ে উঠেছে তার পরিবার, স্বজন, বন্ধু, শিক্ষক ও সহপাঠীরা।

এইচএসসির ফলাফলে নিহত সবুজ মিয়ার উত্তীর্ণ হওয়ার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে শ্রীবরদী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর এ কে এম আলিফ উল্লাহ আহসান জানান, সবুজ একজন মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল। ৬ সদস্যের সংসারের খরচ বহন করে নিজের লেখাপড়া চালিয়ে এই রেজাল্ট করা কম কথা নয়। তার এই রেজাল্টে আমরা শিক্ষকরাসহ তার সহপাঠীরাও আনন্দিত। শুধু তার পরিবার এ আনন্দ নিতে পারছে না ছেলে হারানোর শোকে। আমরা তার শোকাহত অসহায় পরিবারের পাশে আছি এবং ভবিষ্যতেও থাকবো।
শহীদ সবুজের মা সমেজা বেগম বলেন, আমার ছেলে ভালো রেজাল্ট করেছে ঠিকই। কিন্তু এ রেজাল্ট তো আমাদের কোন কাজে আসবে না আমার ছেলে আজ বেঁচে থাকলে রেজাল্টটা নিয়ে আমার কাছে আসতো সবার আগে। সবাইকে খুশিতে মিষ্টি খাওয়াতো। আজ আমার ছেলে না থাকায় সবকিছু অন্ধকার। ছেলে মারা যাওয়ার পর থেকে আমার ঘুম নেই। সারাক্ষণ টেনশনে মাথা ব্যথা করে। তিনি আরও বলেন, এলাকার সবার সঙ্গে সবুজ খুব ভালো ব্যবহার করতো। প্রতিদিন কবিতা লিখে ও আমাকে শোনাতো। এখন আর কেও আমাকে কবিতা শুনায় না। আমার ছেলে পড়াশোনায় খুব ভালো ছিল, ওর কবি হওয়ার ইচ্ছা ছিল। আমার ছেলেকে যারা গুলি করে মারছে তাদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে ফাঁসি দেওয়া হোক।
সবুজের সঙ্গে আন্দোলনে যাওয়া শিক্ষার্থী মমিনুল ইসলাম বলেন, আমরা একসঙ্গে আন্দোলনে যাই আমাদের গ্রাম থেকে। সবুজ দুষ্কৃতিকারীদের গুলিতে মারা যায়। আজ ওর রেজাল্ট হয়েছে, কিন্তু সবুজ বেঁচে নেই। এটা আমার জন্য খুবই কষ্টের। আজ সবুজ বেঁচে থাকলে সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতো। আমার আমাদের গ্রামের একজন মেধাবী ভাই হারিয়েছি। খুব খারাপ লাগছে, এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালে সবুজ মারা গেছে। আমরা সবুজের হত্যাকারীদের বিচার চাই, খুব দ্রুত যাতে সবুজ হত্যার আসামিদের গ্রেফতার করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সবুজের বাবা দীর্ঘদিন যাবত অসুস্থ হয়ে বিছানায় পড়ে আছেন এক বছর ধরে। দরিদ্র পরিবারে জন্ম হওয়ায় পঞ্চম শ্রেণি শেষ করার পর ঢাকায় পাড়ি জমান কাজের সন্ধানে। ঢাকায় কাজের পাশাপাশি পড়ালেখা চালিয়ে যান সবুজ মিয়া। ঢাকা থেকে বাড়ি ফিরে শ্রীবরদী উপজেলার লঙ্গরপাড়ায় একটি ঔষধের দোকানে কাজ করে সংসারের খরচ ও নিজের লেখাপড়া চালিয়ে আসছিলেন সবুজ। তিনি তার ছোট দুই ভাই ও বোনকে লেখাপড়া করাতেন। বাবা অসুস্থ থাকায় সবুজের একার রোজগারে চলতো পুরো পরিবার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে দিশেহারা সবাই।
উল্লেখ্য, গত ৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে শেরপুর শহরের খরমপুর এলাকায় আওয়ামী দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন এইচএসসি পরীক্ষার্থী সবুজ মিয়া। ওই ঘটনায় স্থানীয় সাবেক স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য ছানুয়ার হোসেন ছানু ও জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর রুমানসহ ২৫ জনকে স্বনামে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২শ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়। তবে ওই মামলায় এখনও গ্রেফতার হয়নি প্রধান কোন আসামি।




