আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, আমি জাতির পিতার কন্যা। কারও কাছে মাথা নত করি না, মাথা নত করব না। তিনি বলেন, খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছিল গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে। আমি গ্যাস বিক্রি করতে চাইনি বলে ষড়যন্ত্র করে আমাকে আসতে দেয়নি।

মঙ্গলবার বিকেলে ফরিদপুরের সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ মাঠে আওয়ামী লীগের নির্বাচনী জনসভায় তিনি এসব কথা বলেন। এর আগে মঙ্গলবার বিকেল ৩টা ২০ মিনিটে তিনি মঞ্চে আসন গ্রহণ করেন।
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, আমাদের এখন উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। এই দেশ গড়ে তুলতে হলে কাকে দরকার? আপনারা বলেন। কে ক্ষমতায় থাকলে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ গড়ে উঠবে? একমাত্র নৌকা মার্কা, নৌকা মার্কা যদি ভোট পায়, শুধুমাত্র নৌকা মার্কা ভোট পেলেই আমি সরকারে আসতে পারব। আর উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে গড়তে পারব। বাংলাদেশ কখনো পিছিয়ে যাবে না।

তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু তার জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। তিনি আজীবন সংগ্রাম করে, জেল-জুলুম সহ্য করে এই দেশকে স্বাধীন করেন। এমনকি এই ফরিদপুর জেলেও তিনি বন্দি ছিলেন। দেশ আজ স্বাধীন। জাতির পিতা যে মুহূর্তে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাকে গ্রেপ্তার করে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। এরপর আমরা যখন স্বাধীন হই তখন আন্তর্জাতিক চাপে তাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। ১০ জানুয়ারি তিনি ফিরে এসে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পেয়েছিলেন। রাস্তা-ঘাট নেই, স্কুল কলেজ মসজিদ মন্দির সবই ভাঙা। এই দেশে যুদ্ধকালীন সময়ে কোনো ফসল হয়নি। গোলায় এক ফোঁটা ধান নেই, কারণ পাকিস্তানিরা আগুন দিয়ে গ্রামের পর গ্রাম আগুন দিয়ে ছাড়খাড় করে দিয়েছিল। কোনো কারেন্সি নোট ছিল না, একটা পয়সাও রিজার্ভ মানি ছিল না।
শেখ হাসিনা বলেন, শূন্য হাতে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে জাতির পিতা যাত্রা শুরু করেন। বাংলাদেশের মানুষের মাথাপিছু আয় ছিল মাত্র ৯২ ডলার। ওই অবস্থা থেকে মাত্র ৩ বছর সাত মাসের ব্যবধানে এই বিধ্বস্ত দেশে তিনি রাস্তা-ঘাট, স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, রেল গড়ে তোলেন। দেশ যখন উন্নয়নের দিকে ধাবিত হয় তখন নেমে আসে এক অমানিশার অন্ধকার। ৭৫ এর ১৫ আগস্টে সেই দিন জাতির পিতা শেখ মুজিবসহ আমার পরিবারের অন্য সদস্যদের হত্যা করে ওই খুনিরা। যারা আমাদের স্বাধীনতা চায়নি। সাথে ছিল আমাদের কিছু বেঈমান মোনাফেক। সেদিন আমি ও আমার বোন দেশে না থাকায় প্রাণে বেঁচে যাই। তখন রিফুইজি হিসেবে আমাদেরকে থাকতে হয়েছিল।
তিনি বলেন, ৬ বছর পর ৮১ সালে বাংলাদেশে ফিরে আসার সুযোগ পাই। এই সমগ্র বাংলাদেশ আমি ঘুরে বেড়াই একটাই লক্ষ্য নিয়ে যে, এই বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করব। জাতির পিতা ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে সমুন্নত রেখে এই দেশের উন্নয়ন করব। আপনারা আমাকে নৌকা মার্কায় ভোট দিয়েছেন বলেই আমি সরকার গঠন করতে পেরেছি। ২১ বছর পর ক্ষমতায় আসি। বিদ্যুৎ নাই, পানি নাই, দেশের মানুষের শিক্ষা নাই , চিকিৎসা নাই। প্রথমবার ক্ষমতায় এসেই খাদ্য উৎপাদন, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করি। দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ হয়। ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ থেকে আমরা ৪ হাজার ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করি। স্বাক্ষরতার হার ৪৫ শতাংশ থেকে ৬৫ দশমিক ৫ ভাগে উন্নীত করি। মানুষ স্বস্তিতে বসবাস শুরু করে। আমরা এগিয়ে যাই। কিন্তু সেই সুখও বেশি দিন টেকে নাই। আমরা ৫ বছর ক্ষমতায় ছিলাম। ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপি-জামায়াতের ক্ষমতায় আসা মানে দুর্নীতি, সন্ত্রাস, জঙ্গিবাদ, লুটপাট আর দুঃশাসন। এই দুঃশাসনে দেশ অচল হয়ে যায়। আসে ইমারজেন্সি। যদিও আমি বিরোধী দলে ছিলাম আমাকে আগে গ্রেপ্তার করে। আমি জাতির পিতার কন্যা কারও কাছে মাথা নত করি না, মাথা নত করব না। খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসেছিল গ্যাস বিক্রির মুচলেকা দিয়ে। আমি গ্যাস বিক্রি করতে চাইনি বলেই ষড়যন্ত্র করে আমাকে ক্ষমতায় আসতে দেয়নি।
তিনি বলেন,২০০৮ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগ এককভাবে ২৩৩টা সিটে জয়লাভ করে। আর এই বিএনপি বড় বড় কথা বলে, লম্পঝম্প করে তারা পেয়েছিল মাত্র ৩০টা সিট। যে কারণে তারা ২০১৪ তে নির্বাচন করেনি। ২০১৮ সালের নির্বাচনে মনোনয়ন বাণিজ্য করে নিজেদের মধ্যে গোলমাল করে সরে যায়। আওয়ামী লীগ জনগণের সমর্থন নিয়ে ২০০৯ থেকে শুরু করে ২০২৩ পর্যন্ত ১৫ বছর ক্ষমতায় আছে। আমাদের দেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। আমরা ২০০৮ এর ঘোষণা অনুযায়ী ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তুলেছি। প্রত্যেকটা মানুষের কাছে মোবাইল ফোন পৌঁছে দিয়েছি হাতে হাতে। ওয়াইফাই কানেকশন দিয়ে দিয়েছি, সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে আমরা ব্রডব্যান্ড সংযোগ দিয়েছি। বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট আমরা উৎক্ষেপণ করেছি। আমাদের ছেলেমেয়েদের জন্য প্রত্যেক স্কুলে আমরা কম্পিউটার ল্যাব করে দিচ্ছি, আমাদের যুবকদের জন্য কম্পিউটার ট্রেনিং সেন্টার তৈরি করে সেখানে তাদেরকে আমরা ট্রেনিং দিচ্ছি, লার্নিং অ্যান্ড আর্নিং, শেখো, কাজ করো এবং উপার্জন করো সেই লক্ষ্য নিয়ে। ছয় লাখ ৮৬ জন ফ্রিল্যান্সার দেশে বসে বিদেশের মুদ্রা উপার্জন করছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনার সময় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি, অনলাইনে মিটিং করেছি। দেশের জন্য কাজ করেছি। যাদের জায়গা জমি নেই তাদেরকে আমি ঘর করে দিচ্ছি এমনকি ঢাকায় বস্তিবাসীদেরকে ফ্ল্যাট করে দিচ্ছি। প্রতিবন্ধী,বিধবা, বাবা-স্বামীর সংসারে ঠাই হয়নি এমন নারীদের ভাতা করে দিচ্ছি। কোভিড-১৯ যখন শুরু হয় তখন আমাদের সব কিছুর দাম বেড়ে গেছে। তখন দরিদ্র শ্রেণি যেন অভুক্ত না থাকে সেজন্য আমরা প্রায় ৫ কোটি পারিবারিক কার্ডের মাধ্যমে আমরা তাদের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছি। আমরা বিনা পয়সায় জানুয়ারির ১ তারিখে সমস্ত শিশুর হাতে বই দিয়েছি। প্রত্যেকটা স্কুলেই আমরা পর্যায়ক্রমিকভাবে কম্পিউটার ল্যাব আমরা করে দেব। সেই সাথে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের জন্য ১০৯টি হাইটেক পার্ক আমরা করে দিচ্ছি। সেখানে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ হচ্ছে, আমাদের ছেলে-মেয়েরা কাজ পাচ্ছে।
শেখ হাসিনা বলেন, আমাদের স্বাক্ষরতার হার যেটা আমি ৬৫ দশমিক ৫ এ রেখে গিয়েছিলাম, সেটা ২০০১ এ খালেদা জিয়া ক্ষমতায় এসে কমিয়ে দিয়েছিল। অবশ্য কমিয়ে দেওয়ার কারণ আছে। কারণটা একটু বলতে চাই। একবার মেট্রিক পরীক্ষা দিয়েছিল খালেদা জিয়া। এইট পর্যন্ত পড়েছিল কিন্তু টেনেটুনে মেট্রিক পরীক্ষা দেয়। এই মেট্রিক পরীক্ষায় পাস করেছিল মাত্র দুইটা সাবজেক্টে। একটা হলো উর্দু আরেকটা হল অংক। এই অংক আর উর্দু ছাড়া আর সব কিছুতেই ফেল। অংক ভালো করে শিখেছিল কারণ ভালো করে টাকা গুনতে হয় তো। ক্ষমতায় থেকে দুর্নীতির মেলা টাকা বানানো সহজ। আর উর্দু কেন? কারণ তার মনে সব সময় ওই পাকিস্তান। ‘পেয়ারে পাকিস্তান, হামারা পেয়ার পাকিস্তান।’ এইটাই তার মনে থাকে। খালেদা জিয়ার কথা হচ্ছে সে যখন পাস করে নাই আমাদের ছেলেমেয়ে পাস করবে কেন। আমি স্বাক্ষরতার হার বাড়ালাম ৬৫ দশমিক ৫ ভাগে আর খালেদা জিয়া আবার ক্ষমতায় এসে সেটি ৪৫ ভাগে নামালো। আজকে আমাদের দেশের সাক্ষরতার হার ৭৬ দশমিক ৮। ইনশাআল্লাহ সমস্ত ছেলেমেয়ে আজ স্কুলে যাচ্ছে মেয়েরা স্কুলে যাচ্ছে, শিক্ষক হিসেবে সর্বোচ্চ চাকরি পাচ্ছে। শিক্ষিত জাতি ছাড়া বাংলাদেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করা যাবে না। আর জাতির পিতা বলেছেন শিক্ষা বিনিয়োগ এটা কোনো খরচ নয়।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সব কিছুর উৎপাদন আমরা বাড়িয়েছি ডিম দুধ মাছ মাংস। এক্ষেত্রে আপনাদের কাছে একটা আবেদন থাকবে, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ, স্যাংশন কাউন্টার স্যাংশন, প্রত্যেক জিনিসের দাম বেড়েছে, পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে ২০০ ডলারের যে গম কিনতাম তা ৬০০ ডলারে কিনতে হচ্ছে। গম ভোজ্য তেল, জ্বালানি তেল, এলএমজি, সার সব আনতে হয় আমাদের বিদেশ থেকে। প্রতিটি জিনিসের মূল্যস্ফীতি। এই পরিস্থিতির মধ্যে দেশের মানুষের উন্নয়ন অব্যাহত রাখা, দেশের মানুষের কষ্ট লাগাব করার জন্য আমরা ব্যাপক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করেছি। পাশাপাশি আজকে সারা বিশ্বব্যাপী যেহেতু খাদ্য মন্দা অর্থনৈতিক মন্দা চলছে। আমি আপনাদের কাছে আহ্বান করি কারো কাছে কোনো জমি যেন এক ইঞ্চি জমি যেন অনাবাদি না থাকে। যার যেখানে যতটুকু জমি আছে যে যা পারেন তাই উৎপাদন করেন। পুকুর থাকলে মাছ উৎপাদন করবেন। হাঁস-মুরগি ভেড়া গরু ছাগল যে যা পারেন লালন-পালন করেন। আপনিও লাভবান হবেন, দেশও লাভবান হবে। আমি কিন্তু আমার কাজ শুরু করেছি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখন গণভবন ছোটখাট একটা খামারবাড়ি হয়ে গেছে। সেখানে তরি তরকারি, মধু, আদা, হলুদ, রসুন, পেঁয়াজ, ধান সবই হয়। হাঁস-মুরগি, ছাগল, গরু সবই আছে। আবার লেকে মাছও আছে। মাঝে মাঝে আমি নিজে মাছও ধরি। টুংগিপাড়ায় আমার দাদার জমি, আশপাশের জমি সব জমি আমি পরিষ্কারের ব্যবস্থা করেছি। সেখানে একটি জমিও আর অনাবাদি থাকবে না। কোটালিপাড়ায় করেছি। ফরিদপুরে আপনাদের আহ্বান করব আপনাদের যার যেখানে জমি আছে ১ ইঞ্চি জমিও ফেলে রাখবেন না। যা পারেন উৎপাদন করেন।
শেখ হাসিনা বলেন, আমরা দুর্নীতি করতে আসিনি, নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তন করতে আসিনি, আমরা এসেছি বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে। পদ্মা সেতু নির্মাণের সময় ওয়ার্ল্ড ব্যাংক যখন একটি দুর্নীতির অভিযোগ আনে, আমি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম তারা প্রমাণ করতে পারে নাই।
তিনি আরও বলেন, অনেক ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আছে। যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন দেয়নি, তাদের চক্রান্ত এখনো থেমে যায় নাই। যেহেতু তারা জানে আমরা কারও কাছে মাথা নত করি না, সেজন্য চক্রান্ত আরও বেশি।
এর আগে দুপুর ১টার দিকে কোরআন তেলাওয়াত, গিতা ও বাইবেল পাঠের মাধ্যমে এই সমাবেশ শুরু হয়। এরপর সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সংগীত গাওয়া হয়। নির্বাচনী জনসভাকে কেন্দ্র করে আজ সকাল থেকেই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা আসেন।
ফরিদপুরের বিভিন্ন আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী দলের প্রার্থী, তাদের নেতাকর্মীরা মিছিল করে এই সমাবেশে যোগ দিয়েছেন। সবুজ, খয়েরি, হলুদ, সাদাসহ বিভিন্ন রঙের টি-শার্ট, টুপি পরে মিছিল নিয়ে আসেন দলের নেতাকর্মীরা। সমাবেশ পরিচালনা করেন ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শা মো. ইশতিয়াক আরিফ।




