নানা ভাইয়ের সাথে অভিযান

রনি আর তানিয়া দুই ভাই-বোন। রনি পড়ে পঞ্চম শ্রেণিতে, আর তানিয়া চতুর্থ শ্রেণিতে। গরমের ছুটিতে তারা শেরপুর জেলার ঝিনাইগাতী উপজেলার ঘাগড়া গ্রামে নানার বাড়ি বেড়াতে এসেছে।
একদিন বিকেলে নানাভাই বললেন, “চলো তোমাদের আজ এক অদ্ভুত জায়গায় নিয়ে যাই। সেখানে গেলে তোমরা এক নিমেষেই চারশত বছর আগের ইতিহাসে হারিয়ে যাবে!”

নানাভাইয়ের কথা শুনে রনি আর তানিয়ার চোখ তো ছানাবড়া! তারা উৎসুক হয়ে নানাভাইয়ের সাথে রওনা হলো। কিছু দূর হেঁটে তারা পৌঁছাল একটি প্রাচীন ও চমৎকার মসজিদের সামনে।
আশ্চর্য এক মসজিদ
মসজিদটির সামনে এসে তানিয়া অবাক হয়ে বলল, “নানাভাই, এই মসজিদে তো মাত্র একটা বড় গম্বুজ! আমাদের শহরের মসজিদে তো অনেকগুলো গম্বুজ থাকে।”
নানাভাই হাসলেন। বললেন, “ঠিক ধরেছ দাদুভাই। এটিই হলো ঐতিহাসিক ঘাগড়া লস্কর খান বাড়ি জামে মসজিদ। এটি একটি এক গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন মসজিদ। মোঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর যখন ভারতের শাসনকর্তা ছিলেন, আনুমানিক ১৬০৪ খ্রিস্টাব্দে—অর্থাৎ আজ থেকে ৪১৮ বছরেরও বেশি সময় আগে এটি তৈরি হয়েছিল! আজিমোল্লাহ খান নামের এক দয়ালু মানুষ নিজের ৫৮ শতাংশ জমি দান করে এটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন।”
রনি মসজিদের দেয়াল ছুঁয়ে দেখছিল। সে বলল, “নানাভাই, দেয়ালগুলো এত মোটা কেন? আর এটা কী দিয়ে তৈরি?”
নানাভাই বুঝিয়ে বললেন, “তখনকার দিনে তো আমাদের মতো রড বা সিমেন্ট ছিল না। এই মসজিদের দেয়ালগুলো প্রায় ৪ ফুট পুরু! এগুলো তৈরি হয়েছে চুন, সুরকি আর এক বিশেষ মসলার মিশ্রণে। আর এই প্রাচীন কৌশলের কারণেই এক অদ্ভুত জাদু ঘটে এখানে।”
“কী জাদু, নানাভাই?” তানিয়া চোখ বড় বড় করে জানতে চাইল।
“জাদুটা হলো—বাইরে যতই প্রচণ্ড গরম থাকুক না কেন, এই মসজিদের ভেতরটা সবসময় বেশ শীতল বা ঠান্ডা থাকে। আবার শীতের দিনে বাইরের কনকনে ঠান্ডার মাঝেও এর ভেতরে চমৎকার উষ্ণতা বা ওম পাওয়া যায়।”
হারিয়ে যাওয়া ফলক ও ১২টি মিনার
তারা মসজিদের ভেতরে ঢুকল। ভেতরে মাত্র ৩টি কাতার। নানাভাই জানালেন, ভেতরে ইমাম সাহেব ছাড়া মাত্র ৩০ থেকে ৩২ জন নামাজ পড়তে পারেন। তবে বারান্দাসহ মোট ১৫০ জনের মতো মুসল্লি এখানে একসাথে নামাজ আদায় করতে পারেন।
রনি ওপরের দিকে তাকিয়ে গুনতে শুরু করল, “এক, দুই, তিন… নানাভাই, মূল গম্বুজটার চারপাশে তো ছোট-বড় অনেকগুলো মিনার!”
নানাভাই বললেন, “হ্যাঁ, এখানে মোট ১২টি মিনার আর ভেতরে ২টি সুদৃঢ় খিলান আছে।”
হঠাৎ তানিয়া দরজার ওপরের একটা ফাঁকা জায়গা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল, “নানাভাই, এখানে চারকোনা গর্তের মতো কেন? এখানে কি কিছু ছিল?”
নানাভাইয়ের মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “এখানে একটা ঐতিহাসিক কষ্টিপাথরের ফলক ছিল। তাতে আরবি ভাষায় হিজরি ১২ব্য (১৮০৮ খ্রিস্টাব্দ) লেখা ছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, ২০২৩ সালে সেটি চুরি হয়ে যায়। আমাদের দেশের এমন প্রাচীন সম্পদগুলো আমাদেরই পাহারা দিয়ে টিকিয়ে রাখতে হবে। তবে সুখের কথা হলো, ১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই প্রাচীন মসজিদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব নিয়েছে, যাতে আমাদের এই ইতিহাস হারিয়ে না যায়।”
বাড়ি ফেরার পালা
সূর্য ডুবু ডুবু। মসজিদ থেকে মাগরিবের আজানের মিষ্টি সুর ভেসে এল। রনি আর তানিয়া নানাভাইয়ের হাত ধরে বাড়ির পথ ধরল।
আজ তারা শুধু একটা নতুন জায়গা দেখেনি, বরং জেনেছে কীভাবে প্রাচীনকালের মানুষ বিজ্ঞান আর স্থাপত্যশৈলী ব্যবহার করে চমৎকার সব কীর্তি গড়ে তুলেছিল। রনি মনে মনে ঠিক করল, স্কুলে গিয়েই সে তার বন্ধুদের এই চারশত বছরের পুরোনো শীতল মসজিদের গল্প শোনাবে।
গল্প থেকে আমরা কী শিখলাম?
- ইতিহাসের জ্ঞান: আমাদের দেশেই শত শত বছরের পুরোনো মোঘল আমলের ঐতিহ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
- প্রাচীন বিজ্ঞান: প্রাচীনকালে চুন-সুরকির মোটা দেয়াল ব্যবহার করে প্রাকৃতিকভাবে ঘর ঠান্ডা বা গরম রাখার কৌশল জানা ছিল।
- সম্পদ রক্ষা: দেশের প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো আমাদের জাতীয় সম্পদ। এগুলোকে যত্ন করা এবং চুরি বা নষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করা আমাদের সবার দায়িত্ব।
গল্পকার: শিক্ষক ও শিশুসাহিত্যিক।
শিক্ষা–পরিকল্পনা: চতুর্থ-পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের উপযোগী করে ঘাগড়া লস্কর খান বাড়ি জামে মসজিদের পটভূমিতে এই শিক্ষামূলক গল্পটি লেখা হয়েছে।




