রেজাউল করিম বকুল, শ্রীবরদী, শেরপুর থেকে : দূর থেকে শোনা যায় গীতের শব্দ। একটু কাছে যেতেই দেখা যায় ছোট ছোট ছেলেমেয়েদের হই হুলুড়। বাড়ি সামনে কলা গাছ দিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে গেইট। আর বুঝতে বাকি রইল না যে এ বাড়িতে বিয়ে হচ্ছে। গেইটের সামনে দাঁড়াতেই ছেলে মেয়েরা আমাদের জিজ্ঞেস করলো- আপনারা কি বর যাত্রীর লোক? এতো তাড়াতাড়ি কেন আইলেন?
ওদের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে বাড়িতে ঢোকে পড়লাম। সবাই প্রথমে মনে করলো আমরা হয়তবা বরের লোক। কিন্তু একটু পড়েই আস্তে আস্তে বের হতে লাগলো আসল ঘটনা। যে মেয়েটির বিয়ে হচ্ছে সে মেয়েটির নাম খোরশেদা খাতুন। বাড়ির লোকজন ওকে খুশি বলে ডাকে। তারা দুই বোন। তিন ভাই। খুশি সবার বড়। তার বাবা খলিল মিয়া একজন দিনমজুর। মা জ্যোøা বেগম গৃহিনী। এটি শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা বাঘহাতা গ্রাম। খুশি ওই গ্রামেরই একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্রী। পড়া লেখায় ভাল থাকায় বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাকে উপবৃত্তি দেয়। স¤প্রতি তার মা বাবা তাকে পার্শ্ববর্তী গ্রামের এক ছেলের কাছে বিয়ে দিবে বলে দিন তারিখ নির্ধারণ করেছিল। এ খবর পেয়ে স্থানীয় ভায়াডাঙ্গা ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচীর পিও আমিনুল ইসলাম এবং এ প্রতিনিধি যান সেখানে।
খুশিকে পিড়িতে বসিয়ে গায়ে হলুদ মাখা হচ্ছে। পাশে কয়েকজন নারী আঞ্চলিক সুরে গীত গাইছেন। যেন সাড়া বাড়িতে সবাই খুবই ব্যস্ত। সূর্য্য অস্ত গেলেই হয়তবা বর আসবে। বিয়ে হবে খুশির। তখন খুশির চোখে মুখে যেন এক বুকফাটা চাপা কান্না। তার দিকে তাকালেই যেন যে কেউ বুঝতে পারবে। এরই মধ্যে কথা হয় খুশির মা জ্যোøা বেগমের সাথে। প্রথমে এ বিয়ে বন্ধ করার জন্য তাকে বলা হয়। কিন্তু তিনি তা মানতে রাজী নন। কারণ হিসেবে বলেছেন সবকিছুই ঠিক। এখন বিয়ে বন্ধ করা সম্ভব না। পরে তাদের কাছ থেকে জন্ম সনদ চাইলে তারা তা দিতে পারেনি। বাল্য বিয়ে বন্ধ না করলে এখানে পুলিশ আসতে পারে। এমন সংবাদ পেয়ে তারা বিয়ে বন্ধ করে দেন।
কিছুক্ষণ পরে সবকিছুই যেন বদলে যায়। তখনই খুশি তার খেলার সাথীদের সাথে খেলতে যায়। পরে তার বাবা খলিল মিয়া বলেন, আমি ভুল বুঝতে পেরেছি। আর ছোড মাইয়ারে বিয়ে দিমু না। আগে ম্যাট্রিক পাশ করামু তার পর বিয়া দিমু।
ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন কর্মসূচীর পিও আমিনুল ইসলাম জানান, এ বিয়ে বন্ধ করা এবং খুশিকে আবার স্কুলে পাঠানোর জন্যে স্থানীয় লোকজন তাকে যথেষ্ট সহযোগিতা করেছে। তিনি বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এখানে এসেছিলাম। প্রথমে তার মাকে বাল্য বিয়ের সুফল ও কুফল সম্পর্কে জানাই। পরে তারা ভুল বুঝতে পারে। স্থানীয় লোকজনও তাদেরকে এ বিয়ে বন্ধ করতে অনুরোধ করেছে। এ জন্য বিয়ে বন্ধ করে খুশিকে আবার স্কুলে দিয়েছেন।




