সম্প্রতি পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় বন-১ অধিশাখা থেকে এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ঘোষণা করা হয়, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, এই প্রজাতির গাছের চারার পরিবর্তে দেশীয় ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করতে হবে। সরকারি নির্দেশ অনুসারে এখন থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার পূরণে সরকারি, বেসরকারি সংস্থা ও ব্যক্তি পর্যায়ে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে এ ধরনের আগ্রাসী গাছ রোপণ না করতে বলা হয়।
কারণ হিসেবে বলা হয়, ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ মাটি থেকে অধিক পানি শোষণ করে। এর ফলে মাটির আর্দ্রতা কমে যায়। এদের পাতায় এক ধরনের টক্সিন থাকে। এটি মাটিকে বিষাক্ত করে। অন্যান্য গাছ এদের গোড়ায় জন্মাতে পারে না। এ জন্য স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের জন্য হুমকিস্বরূপ এসব আগ্রাসী গাছের চারা রোপণ, উত্তোলন ও বিক্রয় নিষিদ্ধ করা হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে বেশ ভালো করেই আভাস দেওয়া হয়েছে কেন এই দুটি গাছ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এই গাছ দুটি সম্পর্কে আমরা পরিচিতও বটে। এখন বলতে গেলে বেশিই পরিচিত।

কিন্তু এমন প্রশ্ন উঠতেই পারে, কী এমন ক্ষতি করে যে সরকারকে এই গাছ দুটি নিষিদ্ধ করতে হলো? এসব জানার আগে আসুন আগে জেনে নিই এই গাছ দুটির পরিচয়। ইউক্যালিপটাস মূলত গাছের গণের নাম। এরা অস্ট্রেলিয়ার গাছ হিসেবেই পরিচিত। কাঠের জন্য এর বেশ চাহিদা রয়েছে। এর প্রজাতি রয়েছে ৭০০টি।
অস্ট্রেলিয়ার গাছ নামে পরিচিত থাকলেও এটি এখন সব মহাদেশেই পাওয়া যায়। আর আকাশমণি বা একাশিয়া। এটি ফ্যাবাসি পরিবারের অন্তর্ভুক্ত একটি গাছ। এরাও দ্রুত বর্ধনশীল। এরাও অস্ট্রেলিয়ার গাছ। ইন্দোনেশিয়া ও পাপুয়া নিউগিনিতেও এরা স্থানীয় প্রজাতি হিসেবে পরিচিত। এই গাছ ৩০ মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে।
এলিয়েন স্পেসিস হলো একটি বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশকারী নতুন প্রজাতি। স্থানীয় বিভিন্ন প্রজাতি ধ্বংসের মুখে পড়ে এসব এলিয়েন স্পেসিসের কারণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো প্রজাতি বিলুপ্ত হওয়ার কারণের মধ্যে একটি হলো সেই এলাকায় এলিয়েন স্পেসিস বা প্রজাতির প্রবেশ। যেসব প্রজাতি ভিন্ন বা নতুন বাস্তুতন্ত্রে প্রবেশ করে স্থানীয় প্রজাতির জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়, তাদের আগ্রাসী এলিয়েন স্পেসিস বলে। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, পাইন গাছ বাংলাদেশে এলিয়েন স্পেসিস হিসেবে গণ্য। ইউক্যালিপটাস, আকাশমণি, পাইন এসব বিদেশি গাছ প্রবেশ করে বাংলাদেশে আশির দশকে। এসব গাছের চারা বিনামূল্যেও বিতরণ করা হতো সে সময়। পরে অবশ্য ২০০৮ সালে প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে এর চারা উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। বন বিভাগও এর উৎপাদন বন্ধ করে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বিভিন্ন প্রকল্পে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছ লাগানো হয়।

আমাদের দেশে ইউক্যালিপটাস জনপ্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ হলো, এটি দ্রুত বাড়ে। খুব একটা যত্ন করতে হয় না। চারা রোপণ করলে গরু-ছাগল এসবের পাতা খায় না। চাষ করতে খুব একটা বেগ পেতে হয় না। এসব গাছ মাটি থেকে বেশি পরিমাণে পুষ্টি ও পানি শোষণ করে। ইউক্যালিপটাসগাছ আশপাশের প্রায় ১০ ফুট এলাকার ও ভূগর্ভের প্রায় ৫০ ফুট নিচের পানি শোষণ করতে পারে। এরা দিনরাত ২৪ ঘণ্টাই পানি শোষণ করতে পারে। ফলে মাটি শুষ্ক থাকে। শুষ্ক মাটিতে খনিজ উপাদান আয়ন অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসে। ফলে দেশীয় প্রজাতির গাছ বাঁচতে পারে না। কেননা খণিজ উপাদান উদ্ভিদ শোষণ করে আয়ন আকারে। ফলে এর আশপাশের স্থানীয় জাতের গাছ এদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। দেখা গেছে, এই ধরনের গাছের নিচে ঘাস বা অন্য কোনো লতাজাতীয় গাছ থাকে না। এই ধরনের বিদেশি গাছ দ্রুত বর্ধনশীল হওয়ায় জ্বালানিতে অবদান রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বিদেশি গাছের সঙ্গে দেশি গাছ প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না। এমনকি এদের বংশবৃদ্ধিও বন্ধ হয়ে যায়। উপকারী কীটপতঙ্গ মারা পড়ে। এর ফলে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের একটি দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি হচ্ছে। ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণির ক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় দেখা যায়, এসব গাছে কোনো পাখি বাসা বাঁধে না। এমনকি এর নিচে যেমন বিশ্রাম নেওয়া যায় না, তেমনি এর কাণ্ড-পাতায় কোনো অণুজীবও জন্মায় না।
একটি গবেষণা তথ্য অনুযায়ী, ইউক্যালিপটাসগাছ রোপণের ফলে মাটির উর্বরতা ১৫ শতাংশ কমে যায়। এরা মাটির পানি দ্রুত শুষে নেয়। বাষ্পীভবনের হার বেশি হয়। আমাদের দেশের ৯২ শতাংশ মানুষ এর ক্ষতিকর প্রভাব সম্পর্কে অবগত নয়। একটি তথ্য মতে, ইথিওপিয়ায় ভুট্টাক্ষেতের পাশে ইউক্যালিপটাসগাছ রোপণের ফলে হেক্টরপ্রতি ফলন ৪.৯ থেকে ১৩.৫ টন হ্রাস পায়। পাকিস্তানের একটি গ্রামে ১৯৯৫ সালে ইউক্যালিপটাসগাছ রোপণ করা হয়। ২০০০ সালে সেই গ্রামের পানির স্তর ২ ইঞ্চি কমে যায়। ইউক্যালিপটাসের ক্ষতি বুঝতে পেরে কেনিয়ায় এর রোপণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি উভয় প্রজাতিরই পরিবেশের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব রয়েছে। আকাশমণি মাটিতে থাকা পুষ্টির প্রবাহ পরিবর্তন করে দেয়। এতে অন্য উদ্ভিদ ও প্রাণীর ওপর এর প্রভাব পড়ে। এরা মাটির গুণাগুণ নষ্ট করে দেয়। এর ফলে মাটির আর্দ্রতার স্তর যেমন নিচে নেমে যায়, তেমনি পুষ্টির প্রাপ্যতাও কমে যায়। এতে ধীরে ধীরে স্থানীয় উদ্ভিদ প্রজাতি হারিয়ে যেতে থাকে। এসব উদ্ভিদ প্রজাতির ওপর নির্ভরশীল অন্যান্য প্রাণীও হারিয়ে যেতে থাকে। এসব উদ্ভিদের কারণে বনে আগুন লাগার প্রবণতাও বেড়ে যায়। কেননা এ ধরনের উদ্ভিদ অত্যন্ত দাহ্য প্রকৃতির হয়।
ইউক্যালিপটাস ও একাশিয়া বা আকাশমণি উভয় প্রজাতিই স্থানীয় প্রজাতির জন্য হুমকিস্বরূপ। এরা বাস্তুতন্ত্রের কাঠামো ভেঙে দেয়। মাটিতে থাকা খণিজ উপাদান নষ্ট করে জীববৈচিত্র্য হ্রাস করে। এমনকি এসব গাছ কেটে ফেললেও মাটির উর্বরতা ফিরতে দীর্ঘ সময় লাগে। তাই এই দুই আগ্রাসী উদ্ভিদের নিষিদ্ধকরণ সরকারের অত্যন্ত যৌক্তিক ও সুচিন্তিত পদক্ষেপ বলে বিবেচিত হবে।
লেখক : শিক্ষক ও গবেষক, শেরপুর।




