হাদিউল ইসলাম নব্বই দশকের আধুনিক কবিতার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। তিনি ক্রমাগত কবিতায় নিজস্ব স্বর নির্মাণের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘ধুলোকালস্রোত’ প্রকাশিত হয় ২০০৪ সালে। দীর্ঘ ১৫ বছর পর ২০১৯ সালে প্রকাশিত হয় তার দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘আগুনের শিরদাঁড়া’। ২০২৪ সালে প্রকাশিত হয় তার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘মধু ও মৌমাছির গান’।

জন্যগতভাবে প্রতিটি মানুষই কবি। আর কবি মাত্রই কবিতার দাস। তার কবিতায় ব্যক্তি কবির তুমুল স্ফূরণ ঘটেছে। এ প্রসঙ্গে ‘মধু ও মৌমাছির গান’ কবিতার কথা উল্লেখ করা যায়।
তীব্রতর রোদে ম্রিয়মাণ গোলাপের ছায়া আর
মরে যাওয়া হাসি ও মৌমাছির—
বিব্রত কঙ্কাল নিয়ে কবিতা লিখছি আমি।
কর্মদোষে উচ্চতর সকল ব্যঞ্জনা পৃথিবীর মতো
গোল হয়ে কেবল গড়িয়ে যাচ্ছে খাদে,
খোলা আকাশের তলে তখনো ঘাসের ঠোঁট
ধরে আছে হাসি
আর মৃত হাসিদের গাঁয়ে আমি স্বপ্ন অবমুক্ত করে—
চলেছি সরিয়ে শবাধার,
জঘন্য জীবন থেকে ফের নিংড়ে বার করছি—
মধু ও মৌমাছির গান।

তার কবিতা যেন দরদে মোড়ানো স্মৃতির ভাস্কর্য। ‘ভালোবেসে কেঁদেছে রুমাল’ কবিতাটি এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ।
ভালোবেসে কেঁদেছে রুমাল
বসন্ত প্রহর পুষ্পগন্ধের চাবুকে
এতো যে লিখেছে দৈবধূলিঝড়
হাওয়া থেকে খসে গেছে বিহ্বল পুঁথির
ঘুণে ধরা তাবৎ অক্ষর
ভালোবেসে কেঁদেছে রুমাল
ধূ-ধূ চরের শূন্যতা জুড়ে আঁকা
একাকী সবুজ গাছ ঢালে অক্সিজেন
গায়ে তার লবনের ঘ্রাণ
রুমাল পেয়েছে সাগরের স্বাদ
তার কবিতা সাবলীল, গীতিময় ও ছন্দোদ্ভাসিত। শব্দ ও চিত্রকল্পের শক্তিতে ভরপুর। ‘মাঠ’ কবিতাটি এর উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
প্রলুব্ধ তাকিয়ে আছি চাঁদ
মাঠ ভেসে যাচ্ছে তোমার লাবণ্যে
একপাল অকাট্য শিয়াল মাঠময় হল্লা করে
ফিরে যাচ্ছে যার যার ইচ্ছের বিবরে
চরাচর আমুদে আহ্লাদে রাধা
ঢলে পড়ছে সখী পত্র-পল্লবের গায়ে
হাসনাহেনা ও কামিনীর গন্ধ সম্মেলনে
আমিই ইঁদুর, আমিই বেড়াল
মাঠে পড়ে আছে কালচে রক্ত বিগত দিনের
কবি নির্জনতা ও একাকিত্ব প্রিয়। নির্জনতার ভেতর এক অদ্ভুত সৌন্দর্য আছে। ‘কোথায় দাঁড়ালে’ কবিতায় ধরা পড়েছে তার একাকিত্ব।
আমি ভাংতে ভাংতে রোদ্দুরের শুকনো ফেনা
অথবা অদৃশ্য চুলার আগুনে জলধর্মে লীন
মনের মুকুরে ও এ্যাকুরিয়ামে খেলা করা মীন
অথবা বিজন বনে অপলক একাকী হরিণ
আমি রোদ্দুরে দাঁড়ালে; জোছনা
বাতাসে দাঁড়ালে; সুগন্ধ রুমাল
দিবসে দাঁড়ালে; ঘুড়ি, ঝর্ণায় দাঁড়ালে; নুড়ি
রাত্রিবেলা মায়া, গুবাক তরুর বটবৃক্ষ ছায়া
ছায়ার ভেতরে মাত্রাবৃত্তে লেখো, থাকে অন্ত্যমিল
চারিদিকে জোনাকির অদম্য মিছিল
হাদিউল ইসলাম কবিতার ভেতর দিয়ে জীবন বাসনার উপাদানগুলো নিবিড়ভাবে স্পর্শ করেছেন। কবিতাপ্রেমী পাঠকের বুকের গভীরে বাজে তার কবিতার প্রতিধ্বনি। যেখানে থরে থরে সাজানো আছে প্রেম, বিরহ আর জীবনসংগ্রামের কাহিনী।
হাদিউল ইসলামের জন্ম ১৯৭৪ সালের ১৫ জানুয়ারি শেরপুর জেলার শ্রীবরদী উপজেলার মাটিয়াকুড়া গ্রামে। তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত।
লেখক : আরিফ হাসান : কবি ও সমালোচক।




