এস.এম আজিজুল হক, পাবনা : বিধি-নিষেধ অমান্য করে মিল জোন এলাকায় পাওয়ার ক্রাশারে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরী করা শুরু হওয়ায় চিনিকলমূহে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার আশংকা করছেন মিল কর্তৃপক্ষ। চলতি মৌসুমে ১৪টি সরকারী সুগার মিলে চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে, ১ লাখ ৩৫ হাজার ৩শ ৭৫ মে:টন। গত মৌসুমে ১৪ টি মিলে চিনি উৎপাদন হয়েছিল ১ লাখ ৯শ ৬২ দশমিক ৮০ মেট্রিক টন। চিনি আহরণের গড় হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫৪ শতাংশ। যদিও এই হার বিগত বছরগুলোতে পূরণ হয়নি। হয়েছে গড়ে সাড়ে ৬ শতাংশ। এছাড়াও আখ থেকে চিনি আহরণের হার আশঙ্কাজনক মাত্রায় কমে যাওয়ায় চিনি মিল সমূহ প্রতিবছর কোটি কোটি টাকা লোকসান গুণছে। শতকরা চিনি আহরণের পরিমাণ ৭ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে হ্রাস পেয়ে সর্বনিম্নœ ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তাছাড়া আমাদের চিনিকলগুলোতে প্রতি কেজি চিনি উৎপাদনে খরচ হয় ৮২ থেকে ৮৪ টাকা। অথচ বাজারে আমদানিকৃত চিনি বিক্রি হচ্ছে ৪৫ টাকা কেজি দরে। দেশের চিনিকলগুলোতে এই মূল্য তারতম্যের কারণে অবিক্রিত থেকে গেছে প্রায় ৪৯ হাজার মেট্রিক টন চিনি। মিলের গুদাম খালি করা না হলে নতুন চিনি উৎপাদন করে তা রাখার জন্য গুদামে স্থান সংকুলান হবে না।
এছাড়া সরেজমিনে মাঠ পর্যায়ে চাষীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, আখ চাষের চেয়ে অন্যান্য ফসল আবাদ লাভজনক হওয়ায় চাষীরা আখ চাষ থেকে সরে যাচ্ছে। বছরে যেখানে একটি জমি থেকে ৩ টি ফসল পাওয়া যায় সেখানে আখ মেলে একবার। কখনও আখ জমিতেই থেকে যায় ১৩ থেকে ১৪ মাস।
এবার মিল এলাকায় আখের সংকট দেখা যাচ্ছে। গত মৌসুমে উৎপাদিত ৭ হাজার মেট্রিক টন চিনি এখনও গুদামে মজুদ রয়েছে। কুষ্টিয়া সুগার মিলে গত মৌসুমের মতই এবার ৭০ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৭ হাজার মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় পরিমান আখ না পাওয়ায় গত মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় নাই। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের জেনারেল ম্যানেজার মাহবুবুর রহমান জানান, মিল জোন এলাকায় ২৭ হাজার ২শ একর জমিতে আখ আবাদ করা হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে, ৪ লাখ ৬৩ হাজার ৩ শ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে মিলটি চালু ছিল ১শ ৫০ দিন। ২ লাখ ৪৭ হাজার ১শ ৯৪ টন আখ মাড়াই করে ১৫ হাজার ৮ শ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদন করা হয়। আখ আহরনের পরিমাণ ৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। এবারে লক্ষ্যমাত্রা ধার্য হয়েছে, আড়াই লাখ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ১৮ হাজার ৭শ ৫০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের। যদিও চিনি আহরণের এই হার ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ৫০ শতাংশ। ধারণা করা হচ্ছে আখের সংকটে এই লক্ষ্য পূরণ হবে না। এই রিপোর্ট লেখার সময় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে ৫ হাজার ৮শ মেট্রিক টন চিনি অবিক্রিত রয়েছে। নাটোর সুগার মিলের জেনারেল ম্যানেজার আশরাফ হোসেন জানান, গত মৌসুমের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ লাখ ৪০ হাজার মে:টন আখ মাড়াই করে ১০ হাজার ৫’শ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের। আখ মাড়াই হয়েছিল ১ লাখ ৬২ হাজার মে:টন। চিনি পাওয়া গিয়েছিল ১০ হাজার ৭শ মেট্রিক টন। চিনি আহরণের হার ছিল ৬ দশমিক ১ শতাংশ। পাবনা সুগার মিলের জেনারেল ম্যানেজার (প্রশাসন) নূরুল ইসলাম জানান, এ বছর ৭৫ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ২’শ ৫০ মেট্রিক চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত মৌসুমে ৭৫ হাজার ১’শ ৮৮ মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ৬শ’২৫ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদানের লক্ষ্যমাত্রা থাকলেও উৎপাদন হয়েছিলো ৪ হাজার ১শ’৬৮ মেট্রিক টন চিনি। এই মিলে চিনি আহরণের হার সবচেয়ে কম। অর্থাৎ ৫ দশমিক ৫৪ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার কারণ হিসাবে তিনি আখের গুণগত মান এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত আখের সরবরাহ না পাওয়াকে দায়ী করেন। তিনি আরও জানান, শুধু মাত্র গত বছরেই পাবনা সুগার মিল লোকসান গুনেছে ২৫ কোটি টাকা। ১৯৯৮-’৯৯ মাড়াই মৌসুম খেকে গত ১১টি মাড়াই মৌসুমে মিলের লোকসান ছাড়িয়েছে সর্বমোট ১শ’১১ কোটি টাকা। মিল সূত্র জানায়, এবার পাবনা সুগার মিলে ৭৫ হাজার মেট্রিক টন আখ মাড়াই করে ৫ হাজার ২শ ৫০ মেট্রিক টন চিনি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ঠাকুরগাঁ, সেতাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, রাজশাহী, ফরিদপুর ও কুষ্টিয়া সুগার মিলে আখের সংকট এবার পূর্বের বছর গুলোর তুলনায় বেশী হেতু উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে না। পর্যাপ্ত আখ প্রাপ্তির আশায় গতবছর সুগার মিল জোন এলাকার চাষীদের মধ্যে প্রায় ৫২ কোটি টাকা ঋণ বিতরণ করা হয়। এ বছর বিতরণকৃত ঋণের পরিমানও প্রায় ৭৭ কোটি টাকা। ঋণ বিতরণ, কৃষকদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির নানা প্রয়াসের পরেও কাঙ্খিত পরিমাণ আখ না পাওয়ার কারনে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হওয়ার পাশাপাশি মিল লোকসান গুণতে বাধ্য হচ্ছে।
পর্যাপ্ত আখ সরবরাহ না পাওয়ার অন্যতম কারণ হিসাবে মিল সমূহের কর্তৃপক্ষ মিল জোন এলাকায় পাওয়ার ক্রাশারে অবৈধভাবে গুড় উৎপাদনকে দায়ী করেন। তারা জানান, অবৈধভাবে গুড় উৎপাদনকারীরা আখ চাষীদেরকে মিল নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অধিক মূল্য দেয়ায় আখচাষীরা অধিক লাভের আশায় ক্রাশার মালিকদের কাছে আখ বিক্রি করছে। পাবনা জেলার ঈশ্বরদী উপজেলার পুরাতন ঈশ্বরদী, আড়মবাড়ীয়া মূলাডুলী, সাঁড়া গোপালপুর, নারিচা, আড়পাড়া, সাঁড়া, চানমারি সহ পাশ্ববর্তী গ্রামগুলো পাবনা সুগার মিল ও নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল জোনে পড়ে। এসব এলাকার কমপক্ষে ১৫টি গ্রামে প্রতিদিন পাওয়ার ক্রাশারে আখ মাড়াই করে গুড় তৈরী করা হচ্ছে। একই চিত্র বেড়া, সুজানগর ও সাঁথিয়া উপজেলার এবং নাটোরের লালপুর, বাগাতিপাড়া, রাজাপুর, বড়াইগ্রাম, নাটোর সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায়। আলাপকালে এসব পাওয়ার ক্রাশারের মালিক ও কর্মচারীরা মিল গেটে আখের দাম কম পাওয়ায় আখচাষীরা মিলে আখ না দিয়ে এসব পাওয়ার ক্রাশারে সরবরাহ করছে বলে স্বীকারও করে। কৃষকরা জানান, মিল গেটে গত বছর প্রতি মণ আখের মূল্য নির্ধারিত ছিলো ৮৭ টাকা অথচ গুড় তৈরীর জন্য প্রতি মণ আখ তারা ১শ ৪০ থেকে দেড়শো টাকায় বিক্রি করেছেন। চলতি মৌসুমে আখের দাম মিল গেইটে ১শ টাকা এবং ক্রয় কেন্দ্রে ৯৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। গুড় তৈরি কারকদের কাছ থেকে বেশি দাম পাওয়ায় কৃষক রইজ উদ্দিন বলেন, এই কারনেই আখ মিলে বিক্রি না করে গুড়ের কারখানায় বিক্রি করবেন। এর পাশাপাশি মিলে আখ সরবরাহের পর ভোগান্তির কথা জানিয়ে আখচাষী নজরুল ইসলাম, মাহতাব উদ্দিন, আলাউদ্দিন মিয়া। তারা জানান সুগার মিলে আখ বিক্রি করতে নানান সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়, সময় মত পূর্জি (পারমিট বা আখ বিক্রির সিরিয়াল) পাওয়া যায় না আবার বিল পেতেও দেরী হয় এ কারণে অনেক কৃষক নগদ লাভের আশায় গুড় তৈরীতে তাদের আখ বিক্রি করে দেন।




