শেরপুরের নকলায় পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের চেয়ার নিয়ে চাচি ও ভাতিজার টানাটানিতে শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ায় বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা ২৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বেলা ১টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ৪ ঘন্টা বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে তালা ঝুলিয়ে সকল শিক্ষক ও কর্মচারীদের অবরুদ্ধ করে রাখে। শিক্ষার্থীদের দাবি, বিদ্যালয়ে একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের ব্যবস্থা করে তাঁদের লেখাপড়া করার সুশৃঙ্খল পরিবেশ দিতে হবে। নচেৎ সকল শিক্ষার্থীদের টিসি দিয়ে বিদায় দিতে হবে। ওইসময় শিক্ষার্থীদের হাতে টিসি’র জন্য ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বরাবরে লিখা আবেদনপত্র দেখা গেছে।

খবর পেয়ে বেলা ৪টার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বিদ্যালয়ের এ্যাডহক কমিটির আহবায়ক দীপ জন মিত্র উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আব্দুর রশিদ এবং নকলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হাবিবুর রহমানকে সাথে নিয়ে বিদ্যালয়ে ছুটে যান। পরে ইউএনও বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ২ দিনের মধ্যে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিলে শিক্ষার্থীরা অফিসকক্ষের তালা খুলে দেয় এবং শিক্ষক ও কর্মচারীরা অফিসকক্ষ থেকে বেরিয়ে আসেন।
২৫ ফেব্রুয়ারি মঙ্গলবার বেলা ১টায় টালকী ইউনিয়নের ইসলাম নগর সাইলামপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজে ওই ঘটনা ঘটে। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে দাবীদারগণ হলেন সহকারি প্রধান শিক্ষক সালমা আক্তার ও সহকারি গ্রন্থাগারিক পদে নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষক সেলিম আহমেদ রুবেল। সেলিম আহমেদ রুবেল সালমার আক্তারের স্বামী নুরুল হকের আপন ভাতিজা। ঘটনার সময় সালমা আক্তার বিদ্যালয়ের অফিসকক্ষে থাকলেও সেলিম আহমেদ রুবেলকে খুঁজে পাওয়া যায়নি।

উপজেলা প্রশাসন, বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরাসহ স্থানীয় সূত্রে জানা যায় ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল থেকে ইসলাম নগর সাইলামপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের সহকারি প্রধান শিক্ষক সালমা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন। কিন্তু রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিদ্যালয়ের সাবেক ব্যবস্থাপনা কমিটি বিদ্যালয়ের সহকারি গ্রন্থাগারিক সেলিম আহমেদ রুবেলকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে গত বছরের ১৫ আগস্ট নিয়োগ দেয়। খোঁজ নিয়ে জানা যায় সালমা আক্তার সেলিম আহমেদ রুবেলের আপন চাচি। কিন্তু এই নিয়োগের পর থেকে তাঁদের মধ্যে চরম বিরোধ দেখা দেয়। এমনকি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে উভয়ের মধ্যে মামলা মোকদ্দমাও রয়েছে। এসব কারণে কয়েক মাস ধরে বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন ভাতার জটিলতাসহ শিক্ষার্থীদের পাঠদান ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি ময়মনসিংহ মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক ড. মো. দিদারুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সালমা আক্তারকে সাময়িক বরখাস্ত সংক্রান্ত আবেদন ও হাইকোর্টের রিটের আদেশ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে সহকারি প্রধান শিক্ষক সালমা আক্তারকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে পুন:বহালের নির্দেশসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়।
চলমান অচলাবস্থার প্রেক্ষাপটে দুই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দ্বন্দ্ব নিরসনসহ বিদ্যালয়ে সুশৃঙ্খল পরিবেশ বজায় রাখার দাবিতে শিক্ষার্থীরা মঙ্গলবার বেলা ১টার দিকে বিদ্যালয়ের অফিস কক্ষে তালা ঝুলিয়ে দেয়। এ সময় বিদ্যালয়ে অবস্থানরত ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দাবিদার সালমা আক্তারসহ শিক্ষক-কর্মচারীরা অফিসকক্ষে আটকা পড়েন। শিক্ষকদের আটকে রেখে বিদ্যালয়ের মাঠে শিক্ষার্থীরা অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ করে বিভিন্ন স্লোগান দেয়। এ সময় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের আরেক দাবিদার সেলিম আহমেদকে শিক্ষার্থীরা স্কুলে এসে বিষয়টি সমাধানের কথা বললেও তিনি বিদ্যালয়ে আসেননি।
১০ম শ্রেণির শিক্ষার্থী নাফিস আল বারি, শাহাদত ইসলাম সাকিব, ফারিহা আক্তার মীমসহ অনেকেই জানান, সালমা আক্তার দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সালমা আক্তারের সাথে সহকারি গ্রন্থাগারিক সেলিম আহমেদ রুবেলের পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে সেলিম আহমেদ রুবেল কয়েক মাস ধরে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাবি করে সালমা আক্তারের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছেন। এতে করে বিদ্যালয়ে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। লেখাপড়া হচ্ছেনা। আমরা কোন অনুষ্ঠানে অংশ গ্রহণ করতে পারছিনা। বিজ্ঞান মেলা ও বিতর্ক প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারছিনা। বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা যখন খুশি বিদ্যালয়ে আসেন। আবার যখন খুশি বিদ্যালয় থেকে চলে যান। আমাদেরকে টিসি দেওয়া হউক। আমরা টিসি নিয়ে অন্য বিদ্যালয়ে চলে যেতে চাই।
স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন ও সেলিম আজাদ জানান, বেশ কিছুদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দাবীদার দু’জন শিক্ষকের মধ্যে সৃষ্ট উত্তেজনার কারণে বিদ্যালয়ে লেখাপড়াসহ স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বিষযটি নিয়ে আমরা খুব হতাশার মধ্যে আছি।
বিদ্যালয়ের সহকারি শিক্ষক আলমগীর কবির জানান, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের পদ নিয়ে সালমা আক্তার ও সেলিম আহমেদ রুবেলের মধ্যে দ্বন্দ্বের কারণে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতনভাতা বন্ধ রয়েছে। এতে করে তাঁরা পরিবারপরিজন নিযে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
সালমা আক্তার জানান, বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তারের অবসরজনিত কারণে ২০২২ সালের ৫ এপ্রিল থেকে তিনি পদাধিকার বলে বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন। কিন্তু সহকারি গ্রন্থাগারিক সেলিম আহমেদ রুবেল বিধি বহির্ভূতভাবে নিজেকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দাবি করে বিদ্যালয়ের কাজে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করছেন।
এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য সহকারি গ্রন্থাগারিক সেলিম আহমেদ রুবেলের মুঠোফোনে বারবার চেষ্টা করেও তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আব্দুর রশিদ জনান, সহকারি প্রধান শিক্ষক সালমা আক্তারকে নিয়ম বহির্ভূতভাবে বরখাস্ত করা হয়েছিল। আমি ও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা একটি তদন্ত রিপোর্ট দিয়েছি। যেখানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে সালমা আক্তার বৈধ। শিক্ষা বোর্ড সালমা আক্তারকে স্বপদে বহাল রাখার যে চিঠি দিয়েছে সেটার সত্যতাও মিলেছে এবং উচ্চ আদালতেরও একটি আদেশ রয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দীপ জন মিত্র জানান, একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক না থাকাকালীন একজন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক কাজ করার কথা। এটি নিয়ে কয়েকজন টানাহেঁচড়া করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ বিনষ্ট করা কোনভাবেই কাম্য হতে পারে না। আমি খুব শীঘ্রই এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব বলে শিক্ষার্থীদের জানিয়েছি।




