এবারের একুশে বইমেলায় কবি রফিকুল ইসলাম আধারের প্রকাশিত ‘ছড়ায় ছন্দে রংধনু’ একটি মনোমুগ্ধকর কবিতার সংকলন, যেখানে মোট ৬৪টি কবিতা সংযোজিত হয়েছে। এই গ্রন্থের প্রতিটি কবিতা ছন্দ, শব্দ ও ভাবের অপূর্ব মেলবন্ধন সৃষ্টি করে, যা পাঠককে এক নতুন অনুভূতির জগতে নিয়ে যায়। কবিতাগুলোতে জীবনের নানা রঙ, অনুভূতি ও সৌন্দর্য ফুটে উঠেছে, যেন এক রঙধনুর আলোকচ্ছটা ছড়িয়ে দিয়েছে পাঠকের হৃদয়ে। এই বই শুধু কাব্যপ্রেমীদের জন্য নয়, বরং যে কোনো পাঠকের মনকে আনন্দ ও ভাবনার জগতে প্রবাহিত করবে।
এ গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘মানুষ, মনুষ্যত্ব ও মৃত্যু’ আমাদের সমাজের জন্য বেশ প্রণিধানযোগ্য।

‘মানুষের চেয়ে বেশি মৃত্যু হয় মনুষ্যত্বের
জগতের স্বার্থ লোভের তাড়না এমন খেলায়
মানুষের মৃত্যু মিনিটে হলে
মনুষ্যত্বের মৃত্যু সেকেন্ডে গড়ায়।
কারও মৃত্যুতে বা মৃত্যু ভয়ে স্বভাবতই কাঁদে মানুষ
এ যেন তার সহজাত,
অথচ মনুষ্যত্বের মৃত্যুতে কাঁদে না মানুষ
যদিও বিরূপ প্রভাবে খোদ সমাজ হয় ভুপাত।’
এই কবিতাটি মানুষের নৈতিক অবক্ষয়, লোভ এবং সমাজে মনুষ্যত্বের ক্রমশ ক্ষয়ের গভীর প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। কবিতাটির বিশ্লেষণ নিম্নরূপ—
প্রথম স্তবক বিশ্লেষণ:
‘মানুষের চেয়ে বেশি মৃত্যু হয় মনুষ্যত্বের…’। এখানে কবি একটি দুঃখজনক সত্য উন্মোচন করেছেন। মানুষ শারীরিকভাবে মারা যাওয়ার আগেই তার ভেতরের মানবিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যায়। সমাজের স্বার্থপরতা, লোভ, ক্ষমতালিপ্সা, ও অর্থের মোহে মানুষ নিজের মনুষ্যত্ব বিসর্জন দেয়। বিশেষ করে, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এবং স্বার্থের সংঘাতে মনুষ্যত্বের মৃত্যু ঘটে, যা সমাজকে আরও সংকটের দিকে ঠেলে দেয়।
‘মানুষের মৃত্যু মিনিটে হলে মনুষ্যত্বের মৃত্যু সেকেন্ডে গড়ায়।’ এটি একটি তীব্র প্রতিবাদী উক্তি, যেখানে কবি বোঝাতে চেয়েছেন যে, মানুষ মরে গেলে তার অস্তিত্ব শেষ হয়, কিন্তু সমাজের স্বার্থান্বেষী নীতির কারণে মনুষ্যত্ব এত দ্রুত বিলুপ্ত হয় যে তা সেকেন্ডের মধ্যে ঘটে যেতে পারে। সমাজে অশুভ শক্তি যখন প্রবল হয়, তখন একের পর এক নৈতিকতার মৃত্যু ঘটে, এবং তা এতটাই দ্রুত যে আমরা টেরও পাই না।
দ্বিতীয় স্তবক বিশ্লেষণ:
‘কারও মৃত্যুতে বা মৃত্যু ভয়ে স্বভাবতই কাঁদে মানুষ- এ যেন তার সহজাত,’- প্রাকৃতিকভাবে, মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায় এবং প্রিয়জনের মৃত্যুতে শোকগ্রস্ত হয়। এটি মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু এখানে কবি যে বৈপরীত্যটি দেখিয়েছেন, তা আরও গভীর—
‘অথচ মনুষ্যত্বের মৃত্যুতে কাঁদেনা মানুষ যদিও বিরূপ প্রভাবে খোদ সমাজ হয় ভুপাত।’
কবি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন আমরা শারীরিক মৃত্যুর জন্য কাঁদি, অথচ নৈতিকতার মৃত্যুতে নির্বিকার থাকি? এক ব্যক্তির মৃত্যুতে শোক পালন করা সহজ, কিন্তু যখন পুরো সমাজের মানবিকতা ধ্বংস হয়ে যায়, তখন কেউ কাঁদে না, প্রতিরোধ করে না। অথচ এই অবক্ষয়ের প্রভাব গোটা সমাজের ওপর পড়ে, সমাজ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়।
সমগ্র কবিতার সারাংশ ও বার্তা:
কবিতাটি আমাদের সমাজের বাস্তব অবস্থা প্রতিফলিত করে। কবি দেখিয়েছেন, আজকের সমাজে মানুষ নিজের স্বার্থে অন্যকে ঠকাতে, নৈতিকতা বিসর্জন দিতে এবং ক্ষমতার লোভে অসৎ পথে যেতে দ্বিধা করে না। মানুষের প্রকৃত মৃত্যুর চেয়ে, মনুষ্যত্বের মৃত্যুই বেশি ভয়ংকর, কারণ এটি একধরনের সামাজিক মহামারীর মতো যা ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে ধ্বংস করে দেয়।
এই কবিতা আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার আহ্বান জানায়— আমরা কি শুধু মানুষের শারীরিক মৃত্যুকেই গুরুত্ব দেব, নাকি নৈতিকতার মৃত্যু নিয়েও ভাববো? কবির বক্তব্য আমাদের মনে গভীর দাগ কাটে এবং সমাজের অবক্ষয় নিয়ে নতুন করে চিন্তা করতে বাধ্য করে।
লেখক : কবি ও বিশ্লেষক, নালিতাবাড়ী, শেরপুর।




