বারোটি চান্দ্রমাসের মধ্যে রহমত, মাগফিরাত ও নাজাতের মাস পবিত্র মাহে রমযান স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত। হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী, এ মাসে জান্নাতের দ্বারসমূহ খোলে দেওয়া হয় এবং দোযখের দ্বারসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। তাছাড়া অভিশপ্ত শয়তানকে এ মাসে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখা হয়। প্রতিটি মুমীন-মুসলিমের নিকট এ পবিত্র মাসটি অত্যন্ত তাৎপর্যবহ।
আর পবিত্র রমযানুল কারিমের শেষ শুক্রবার মুসলিম উম্মাহ্র নিকট দিনটি ‘জুমআতুল বিদা’ নামে পরিচিত। প্রতিবছর বিশ্ব মুসলিমরা ইবাদত বন্দেগি ও যিকির-আযকারের মাধ্যমে দিবসটি পালন করে মহান আল্লাহ্র দরবারে ক্ষমা ও রহমত কামনা করে থাকেন।
মুসলিম উম্মাহ্র নিকট মাহে রমযানের প্রতিটি দিনই পবিত্র ও মহিমামণ্ডিত। আর শুক্রবার তথা জুমআর দিনটি সাপ্তাহিক ইবাদতের দিন এবং গরিবের ঈদ হিসেবে গণ্য। এ দিনের ফযিলত এমনিতেই বেশি। আর সেটা যখন রমযানের শেষ দশকে তথা জুমআতুল বিদা হয়, তখন রোযাদারসহ মুসলিম উম্মাহ্র প্রত্যেকের কাছেই তা বিশেষভাবে সম্মানিত, মহিমাময় এবং পবিত্রতম বলে প্রতিয়মান হয়।

ইসলামের প্রাথমিক যুগেও জুমআর প্রচলন ছিল। সে সময় জুমআর দিনকে ‘ইয়াওমে আরুবা’ বলা হতো। যা ইয়াহুদি, খ্রিস্টান তথা জাহেলি সম্প্রদায়ের লোকেরা পালন করতো। তারা জুমআর দিনে গল্প-গুজব, হাসি-ঠাট্টা, আমোদ-প্রমোদের আসর বসাতো। এই ছিল তাদের জুমআর সংস্কৃতি।
‘জুমআ’ শব্দটি আরবি, যার অর্থ হচ্ছে- একত্রিত হওয়া, দলবদ্ধ হওয়া, সমবেত হওয়া ইত্যাদি। পবিত্র কুরআনুল কারিমে এই দিনটিকে ‘ইয়াওমুল জুমআ’ নামে নামকরণ করা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) মদিনায় হিজরতের পর এই দিনটিকে জুমআর দিন নামকরণ করেছেন এবং মদিনায় যাওয়ার পথে কুবা নামক স্থানে জুমআর নামায আদায় করেছিলেন। পবিত্র জুমআর দিনটি সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোর মধ্যে অধিক ফযিলতপূর্ণ। আর রমযান মাসের শেষ জুমআর নামাযের আলাদা ফযিলত ও মর্যাদা তো রয়েছেই।
পবিত্র কুরআনুল কারিমে জুমআর নামায আদায়ের নির্দেশ প্রদান করে আল্লাহ্ তাআলা ইরশাদ করেন, ‘হে মুমিনগণ! জুমআর দিনে যখন নামাযের জন্য আহ্বান করা হয়, তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর। এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয়, যদি তোমরা উপলব্ধি কর। (সূরা আল জুমুআ: ৯)
জুমআর নামায সম্পর্কে হযরত সামুরাহ্ (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা জুমআর নামাযে উপস্থিত হও এবং ইমামের নিকটবর্তী হয়ে দাঁড়াও। কেননা যে ব্যক্তি জুমআর নামাযে সবার পিছনে উপস্থিত হবে জান্নাতে প্রবেশের ক্ষেত্রেও সে সবার পিছনেই পড়ে থাকবে। (মুসনাদে আহমদ)
রাসূলুল্লাহ (সা.) আরো বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি পরপর তিনটি জুমআ বিনা ওজরে ও ইচ্ছা করে ছেড়ে দেবে, আল্লাহ্ রাব্বুল আলামিন তার অন্তরে মোহর মেরে দেবেন। (সুনানে আবু দাউদ)
হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি পর পর তিনটি জুমআ পরিত্যাগ করবে, সে ইসলামকে পিছনের দিকে নিক্ষেপ করল। (সহিহ্ মুসলিম)

জুমআর দিনে মুমিন-মুসলমানদের ঈমানি সম্মিলন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এ দিনের তাৎপর্য বর্ণনা করে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয় যে, রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, ‘যে সকল দিবসে সূর্য উদিত হয় তার মাঝে উত্তম দিবস হচ্ছে জুমআ, সে দিন আদম (আ.)কে সৃষ্টি করা হয়েছে। একই দিনে তিনি জান্নাতে প্রবেশ করেন। আবার পুণরায় পৃথিবীতে আগমন করেন। এ দিনেই তিনি ইন্তেকাল করেন। এ শুক্রবারেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ পুণ্যদিনে এমন একটি সময় রয়েছে, যখন মহান আল্লাহ্র দরবারে দুআ কবুল হয়।’ (সুনানে তিরমিযি: ৪৯১, সুনানে আবু দাউদ: ১০৪৬)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেন, যখন তোমাদের মাঝে রমযান আসে তখন জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেওয়া হয় ও জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়। (সহিহ্ মুসলিম: ১০৭৯)
হযরত আওস ইবনে আওস আস্ সাকাফি (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি জুমআর দিনে ভালো করে গোসল করবে এবং আগে আগে পায়ে হেঁটে মসজিদে গমন করবে এবং ইমামের কাছাকাছি বসে খুৎবা মনোযোগ সহকারে শুনবে আর কোনো রকম অনর্থক কাজ করবে না তাকে তার প্রতিটি কদমের বিনিময়ে লাগাতার এক বছর নামায ও রোযার সওয়াব দান করা হবে। (সুনানে ইবনে মাযাহ্ : ১০৮৭)
হযরত আয়েশা (রা.) হতে বর্ণিত। রাসূলুল্লাহ্ (সা.) বলতেন, তোমরা রমযানের শেষ দশকে লাইলাতুল কদর অনুসন্ধান কর। (মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা: ৮৬৬০)
ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনায় জানা যায়, রমযান মাসের শেষ শুক্রবার আল্লাহর নবি হযরত দাউদ (আ.) এর পুত্র হযরত সুলায়মান (আ.) জেরুজালেম নগরী প্রতিষ্ঠা করেন এবং আল্লাহ্র মহিমা তুলে ধরতে সেখানে পুণনির্মাণ করেন মুসলমানদের প্রথম কিবলাহ্ ‘মসজিদুল আকসা’। এ জন্য প্রতিবছর সারাবিশ্বের মুসলমানদের কাছে রমযান মাসের শেষ শুক্রবারকে ‘আর কুদস’ দিবস হিসেবেও পরিচিত।
ইসলামের সূচনাকালে মদিনায় যখন রমযান মাসের সিয়ামের হুকুমসংক্রান্ত আয়াত নাযিল হয়, তখন থেকেই প্রতিবছর রমযান মাসের জুমআতুল বিদা মুসলিম জাহানের দেশে দেশে শহর-গঞ্জ-গ্রামের মসজিদে মসজিদে জোর তাগিদ দিয়েই প্রতিপালিত হয়। যেমনিভাবে সাপ্তাহিক জুমআর নামায মুসলমানদের বৃহত্তর জামাতে অনুষ্ঠিত হয়, তেমনি রমযান মাসের জুমআবার আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ও ফযিলতময়।
জুমআতুল বিদাসহ মাহে রমযানের প্রতি জুমআবারে ইবাদত-বন্দেগিতে অধিকতর সওয়াব লাভের সুবর্ণ সুযোগ থাকে। রমযান মাসের শেষ শুক্রবার সারা বিশ্বের ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা একটি মাস ত্যাগ-তিতীক্ষার সঙ্গে সিয়াম সাধনার পর এ দিনটিতে জুমআর নামায আদায় করে মাহে রমযানকে বিদায় সম্ভাষণ জানায়। রমযান মাসের সর্বোত্তম রাত হলো লাইলাতুল কদর আর সর্বোত্তম দিনটি হলো জুমআতুল বিদা।
মাহে রমযানের বিদায়ী শুক্রবার ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের জন্য অতি মূল্যবান। জুমআতুল বিদা রমযান মাস শেষ হয়ে যাওয়ার সতর্কতামূলক দিবস। জুমআতুল বিদা রোযাদারদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, মাহে রমযানের সমাপনান্তে এ বছর এর চেয়ে ভালো দিবস আর পাওয়া যাবে না। সুতরাং এ পুণ্যময় দিনটির যথাযথ সদ্ব্যবহার করা প্রত্যেক দ্বীনদার মুমিন-মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। নবি করিম (সা.) বলেছেন, ‘যে মুসলমান রমযান মাস পেল, কিন্তু সারা বছরের গুনাহখাতা মাফ করিয়ে নিতে পারল না, তার মতো হতভাগা আর কেউ নেই।’
অতএব, সকল ধর্মপ্রাণ মুসলিম নর-নারীর প্রতি আহ্বান, আসুন এই জুমআতুল বিদা তথা মহিমান্বিত রমযানুল মুবারকে মহান রবের দরবারে নিজেদের কৃতকর্মের জন্য কায়মনোবাক্যে পানাহ্ চাই এবং আল্লাহ্ তাআলার ইবাদতে মশগুল হয়ে তাঁকে রাজি-খুশি করার জন্য সচেষ্ট থাকি। আল্লাহ্ তায়ালা সকল মুসলিম নর-নারীকে এ মাসের ফযিলত অনুধাবন করে সে অনুয়ায়ী জীবন পরিচালনা করার তৌফিক দান করুন।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, শেরপুর সরকারি মহিলা কলেজ, শেরপুর।




